ঢাকার কাছেই ‘ধাঁধার চর’, ঘুরে আসুন একদিনে

সাব্বির হোসাইন ​নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা রুপালি শীতলক্ষ্যা আর প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে জেগে ওঠা দ্বীপের নাম ‘ধাঁধার চর’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাঝের চর’ বা ‘মাইঝ্যার চর’ নামেও পরিচিত। ধুলোবালির নগরী ঢাকার খুব কাছেই এমন শান্ত-স্নিগ্ধ দ্বীপ, যা এখন দেশের পর্যটন মানচিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অপেক্ষায়।​​‘ধাঁধার চর’ নামটির পেছনে আছে চমৎকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনশ্রুতি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এই চরের অবস্থান এবং সীমানা নিয়ে একধরনের রহস্য বা ‘ধাঁধা’ তৈরি হতো। বর্ষাকালে নদী যখন ফুলে-ফেঁপে উঠতো; তখন এই চরের অবয়ব বদলে যেত। জেলে ও মাঝিরা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে বা রাতে নদের মোহনায় এসে অনেক সময় দিক হারিয়ে ফেলতেন। তারা মনে করতেন, দ্বীপটি যেন কোনো অলৌকিক ধাঁধার সৃষ্টি করছে। যে কারণে মাঝনদীতে পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো। সেই গোলকধাঁধা থেকেই এর নাম হয়েছে ‘ধাঁধার চর’। ​আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, সুলতানি আমল কিংবা মোগল আমলে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার মোহনাটি ছিল নৌ-চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সে সময় এই দ্বীপে নৌ-সেন

ঢাকার কাছেই ‘ধাঁধার চর’, ঘুরে আসুন একদিনে

সাব্বির হোসাইন

​নদীমাতৃক বাংলাদেশের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে অনিন্দ্য সৌন্দর্য। গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে চলা রুপালি শীতলক্ষ্যা আর প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্রের মিলনস্থলে জেগে ওঠা দ্বীপের নাম ‘ধাঁধার চর’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মাঝের চর’ বা ‘মাইঝ্যার চর’ নামেও পরিচিত। ধুলোবালির নগরী ঢাকার খুব কাছেই এমন শান্ত-স্নিগ্ধ দ্বীপ, যা এখন দেশের পর্যটন মানচিত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অপেক্ষায়।

​‘ধাঁধার চর’ নামটির পেছনে আছে চমৎকার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনশ্রুতি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় এই চরের অবস্থান এবং সীমানা নিয়ে একধরনের রহস্য বা ‘ধাঁধা’ তৈরি হতো। বর্ষাকালে নদী যখন ফুলে-ফেঁপে উঠতো; তখন এই চরের অবয়ব বদলে যেত। জেলে ও মাঝিরা কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে বা রাতে নদের মোহনায় এসে অনেক সময় দিক হারিয়ে ফেলতেন। তারা মনে করতেন, দ্বীপটি যেন কোনো অলৌকিক ধাঁধার সৃষ্টি করছে। যে কারণে মাঝনদীতে পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়তো। সেই গোলকধাঁধা থেকেই এর নাম হয়েছে ‘ধাঁধার চর’।

​আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, সুলতানি আমল কিংবা মোগল আমলে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যার মোহনাটি ছিল নৌ-চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ। সে সময় এই দ্বীপে নৌ-সেনারা বিশ্রাম নিতেন বা নজরদারির কাজে ব্যবহার করতেন। কালের বিবর্তনে পলি জমে জমে দ্বীপটি বিশাল প্রাকৃতিক উদ্যানে রূপ নিয়েছে।

​বর্তমানে ধাঁধার চর মানেই চারদিকে স্বচ্ছ জলরাশি আর দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। এখানে দাঁড়ালে একপাশে দেখা যায় শীতলক্ষ্যার শান্ত রূপ, অন্যপাশে ব্রহ্মপুত্রের গাম্ভীর্য। চরের বুকে নানা প্রজাতির গাছপালা এবং পাখির কলকাকলি ভ্রমণপিপাসুদের এক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দেয় নাগরিক ব্যস্ততা। পর্যটকেরা নৌকা বা ট্রলার নিয়ে এখানে পিকনিক করতে আসেন। তবে পরিকল্পিত অবকাঠামোর অভাব এখনো রয়ে গেছে।

ধাঁধার চরের অপরূপ সৌন্দর্য সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কাপাসিয়া আসনের সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকার এলাকাটিকে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়।

প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে

  • ​ইকো-ট্যুরিজম: প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে পরিবেশবান্ধব বিনোদনকেন্দ্র।
  • ল্যান্ডিং স্টেশন: পর্যটকদের নিরাপদ ওঠানামার জন্য আধুনিক দুটি ঘাট বা ল্যান্ডিং স্টেশন।
  • সম্ভাব্যতা যাচাই: দ্রুত একটি বিশেষজ্ঞ দলের মাধ্যমে ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি’ করে একে পূর্ণাঙ্গ পর্যটন দ্বীপ হিসেবে ঘোষণা করা।

​ধাঁধার চর যদি সরকারি স্বীকৃতি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পায়, তবে কাপাসিয়ার অর্থনীতিতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের প্রসার—সবকিছুই এ কেন্দ্রকে ঘিরে আবর্তিত হবে। রাজধানীর খুব কাছে হওয়ায় এটি হতে পারে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘উইকেন্ড ট্যুরিস্ট স্পট’।

​ঐতিহাসিক মোহনা আর আধুনিক পর্যটনের মেলবন্ধনে ধাঁধার চর হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন পরিচয়। নদীকে বাঁচিয়ে এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করে যে পর্যটন সম্ভব, তার অনন্য উদাহরণ হবে এ দ্বীপ। শীতলক্ষ্যার বুকে জেগে থাকা এ রহস্যময় ‘ধাঁধা’ এখন আধুনিকতার পরশে উন্মোচিত হওয়ার অপেক্ষায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গী।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow