তমিজ উদ্‌দীন লোদীর কবিতা- গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে

গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে বৃষ্টি নেমে গেলে ধরা দেয় কমলা আর বেগুনি তারা মাছ। আলোর দীপ্তি নিয়ে আমার কোনো তত্ত্ব নেই, কিন্তু ক্যাকটাসসুচের আঁচল থেকে বৃষ্টি মিলিয়ে গেলে সূচগুলো ঝিকমিক করে ওঠে। ঘ্রাণ বিস্তারিত হলে  বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি চাঁদের অবয়ব ভাসছে ওপরে, আর আনন্দোল্লাসে আমরা  স্নান করি তার আলোয়। তারার সব জোয়ার টেনে এনে আমরা খুঁজে পাই বিপর্যয়ই আমাদের মোহনীয়তা ।   কোকিলের কুহু থেকে কে নিয়ে এলো  ছাতিম  গাছের কচি পাতা-জড়ানো সবুজ ধোঁয়া। পৃথিবীর বুক চিরে অগুরু নেমে এলে  ঢেকে দেয় পাথরে জমে থাকা শ্যাওলার দাগ   আর যা কিছু বলা হয়নি, তাকে রূপ দিতে গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে আমাদের দুহাতে। এক বিকেলের দৃশ্য , অদৃশ্য  একটি সিস্টেম সাব-সিস্টেমের বেলুন দুলছে হাওয়ায়    অদূরে শুকনো ঘাসের স্ফুলিঙ্গ, শিখায় সবুজ উষ্ণীষ  প্রজাপতি দোল খাচ্ছে আর  অদেখা সুতায় টানা রঙচঙে ফড়িং উড়ছে  ব্রেক লাইটের একটি ট্রেন বিস্তৃত হচ্ছে  দূর থেকে আমরা দেখছি তার লাল আলো  আমাদের পায়ের তলায় মার্বেল  পা-সহ শরীর গড়িয়ে যায় , শুধু গড়াতেই থাকে    একটি সাইকেলের চাকা  শিকল দিয়ে বাঁধা কংক্রিট

তমিজ উদ্‌দীন লোদীর কবিতা- গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে
গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে বৃষ্টি নেমে গেলে ধরা দেয় কমলা আর বেগুনি তারা মাছ। আলোর দীপ্তি নিয়ে আমার কোনো তত্ত্ব নেই, কিন্তু ক্যাকটাসসুচের আঁচল থেকে বৃষ্টি মিলিয়ে গেলে সূচগুলো ঝিকমিক করে ওঠে। ঘ্রাণ বিস্তারিত হলে  বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি চাঁদের অবয়ব ভাসছে ওপরে, আর আনন্দোল্লাসে আমরা  স্নান করি তার আলোয়। তারার সব জোয়ার টেনে এনে আমরা খুঁজে পাই বিপর্যয়ই আমাদের মোহনীয়তা ।   কোকিলের কুহু থেকে কে নিয়ে এলো  ছাতিম  গাছের কচি পাতা-জড়ানো সবুজ ধোঁয়া। পৃথিবীর বুক চিরে অগুরু নেমে এলে  ঢেকে দেয় পাথরে জমে থাকা শ্যাওলার দাগ   আর যা কিছু বলা হয়নি, তাকে রূপ দিতে গোলাপ কুঁড়ি মেলে ফুল হয়ে ফোটে আমাদের দুহাতে। এক বিকেলের দৃশ্য , অদৃশ্য  একটি সিস্টেম সাব-সিস্টেমের বেলুন দুলছে হাওয়ায়    অদূরে শুকনো ঘাসের স্ফুলিঙ্গ, শিখায় সবুজ উষ্ণীষ  প্রজাপতি দোল খাচ্ছে আর  অদেখা সুতায় টানা রঙচঙে ফড়িং উড়ছে  ব্রেক লাইটের একটি ট্রেন বিস্তৃত হচ্ছে  দূর থেকে আমরা দেখছি তার লাল আলো  আমাদের পায়ের তলায় মার্বেল  পা-সহ শরীর গড়িয়ে যায় , শুধু গড়াতেই থাকে    একটি সাইকেলের চাকা  শিকল দিয়ে বাঁধা কংক্রিটের প্লান্টারে স্থবির , বিমর্ষ কিংবা অবসাদে ক্লান্ত ।  