তুমি রবে নীরবে
‘আজি হতে শতবর্ষ পরে,কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে—আজি হতে শতবর্ষ পরে!’ কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৪০০ সাল কবিতা খানি লিখেছিলেন সেই ২রা ফাল্গুন ১৩০২ সালে। কবির মনোজগতে তখন কি খেলা করছিল সেটা আমার জানা নেই। এই কবিতার অনেক রকমের ব্যাখ্যা আছে। বলা হয় কবি বিশ্বাস করতেন, রক্ত-মাংসের শরীর নশ্বর হলেও তার কবিতা ও শিল্পকর্মকালের সীমারেখা অতিক্রম করে চিরকাল বেঁচে থাকবে। শতবর্ষ পরে যখন বসন্তের নতুন হাওয়া বইবে, তখন কোনো এক অজানা পাঠক হয়তো তার কবিতা পড়ে মুগ্ধ হবেন। কবির বিরহের দীর্ঘশ্বাস, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং অনুভূতির প্রকাশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তুলবে, যার মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক অদৃশ্য যোগসূত্র বা আত্মিক মিলন ঘটবে। আরও পড়ুন উপন্যাস এবং সিনেমায় হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন আহমেদ এমন কোনো কবিতা লিখে যাননি। তিনি নিজের মতো করে একটা জীবন যাপন করে গেছেন। আর পাঠকদের জন্য লিখে গেছেন উপন্যাস এবং গল্প। পাশাপাশি কবিতা, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, শিশুতোষ রচনা, রম্য রচনা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যা তার স্পর্শ পায়নি। এসব বিষয়ে সাহিত্য আরও অনেক দ্বিগবিজয়ী সাহিত্যিকই রচনা
‘আজি হতে শতবর্ষ পরে,
কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহলভরে—
আজি হতে শতবর্ষ পরে!’
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৪০০ সাল কবিতা খানি লিখেছিলেন সেই ২রা ফাল্গুন ১৩০২ সালে। কবির মনোজগতে তখন কি খেলা করছিল সেটা আমার জানা নেই। এই কবিতার অনেক রকমের ব্যাখ্যা আছে। বলা হয় কবি বিশ্বাস করতেন, রক্ত-মাংসের শরীর নশ্বর হলেও তার কবিতা ও শিল্পকর্মকালের সীমারেখা অতিক্রম করে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
শতবর্ষ পরে যখন বসন্তের নতুন হাওয়া বইবে, তখন কোনো এক অজানা পাঠক হয়তো তার কবিতা পড়ে মুগ্ধ হবেন। কবির বিরহের দীর্ঘশ্বাস, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং অনুভূতির প্রকাশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তুলবে, যার মাধ্যমে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক অদৃশ্য যোগসূত্র বা আত্মিক মিলন ঘটবে।

উপন্যাস এবং সিনেমায় হুমায়ূন আহমেদ
হুমায়ূন আহমেদ এমন কোনো কবিতা লিখে যাননি। তিনি নিজের মতো করে একটা জীবন যাপন করে গেছেন। আর পাঠকদের জন্য লিখে গেছেন উপন্যাস এবং গল্প। পাশাপাশি কবিতা, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী, শিশুতোষ রচনা, রম্য রচনা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যা তার স্পর্শ পায়নি।
এসব বিষয়ে সাহিত্য আরও অনেক দ্বিগবিজয়ী সাহিত্যিকই রচনা করেছেন কিন্তু সেগুলো পাঠকের কাছে পৌঁছায়নি। আর পৌঁছালেও তার প্রতি পাঠক তেমন কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেনি। পড়তে যেয়ে শব্দ এবং ভাষার খটোমটো ব্যবহারে বারবার হোঁচট খেয়ে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তাই সেসব সাহিত্যে সময় ও সমাজ সংস্কারের বাণী থাকা সত্বেও সেগুলো কোন কাজেই আসেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তুলনামূলক সাহিত্যের ওপর পিএইচডি করছেন নীলিমা ইসলাম। তার মতে, ‘তিনি অত্যন্ত সরলভাবে গভীর কথা