রমজান মাস ইবাদত-বন্দেগির মাস। এ মাসে দিনের রোজার পাশাপাশি রাতের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। মুসলিম উম্মাহ যুগে যুগে আগ্রহ ও গুরুত্বের সঙ্গে এ নামাজ আদায় করে আসছে। তারাবির নামাজের ফজিলত, এর সূচনা, রাকাত-সংখ্যা এবং এ বিষয়ে ফকিহ ও মুহাদ্দিসগণের বক্তব্য নিয়ে অনেক আলোচনা রয়েছে।
ইসলামি গবেষণা পত্রিকা মাসিক আল কাউসারে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে কোরআন-হাদিস ও আইম্মায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে তারাবির নামাজের রাকাত-সংখ্যা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাঠকদের জন্য বিষয়টি সংক্ষেপে ও ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হলো—
তারাবির নামাজের গুরুত্ব ও সূচনা
তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সর্বপ্রথম যিনি এই নামাজ চালু করেছেন তিন হলেন রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বিষয়টি একাধিক হাদিসে বিবৃত হয়েছে।
১. আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের কিয়াম তথা রাতের বেলা ইবাদত-বন্দেগীর উৎসাহ দিতেন। কিন্তু দৃঢ়তার সাথে নির্দেশ দিতেন না। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রমজানের রাতে ইবাদত করবে তার অতীতের গোনাহ-খাতা মাফ করে দেওয়া হবে। (মুসলিম : ৭৫৯)
২. আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রমজানের এক রাতে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছেন। কিছুসংখ্যক সাহাবি তাঁর পিছনে ইক্তিদা করেছেন। দ্বিতীয় রাতেও তিনি নামাজ পড়েছেন। এ রাতে প্রচুর মুসল্লি হয়েছে। এরপর তৃতীয় বা (রাবি বলেছেন) চতুর্থ রাতে সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে জড়ো হয়েছেন; কিন্তু ওই রাতে তিনি কামরা থেকে বের হননি।
সকাল হলে তিনি সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা যে এসেছো তা আমি দেখেছি। তবে, আমি তোমাদের কাছে আসিনি এ আশঙ্কায় যে, না জানি এই নামাজ তোমাদের উপর ফরজ করে দেওয়া হয়। (মুসলিম : ৭৬১)
৩. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, একদা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কামরা থেকে বের হয়ে মসজিদে আসলেন। দেখেন, কিছু লোক মসজিদের এককোণে নামাজ পড়ছে। জিজ্ঞেস করলেন, এরা কী করছে? বলা হলো, তারা নিজেরা কুরআনের হাফেয নয়, তাই উবাই ইবনে কা‘বের পিছনে নামাজ পড়ছে। তখন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা ঠিক করেছে। কাজটা খুব ভালো হয়েছে।২
জামাতে তারাবির প্রচলন
রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবির নামাজ প্রথম পড়েছেন। এরপরও বলা হয়, উমর (রা.) তারাবির নামাজ চালু করেছেন। এর কারণ হলো, তিনিই সর্বপ্রথম উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে জামাতের ব্যবস্থা করেছেন। তার নির্দেশে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) লোকদের নিয়ে তারাবির জামাত শুরু করেছেন। আবদুর রহমান ইবনে আবদুল কারী ((রাহ.)) বলেন, রমজানের এক রাতে উমর (রা.)-এর সাথে বের হলাম। দেখি, লোকজন বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট জামাত করে নামাজ পড়ছে। কেউ একা একা পড়ছে আর কেউ ইমামতি করছে, কিছু লোক তার ইক্তিদা করছে। উমর (রা.) বললেন, মনে হচ্ছে, সবাইকে যদি এক ইমামের পিছনে জমা করিয়ে দিই তাহলে ভালো হবে। এরপর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন এবং সবাইকে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে দাঁড় করিয়ে দেন।