শিশুরা ঘুমাচ্ছে  কেউ কি জানে কোন রূপক ব্যবহার করে  বর্ণনা করব শিশুদের খাঁচায় ঘুমিয়ে থাকার গল্প  একটি বিমূর্ত-রাষ্ট্র ডাল-সদৃশ স্ন্যাপ নাকি দীর্ঘ অন্বেষণ  আমরা খুঁজবো , নাকি খুঁজবো  একটি সাদা সাইকেল, একটি পিনহুইল, একটি কবিতা !  আসহাবে কাহাফের ছায়াপ্রচ্ছদ   একটি গুহার মুখ খুলেছে কালো পাথরের পল্লব, যেখানে ঘুম আঁকা আছে প্রাচীরে অদৃশ্য হরফে। সাতটি ছায়া চুপচাপ শুয়ে অর্ধ-মানব, অর্ধ-পাথর, তাদের ঘুমের নিচে নড়ে কাটাফের নিশ্বাস—এক সবুজ ধোঁয়া। সূর্য উঠলে ডানদিকে ঢুকে যায়, বামে বেরোয়, আলোর ফালি ছিন্ন করে দেয় দেয়ালের চামড়া। তারা দেখে না—চোখের পাতায় জমেছে তিন শতাব্দীর নুন, কানেভাসে শুধু গুহার ভিতরকার নিজস্ব জমিনের শব্দ।   একটি কুকুর পা দুটি প্রসারিত করে দরজায়, তার লোমে জমেছে বাইরের বিশ্বের ধুলোর স্তর। পাহাড়ের গায়ে গজিয়ে উঠেছে বাদাম গাছ, তার শিকড় খুঁজছে সেই গুহার ভিতরের নিদ্রালু জলের সুর। হঠাৎ একদিন দেয়াল ফেটে সূর্য ঢুকে পড়ে সরাসরি, ছায়াগুলো নড়ে ওঠে পাথর থেকে পিণ্ডে ফিরে। কেউ জিজ্ঞেস করে : ‘এক রাত্রি না এক সন্ধ্যা?’ তাদের দাড়িতে তখনও লেগে  রয়েছে তিন শতকের শিশির।   গুহার মুখে দাঁড়িয়ে একজন রাখাল ভাবে, কীভাবে সময় ভেঙে পড়ে স্তরে স্তরে, আর মানুষ ঘুমায় পাথরের নীচে, অবিনাশী চিহ্ন হয়ে, যখন বাইরের নগরে ভাঙচুর চলে নতুন শাসকের ।  বনসাই  স্মৃতির মাটি থেকে একটি গাছ উপড়ে নিয়ে তুমি বললে— এটাই বনসাই। শিকড়গুলোকে শেখানো হয়েছিল ভুলে যেতে মাটির বিস্তার, আকাশের অমোঘ ডাক। তবু প্রতিটি পাতা স্তব্ধ একটি প্রশ্ন— আমি কি গাছ, না কি কারও আঙুলের ভাঁজে আঁকা এক অদ্ভুত স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি? ডালে ডালে ঝুলে থাকে সময়ের বন্দি ফসল। পাথরের থালায় এ এক অসম যুদ্ধ মাটির নিচে কেঁদে ওঠে লুকানো বন্যাস্রোত। তুমি কাঁচি দিয়ে কাটো বসন্তের সম্ভাবনা আমি দেখি— প্রতিটি ছাঁটাই এক নতুন শোকের গান। তবুও সে দাঁড়িয়ে থাকে, স্তব্ধ, সুন্দর, যেন এক প্রাচীন দর্শনের পোড়ামাটির প্রতিমা। বাঁচার নামে এই নিঃশ্বাস, এই ধীরে ধীরে মরা— ক্ষুদ্র পাত্রে এক মহারণ্যের শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস। হাডসনে প্রতিবিম্বিত সুরমার জল   দুই প্রহরের নিস্তব্ধতায় একটি নদী আরেকটির গায়ে হলুদ রোদের আলপনা আঁকে কখনো উজানে, কখনো ভাটায়। হাডসনের তলদেশে, শীতের বরফ গলার আগে অদৃশ্য স্রোতে বয়ে যায়  খয়েরি মাটির গন্ধ নতুন ধানের গন্ধ একটি গ্রামের নাম। আলো যখন পানির স্তর ভেদ করে প্রতিটি তরঙ্গ দুটো ভাষায় কাঁদে— একটি শব্দ: ব্রিজ, অন্যটি শব্দ: ঘাট।   আমি দেখি আয়নায় আয়নায় লাখো বিন্দুর উল্টো যাত্রা; কোনটি আসে কোনটি যায় কোনটি কেবল স্বপ্নের পাখি— পানিতে ডানা ভেজায়। গাছ যদি কথা বলতে পারতো  আমার ঘরের ছাদ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে গাছটি  নীরব , নিস্তব্ধ , শুধু হাওয়ায় দোলে তার পত্রগুচ্ছ  তবু আমার কেমন অস্বস্তি হয়  ঘষটে যাওয়া শব্দে  প্রায়শই ঘুম ভেঙে যায় ।  