বলতে জানেন। তার ভাষা কঠিন নয়, অথচ চোস্ত। এ কারণেই ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি থেকে উঠে আসা পাঠক নিজের মতো করে তার লেখা উপভোগ করতে পারে। গল্প বলার ধরনটাও প্রশংসাযোগ্য। তার লেখা ছোট একটা অনুচ্ছেদও পরিপূর্ণ গল্প মনে হয়। বাস্তবতা ও রহস্যময়তাকে তিনি অনায়াসে মেলাতে পারেন। তার লেখায় অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত বিষয়গুলোকেও বিস্ময়করভাবে বিশ্বাসযোগ্য লাগে। সহজ ও সাবলীল গদ্যের পাশাপাশি এ ভারসাম্যই অন্যতম কারণ, যার জন্য তার কাজ আজও আমার মতো আরও অনেকের হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে।’
সাহিত্যের অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম ‘হুমায়ূন আহমেদ পাঠপদ্ধতি ও তাৎপর্য’ বইয়ে লিখেছেন, ‘নিজ অস্তিত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতাকে আবিষ্কার করতে পারার বিপুল সাফল্যই হুমায়ূনের নজিরবিহীন জনপ্রিয়তার কারণ।’
জনপ্রিয়তা লেখক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রকাশিত অংশ। জনপ্রিয় লেখকের প্রায় প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই এ লেখকের ছিল। বরং দু-একটি বৈশিষ্ট্য বেশিই ছিল। কিন্তু জনপ্রিয়তার প্রবাহমান স্রোতে হুমায়ূনের লেখনীর সাহিত্যমূল্য কি উপেক্ষিত থেকেছে? এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আজমের মত, ‘হুমায়ূন রচনাবলি থেকে একগুচ্ছ টেক্সট আলাদা করে বাছাই করা সম্ভব, যেগুলো প্রভাবশালী সাহিত্যপাঠরীতি মোতাবেক পঠিত হতে পারে।’
এতো গেলো তার সাহিত্যের গুনগান। এর বাইরে তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের নির্মাতা। তার হাত দিয়ে যেসব নাটক এবং চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। সেগুলোর চাহিদা সময়ের গন্ডি পেরিয়ে অমরত্ব পেয়েছে। আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা, শ্যামল ছায়া, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, আমার আছে জল, ঘেটু পুত্র কমলা ছাড়াও তাঁর লেখার ওপর ভিত্তি করে অন্য চলচ্চিত্রকারেরাও ছবি নির্মাণ করেছেন।
এর বাইরে বাংলাদেশিদের একসময়ের সবচেয়ে বড় বিনোদন ছিল তার লেখার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নাটক। পরিবারের সকল সদস্য একত্রে বসে তার নাটক দেখার চল এখনও আছে। টেলিভিশন চ্যানেল থেকে সেটা শুধুমাত্র ইউটিউবে স্থানান্তর হয়েছে।
হুমায়ূন আহমেদ অসংখ্য গানও রচনা করেছেন। গানগুলো তিনি তার নাটক ও চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছেন।
সেইসব গান গীত হয়েছে বাংলাদেশের সব স্বনামধন্য শিল্পীর কণ্ঠে। এছাড়াও বাংলাদেশের একমাত্র স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ এ নিয়মিত লিখতেন ‘এলেবেলে’ শিরোনামে। এসবের বাইরে ব্যক্তি হুমায়ূন আরো বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন। ঢাকার অদুরে ‘নুহাশ পল্লী’ নামে নির্মাণ করেছেন বাগানবাড়ী। নাগরিক কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে যে কোনো নিভৃতচারী মানুষের পছন্দের একটা জায়গা।
তার মায়ের পরামর্শে ২০০৬ সালে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ী আমতলা ইউনিয়নে ‘শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ’ নামে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। প্রতিষ্ঠানটি স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই এসএসসিতে অংশ নেওয়া প্রায় শতভাগ শিক্ষার্থীই ভালো ফল অর্জন করছে।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির যে বিশাল এবং বহুমাত্রিক ভান্ডার আমি তার কিঞ্চিৎই আলোচনা করলাম। সেদিন কথা প্রসঙ্গে একজন জিজ্ঞেস করলেন, আপনার প্রিয় লেখক কে? আমি একেবারে দ্বিধাহীন কণ্ঠে উত্তর দিলাম - অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদ। উত্তরটা শুনে প্রশ্নকর্তা অবাকই হলেন। আমি তখন বললাম, আমি পাঠ্য বইয়ের বাইরের বই পড়তে শিখেছি উনার লেখা গল্পের বই পড়ে। উনার বই পড়তে যেয়ে আরও কতশত বইয়ের রেফারেন্স সেখান থেকে পেয়েছি। এরপর সেগুলো পড়েছি। ছোটবেলায় আমাদের গ্রাম্য ভাষায় শোনা সম্বোধন এবং প্ৰবাদগুলো শহরে মধ্যবিত্তের কাছে এসে গালি বলে পরিগণিত হয়েছে। তিনি খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেগুলো উনার লেখায় ফিরিয়ে এনেছিলেন।
এ বছর হুমায়ূন আহমেদ এর মৃত্যুবার্ষিকী অনেকটা নিভৃতেই চলে গেলো। যেহেতু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করি না তাই জানতেও পারলাম না। অবশ্য আমি বাংলাদেশের দুটো প্রথিতযশা সংবাদপত্র নিয়মিত পড়ি। সেখানেও তেমন কোন খবর পেলাম না। যেটুকু পেলাম সেটুকুও খুবই মন খারাপ করা।
তার স্ত্রী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন রোববার দুপুরে গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে তার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে তিনি অভিমান করে কিছু কথা বলেছেন, ‘সরকার, রাষ্ট্র কারও কাছেই আমার কিছু চাওয়ার নাই, আগেও চাওয়ার ছিল না হুমায়ূন আহমেদের জন্মবার্ষিকী বা মৃত্যুবার্ষিকীতে উনাকে নিয়ে কিছু পালন করবার।’
যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশে গুণী জন্মায় না। হুমায়ূন আহমেদ ধর্ম, বর্ণ, স্থান, কাল নির্বিশেষে যে মানুষটা পুরো বাংলাদেশের একেবারে গ্রামীণ জনগোষ্ঠি থেকে শুরু করে ঢাকা শহরের মুধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত সকল মানুষের জীবনবোধকে ধারণ করতেন। এমনকি তার লেখায় ফুটপাতের নিরন্ন মানুষও উঠে এসেছে স্বমহিমায়।
আমরা সেই মানুষটিকেই যথাযথ মূল্যায়ন করছি না। আমি চাইলেই উনার কোন লেখা কার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বা কার চেয়ে ভালো সেই তর্ক ফেঁদে বসতে পারতাম কিন্তু বিতর্ক এড়াতে সেদিকে গেলাম না। একটা সময় অবশ্য এমনও ছিল হুমায়ূন আহমেদ'র লেখা নিয়ে খিস্তি না করলে লেখক হওয়ার স্বীকৃতি পাওয়া যেত না। অনেকেই এখনও সেটা করেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উনার লেখা একদম না পড়ে।
যাইহোক, আমি এরপরও আশান্বিত। আমার কাছে কোন পরিসংখ্যান নেই কিন্তু আমি হলফ করে বলতে পারি এখনও সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় হুমায়ূন আহমেদ'র বই অবশ্যই আছে। ইনস্টাগ্রামে এখনকার তরুণ তরুণীদের হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে আগ্রহ দেখে খুবই ভালো লাগে। নতুন প্রজন্ম যারা উনাকে দেখেন নাই তারা যখন উনার লেখা পড়ে রিভিউ দেয় তখন নতুন করে আশায় বুক বাঁধি। এখনকার প্রজন্ম বৃষ্টি আসলেই উনাকে স্মরণ করে।
এখনও তরুণ তরুণীরা হলুদ পাঞ্জাবী আর নীল শাড়ি পরে শহরের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে। আশাকরি সময়ের সাথে সাথে উনাকে নিয়ে অনাগত প্রজন্মের আগ্রহ দিন দিন বাড়তেই থাকেব। পাশাপাশি উনার অন্যান্য সৃষ্টির পাশাপাশি লেখারও বহুবিধ মূল্যায়ন হবে।
এমআরএম
What's Your Reaction?