আরেক রাতে তাঁর সাথে বের হলাম। লোকজন উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে জামাতের সাথে নামাজ পড়ছেন। উমর (রা.) তখন বললেন, এটা উত্তম বিদআত। সাহাবায়ে কেরাম রাতের প্রথমাংশে (তারাবির) নামাজ পড়তেন। উমর (রা.) বললেন, এই নামাজ থেকে ওই নামাজ উত্তম, যার সময় তারা ঘুমিয়ে থাকে। অর্থাৎ শেষ রাতের নামাজ। (বোখারি : ২০১০, আলমুগনী, ইবনে কুদামা : ২/১৬৬)
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝে আসে যে, সর্বপ্রথম যিনি তারাবির নামাজ পড়েছেন তিনি হলেন সায়্যিদুনা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি সাহাবিদের নিয়ে তিন বা চার রাত্রে তারাবির জামাত করেছেন। এরপর তাঁদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে আর জামাত করেননি। কেননা, তিনি আশঙ্কা করেছেন, তিনি নিয়মিত জামাতের সাথে তারাবির নামাজ পড়লে তারাবির নামাজ ফরজ হয়ে যেতে পারে। ফলে নিয়মিত আদায় করতে না পারলে কবিরা গোনাহ হবে। বিষয়টিকে আরো পরিষ্কার করে নিম্নোক্ত রেওয়ায়েতটি-
রমজান মাসে একবার রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধ্যরাতে বের হলেন এবং মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়লেন। কিছু লোক তাঁর পিছনে ইক্তিদা করল। ভোর হলে লোকজন বিষয়টা নিয়ে পরস্পরে আলোচনা করল। পরের রাতে আরো বেশি মানুষ জমা হলো। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে গিয়েছেন, তারা তাঁর পেছনে নামাজ পড়েছে। সকাল হলে লোকেরা তা নিয়ে আরো বেশি আলোচনা করল। তাই তৃতীয় রাতে মুসল্লিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেল। নবীজী মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েছেন, লোকেরা তাঁর ইক্তিদা করেছে। চতুর্থ রাতে এত বেশি মুসল্লি হয়েছে যে, মসজিদে সংকুলান হচ্ছে না। কিন্তু রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওই রাতে নামাজের জন্য বের হলেন না। তা দেখে কিছু লোক আস্সালাত, আস্সালাত বলে আওয়ায দিতে লাগল। কিন্তু না, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন না। একেবারে ফজরের সময় মসজিদে গিয়েছেন। ফজরের নামাজ শেষ হলে তিনি মুসল্লিদের দিকে ফিরলেন এবং খুতবা পড়ে বললেন, শোন! আজ রাতে তোমাদের অবস্থা আমার অজানা নয়। কিন্তু আমি আশঙ্কা করেছি, (নিয়মিত জামাত করলে) না জানি, তারাবির নামাজ তোমাদের উপর ফরজ হয়ে যায় আর তখন তা আদায় করতে তোমরা অক্ষম হয়ে যাও (বোখারি : ৯২৪, মুসলিম : ৭৬১) ।
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে, এ অবস্থায়ই রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকাল হয়ে যায়। (বোখারি : ২০১২)
তারাবির নামাজের রাকাত-সংখ্যা
পূর্বের হাদিসগুলো থেকে প্রমাণিত যে, তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এর রাকাত সংখ্যা বিশ এবং বিতিরসহ তেইশ। উম্মাহর আমল এভাবেই চলে আসছে। খলিফায়ে রাশেদ উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগ থেকে পূর্বসূরী ও উত্তরসূরী সকল মুসলিম এ বিষয়ে একমত। চার মাজহাবের কোনো ইমাম এতে দ্বিমত পোষণ করেননি। হাঁ, মদিনার মুজতাহিদ ইমাম মালেক (রাহ.) থেকে এক বর্ণনা আছে যে, তারাবির নামাজ ছত্রিশ রাকাত। এ মতের পক্ষে তাঁর দলিল হলো, তখনকার মদিনাবাসীর আমল। নাফে (রাহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, আমি মদিনার লোকদের দেখেছি, তারা রমজানে (ছত্রিশ রাকাত তারাবি ও তিন রাকাত বিতর মিলে মোট) উনচল্লিশ রাকাত নামাজ পড়েন। ( মুখতাসারু কিয়ামিল লাইল : পৃ. ২০১, ফতহুল বারি : ৫/৩৫২ باب: فضل من قام رمضان)
তবে, ইমাম মালেক ((রাহ.)) থেকে প্রসিদ্ধ বর্ণনা শাফেয়ী, হাম্বলী ও হানাফী মাজহাবের মতই। অর্থাৎ তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। সুতরাং বিশ রাকাতের ওপর চার মাজহাবের ইমামগণ একমত এবং এর ওপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত। আর এভাবে আল্লাহ তাআলা বিবাদ-বিসংবাদের অনিষ্ট থেকে মুমিনদের হেফাজত করেছেন।
মুজতাহিদ ইমামগণের দলিল
বায়হাকী ((রাহ.)) ও অন্যান্য মুহাদ্দিস সহীহ সনদে বর্ণনা করেছেন যে, প্রসিদ্ধ সাহাবি সাইব ইবনে ইয়াযীদ (রাহ.) বলেছেন, উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যামানায় রমজান মাসে সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন। (সুনানে কুবরা, বায়হাকী : ২/৪৯৬)
২. তাবেয়ী ইয়াযীদ ইবনে রুমান (রাহ.) বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম তেইশ রাকাত নামাজ পড়তেন (মুয়াত্তা মালেক, আসার ৩৮০; সুনানে কুবরা, বায়হাকী : ২/৪৯৬) । অর্থাৎ তারা বিশ রাকাত তারাবি ও তিন রাকাত বিতির পড়তেন।
৩. আবুল আলিয়া (রাহ.) থেকে বর্ণিত, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) বলেন, উমর (রা.) তাকে বললেন, মানুষেরা দিনের বেলা রোজা রাখে। (কিন্তু অনেকেই) সুন্দর করে কোরআন পড়তে পারে না। আপনি যদি তারাবির নামাজের জামাত করতেন এবং তাদেরকে কোরআন পাঠ করে শোনাতেন (তাহলে ভালো হত)! তখন উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) বললেন, হে আমিরুল মুমিনীন! এই আমল তো নবীজির যুগে ছিল না! উমর (রা.) বললেন, আমি তা জানি। তবে, জামাত করলে ভালো হবে। তখন উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়লেন। (৪ -আলআহাদিসুল মুখতারাহ : হাদিস ১১৬১, মুসনাদে আহমাদ ইবনে মানী-কানযুল উম্মাল : হাদিস ২৩৪৭১)
আইম্মায়ে কেরামের বক্তব্যের আলোকে তারাবি বিশ রাকাত
ইবনে কুদামা (রাহ.) বিশ রাকাত তারাবির ব্যাপারে ইজমা নকল করেছেন এবং ইমাম মালেক (রাহ.)-এর দ্বিতীয় মতের খণ্ডন করেছেন, যাতে বলা হয়েছে যে, তারাবির নামাজ ছত্রিশ রাকাত। ইবনে কুদামা (রাহ.) বলেন, কিয়ামে রমজান তথা তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। এই নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাবির নামাজ চালু করেছেন স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। কিন্তু বলা হয়, তারাবির নামাজ চালু করেছেন উমর (রা.)। এর কারণ হলো, তিনিই সর্বপ্রথম উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে জামাতের ব্যবস্থা করেছেন। তাঁর নির্দেশেই উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) লোকদের নিয়ে তারাবির জামাত শুরু করেছেন।
এক বর্ণনায় এসেছে, রমজানের এক রাতে উমর (রা.) বের হলে দেখেন, লোকজন বিক্ষিপ্তভাবে ছোট ছোট জামাত করে নামাজ পড়ছে। উমর (রা.) বললেন, সবাইকে যদি এক ইমামের পিছনে জমা করে দিই (তাহলে ভালো হবে)। এরপর সবাইকে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে এক জামাতে দাঁড় করিয়ে দিলেন।
এরপর আরেক রাতে বের হয়ে দেখেন, লোকজন ইমামের পিছনে জামাতের সাথে নামাজ পড়ছে। উমর (রা.) তখন বললেন, এটা উত্তম বিদআত (বোখারি : ২০১০)। এরপর ইবনে কুদামা (রাহ.) বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রাহ.)-এর মতে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। এটাই সুফিয়ান ছাউরী (রাহ.), আবু হানিফা (রাহ.) ও শাফেয়ী (রাহ.)-এর মত। ইমাম মালেক (রাহ.) বলেছেন, তারাবির নামাজ ছত্রিশ রাকাত। তিনি তখনকার মদিনাবাসীর আমল গ্রহণ করেছেন।
বিশ রাকাত তারাবির দলি হলো উমর (রা.) যখন সাহাবিদেরকে উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর পিছনে দাঁড় করিয়েছিলেন তখন তিনি তাদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়েছিলেন। ইয়াযীদ ইবনে রুমান (রাহ.) থেকে ইমাম মালেক (রাহ.) বর্ণনা করেছেন যে, উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম (তিন রাকাত বিতরসহ) তেইশ রাকাত নামাজ পড়তেন।
আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি সাহাবি ও তাবেয়িদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়ার জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করেছেন। অন্যান্য সাহাবির সামনে উমর (রা.) ও আলী (রা.)-এর নির্দেশ এবং সাহাবায়ে কেরামের এই আমল ইজমার পর্যায়ের।
ইবনে কুদামা (রাহ.) আরো বলেন, যদি প্রমাণিত হয় যে, (ইমাম মালেক (রাহ.)-এর যমানায়) মদিনাবাসী সকলেই ছত্রিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন, তাহলেও ও উমর (রা.) যা করেছেন এবং তাঁর যুগে সাহাবায়ে কেরাম যে বিষয়ে ইজমা করেছেন, তারই অনুসরণ করা উত্তম। কোনো কোনো আলেম বলেছেন, মক্কাবাসীরা চার রাকাত অন্তরন্তর তাওয়াফ করতেন। মদিনাবাসীরা সে সওয়াব অর্জনের জন্য তাওয়াফের বদলে চার রাকাত নামাজ পড়তেন। কিন্তু বলাই বাহুল্য যে, সাহাবায়ে কেরাম যে রাকাত-সংখ্যার উপর ছিলেন সে অনুযায়ী আমল করাই শ্রেয়।
আলী (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি এক রমজানে বিভিন্ন মসজিদ ঘুরে ঘুরে দেখেছেন। সেগুলোতে বাতি জ্বালিয়ে লোকজন নামাজ পড়ছে। তখন আলী (রা.) বললেন, আল্লাহ তায়ালা উমরের কবরকে আলোকিত করুন, যেমন তিনি আমাদের মসজিদগুলোকে আলোকিত করেছেন।
ইমাম মালেক (রাহ.)-এর প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। সুতরাং বিশ রাকাত উত্তম হওয়ার ব্যাপারে মুজতাহিদ ইমামগণের ইজমা সাব্যস্ত হচ্ছে। শায়েখ দারদীর মালেকী (রাহ.) বলেছেন, রমজানে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। তা আদায় করবে ইশার নামাজের পর। বিতিরের তিন রাকাত ছাড়া বাকি প্রত্যেক দুই রাকাত পর পর সালাম ফেরাবে। মুস্তাহাব হলো, প্রত্যেক রাতে বিশ রাকাতে এক পারা পড়া। এভাবে পুরো তারাবিতে একবার কোরআনে কারিম খতম করা।
তদ্রুপ ইমাম শাফেয়ী (রাহ.) ও ইমাম আবু হানিফা (রা.)-এর মাজহাবও বিশ রাকাত তারাবি পড়া। কেননা, উমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে এর উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা হয়ে গেছে। ইমাম ইবনে আবদুল বার (রাহ.) বলেন, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) থেকে এটাই সঠিক যে, তিনি সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন। এতে সাহাবিদের মধ্যে কারো দ্বিমত নেই। (আলইসতিযকার ৫/১৫৭)
মুখতাসারুল মুযানী কিতাবে (পৃ. ২১) আছে, ইমাম শাফেয়ী (রাহ.) বলেছেন, আমি মদিনাবাসীদের দেখেছি, তারা (তিন রাকাত বিতিরসহ) উনচল্লিশ রাকাত নামাজ পড়েন। তবে আমার নিকট বিশ রাকাত পড়া উত্তম। কেননা, এটাই উমর (রা.) থেকে বর্ণিত এবং আমি মক্কাবাসীদেরও দেখেছি, তারা বিশ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতির পড়েন।
ইমাম তিরমিজি (রাহ.)-এর বক্তব্য
ইমাম তিরমিজি (রাহ.) বলেন, উমর (রা.), আলী (রা.) ও অন্যান্য সাহাবি থেকে যা বর্ণিত হয়েছে এর উপরই অধিকাংশ আহলে ইলমের আমল। অর্থাৎ তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। সুফিয়ান ছাওরী (রাহ.), আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রাহ.) ও শাফেয়ী (রাহ.)-এর মাজহাবও এ অনুযায়ীই। শাফেয়ী (রাহ.) বলেছেন, মক্কাবাসীদের দেখেছি, তারা বিশ রাকাত তারাবি পড়েন। (জামে তিরমিজি : ২/৩২৭-৩২৮)
ইবনে রুশদ (রাহ.) বলেন, ইমাম মালেক (রাহ.) -এক বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম আবু হানিফা (রাহ.), শাফেয়ী (রাহ.) ও আহমাদ (রাহ.) বিতর ব্যতীত বিশ রাকাত তারাবির মত গ্রহণ করেছেন। (বিদাইয়াতুল মুজতাহিদ : ২/২৬২)
ইমাম নববী (রাহ.) বলেন, আমাদের শাফেয়ী মাজহাব মতে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। প্রত্যেক দুই রাকাতে সালাম ফেরাবে এবং চার রাকাত পর পর ‘তারবীহা’ তথা আরাম করবে। আবু হানিফা (রাহ.) ও তাঁর অনুসারীগণ এবং আহমাদ (রাহ.), দাউদ (রাহ.) ও অন্যান্য ইমামগণের মতও এটাই। কাজী ইয়ায (রাহ.) বলেছেন, জুমহুর উলামায়ে কেরামের মাজহাবও তা-ই। ইমাম মালেক (রাহ.) বলেছেন, তারাবির নামাজ বিতর ব্যতীত ছত্রিশ রাকাত। (৫ -আলমাজমু : ৩/৫২৬)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ.) বলেন, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন এবং তিন রাকাত বিতর পড়তেন, বিষয়টি সুপ্রমাণিত। তাই অনেক আলেমের মতে এটাই সুন্নাহ। কেননা, উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) মুহাজির ও আনসার সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতিতে বিশ রাকাত পড়েছেন। তখন এর ওপর কেউ কোনো আপত্তি করেননি। (মাজমূউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া : ২৩/১১২-১২৩)
‘মাজমূআতুল ফাতাওয়ান নাজদিয়া’য় আছে, শায়েখ আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহ্হাব তারাবি নামাজের রাকাত-সংখ্যা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেছেন যে, উমর (রা.) যখন উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-এর মাধ্যমে জামাতের ব্যবস্থা করেন তখন সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাত তারাবি পড়েছেন।
মুসলিম উম্মাহ্র ইমামগণের এসব উদ্ধৃতি নিশ্চিত প্রমাণ করে-মুসলমানদের মাঝে বর্তমানে যে বিশ রাকাত তারাবি প্রতিষ্ঠিত এটাই হক। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। বিশ রাকাতই সাহাবায়ে কেরামের আমল দ্বারা প্রমাণিত। চার মাজহাবের ইমামগণ এর ওপরই ইজমা করেছেন। উমর (রা.)-ও এই সংখ্যার নির্দেশই দান করেছিলেন। আর সহিহ হাদিসের ভাষ্য হলো, আল্লাহ তায়ালা হক ও সত্য গচ্ছিত রেখেছেন উমরের যবান ও কলবে। (জামে তিরমিজি : ৩৬৮২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা : ৩২৬৪৯; মুসনাদে আহমাদ : ৫১৪৫, ২১২৯৫, ২১৪৫৭; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৬৮৮৯)
কেরাত ও খতমের ব্যাপারে নির্দেশনা
ইমাম আহমাদ (রাহ.) বলেছেন, তারাবির নামাজ এ পরিমাণ দীর্ঘ করবে, যতটুকু মুসল্লিদের জন্য সহনীয় হয়, তাদের কষ্ট না হয়। কেরাতের বিষয়টি মুসল্লিদের সহনক্ষমতার উপর নির্ভর করে। কাযী (রাহ.) বলেছেন, পুরো রমজানে তারাবিতে এক খতমের কম হওয়া উচিত নয় এবং এক খতম থেকে বেশি পড়াও ঠিক না; যাতে মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। (আলমুগনী, ইবনে কুদামা : ২/১৬৭)
জামাতে নাকি একাকী?
যদি মসজিদ জামাত থেকে খালি হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে উত্তম হলো ঘরে একা একা তারাবির নামাজ পড়া। আর মসজিদ খালি হওয়ার আশঙ্কা হলে মসজিদে জামাতে পড়া উত্তম। (আকরাবুল মাসালিক আলা মাজহাবিল ইমাম মালিক : ১/৫৫২, আশ্শারহুস সাগীর আলা আকরাবিল মাসালিক : ১/৫৫২)