সময় হয়েছে শেড থেকে মই টেনে বের করার কেটে ফেলতে হবে সেই উঁকি মারা পত্রগুচ্ছসমেত ডালগুলোকে ।  আমি ঘুমাতে চাই আর গাছেদের জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চাই, যারা নির্বাক জগতের প্রাণী, যাদের কিছুই যায় আসে না টাকা, রাজনীতি, ক্ষমতা, ইচ্ছা বা অধিকার নিয়ে, যারা রাতের কাছ থেকে সামান্যই চায় কয়েকটা মৃত তারা নিভে যাক, একটা সাদা পেঁচা উড়ে আসুক তাদের ডালপালা ছেড়ে ।    গাছ যদি কথা বলতে পারত তবে তারা বলতই না, শুধু গুনগুন করত কিছু সহজ সবুজ সুর, তাদের পত্রগুচ্ছগুলো  গড়িয়ে দিত ফাঁকা রাস্তায় আর দোষ চাপিয়ে দিত, কাঁধ ঝাঁকিয়ে, ঠান্ডা হাওয়ার উপর। দিনের বেলা তারা ঘুমোয় তাদের লোমশ ছালের ভিতর, রোদ। বৃষ্টি। তুষার। হাওয়া। তারা ভয় পায় না ।    ঝড়ে ছোট ছোট গাছগুলো নুয়ে পড়ে বারবার আর পুরোনো গাছগুলো জানে হয়তো তারা টিকবে না, পড়ে যাবে বিদ্যুতের তারের সঙ্গে স্ফুলিঙ্গ ছড়াতে ছড়াতে ।  তারা উন্মুখ থাকে ক্লোরোফিলে  আর শ্বাস নেয় , এবং শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।  হিমশীতল ভোরে সূর্যোদয়ের কোরিওগ্রাফ   একটি ফ্যাকাশে আলোর আঙুল রাতের কালো শরীরে আঁচড় কাটে— রেখার পর রেখা টানে অদৃশ্য হাত। পূর্ব দিগন্তের কাঁধে উঠে হলুদ-কমলার পাখার একটি মৃদু কম্পন— পালা তোলে সমস্ত ঘুমন্ত বাতাস ।  সমুদ্র তার নীল পালক ঝেড়ে  নদীর  গলায় মসৃণ রেশম জড়ায়, পাহাড়ের চোয়াল থেকে গলে পড়ে স্বচ্ছ সুরের শিশির। আমার জানালায় এসে থমকে দাঁড়ায় একটি ছায়া, তারপর ধীরে ধীরে মিশে যায় সাদা কাগজের ফাঁকা জমিনে— যেন প্রথম বিয়োগের নিখুঁত সমীকরণ। পৃথিবী খুলে দেয় তার প্রাথমিক চোখ, প্রতিটি পাতা শিখে নেয় আলোর সঙ্গে শীতলতার  নিঃশব্দ ধাপ। মেঘ ভাঙে, পাহাড় সরে, একটি লাল বিন্দু গলে পড়ে সমস্ত নিস্তব্ধতার বুকে।   ইউসুফ : একজন নবীর গল্প  কূপ ছিল অন্ধকারের প্রথম পরিচ্ছদ, তিমিরের ভেতর দিয়ে জ্যোৎস্নার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে এলো এক স্বপ্ন— যার শিকড় ছিল সপ্তর্ষিমণ্ডলেরও অধোদেশে। তোমার জামা আকাশের গায়ে লেখা ছিল অদৃশ্য কালিতে, যা কেবল নক্ষত্রপতনের মুহূর্তে ঝরে পড়া আলোয় ধরা দিত। মিশরের প্রাসাদে তুমি ছিলে এক অনুবাদ— চন্দ্রের ভাষাকে শস্যের ভাষায়, শূন্যতার হিসাবকে ভরার অঙ্কে। তিমির যখন ঘনিয়ে আসে তোমার চোখের তারা জ্বলে ওঠে স্বপ্নের ব্যাকরণ শেখাতে। কারাগারের অন্ধকারেও তুমি স্বচ্ছ ছিলে দর্পণের মতো, যেখানে বন্দীরা দেখতে পেত তাদের ভুলে যাওয়া স্বপ্নের অবয়ব। শেষ পর্যন্ত তুমি সময়ের হিসাব মেলাতে শিখিয়েছিলে— সাতটি মোটাতাজা গরু সাতটি শীর্ণ গরুকে গ্রাস করে না, বরং তারা একে অপরের অর্থ হয়ে ওঠে স্বপ্নের পঞ্জিকায়। তোমার গল্প মরীচিকার ভেতর দিয়ে জলের সন্ধান দেয়।  

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow