তেজগাঁওয়ের রিকশার বেস ক্যাম্প: একটি ইতিহাসের যাত্রা
ঢাকার রাস্তায় চলতে গেলে একটা জিনিস বেশ চোখে পড়বে রিকশা। আর সেই রিকশার ‘সাম্রাজ্য’ যদি খুঁজতে হয়, তাহলে সবার আগে আসে ‘তেজগাঁও’ এর কথা। যেখানে সকাল থেকে রাত, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির পাশ দিয়ে শত শত রিকশা চলে যায়। রঙিন ছাউনি, টুং-টাং আওয়াজ, চালকদের চিৎকার সব মিলিয়ে তেজগাঁওয়ে রিকশার রাজত্ব চলে। কিন্তু কেন এই এলাকায় এত রিকশা? কেন এখানে গ্যারেজের সংখ্যা এত বেশি? কেন রিকশাওয়ালারা এখানকেই ‘বেস ক্যাম্প’ বানিয়েছেন? ঢাকায় রিকশা কেবল যানবাহনই নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে ঘনীভূত রূপ দেখা যায় তেজগাঁও এলাকায়। প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক, কেন তেজগাঁও হয়ে উঠলো রিকশার ‘সাম্রাজ্য’? এর পেছনে রয়েছে শিল্পায়ন, অভিবাসন, ভৌগোলিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস। রিকশার ঢাকায় আগমন: সংক্ষিপ্ত পটভূমি রিকশার উৎপত্তি জাপানে (১৮৬৯ সালের দিকে), যেখানে এটি ‘জিনরিকিশা’ নামে পরিচিত ছিল। মানুষের শক্তিচালিত এই বাহনটি বাংলাদেশে প্রথম আসে ১৯১৯ সালে চট্টগ্রামে। সেটা ছিল হাতে টানা দুই চাকার রিকশা। ঢাকায় সাইকেল রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে, যা আসে মূলত কলকাতা থেকে। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও
ঢাকার রাস্তায় চলতে গেলে একটা জিনিস বেশ চোখে পড়বে রিকশা। আর সেই রিকশার ‘সাম্রাজ্য’ যদি খুঁজতে হয়, তাহলে সবার আগে আসে ‘তেজগাঁও’ এর কথা। যেখানে সকাল থেকে রাত, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা গাড়ির পাশ দিয়ে শত শত রিকশা চলে যায়। রঙিন ছাউনি, টুং-টাং আওয়াজ, চালকদের চিৎকার সব মিলিয়ে তেজগাঁওয়ে রিকশার রাজত্ব চলে। কিন্তু কেন এই এলাকায় এত রিকশা? কেন এখানে গ্যারেজের সংখ্যা এত বেশি? কেন রিকশাওয়ালারা এখানকেই ‘বেস ক্যাম্প’ বানিয়েছেন?
ঢাকায় রিকশা কেবল যানবাহনই নয়, এটি একটি জীবন্ত ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে ঘনীভূত রূপ দেখা যায় তেজগাঁও এলাকায়। প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক, কেন তেজগাঁও হয়ে উঠলো রিকশার ‘সাম্রাজ্য’? এর পেছনে রয়েছে শিল্পায়ন, অভিবাসন, ভৌগোলিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার দীর্ঘ ইতিহাস।
রিকশার ঢাকায় আগমন: সংক্ষিপ্ত পটভূমি
রিকশার উৎপত্তি জাপানে (১৮৬৯ সালের দিকে), যেখানে এটি ‘জিনরিকিশা’ নামে পরিচিত ছিল। মানুষের শক্তিচালিত এই বাহনটি বাংলাদেশে প্রথম আসে ১৯১৯ সালে চট্টগ্রামে। সেটা ছিল হাতে টানা দুই চাকার রিকশা। ঢাকায় সাইকেল রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকের শেষের দিকে, যা আসে মূলত কলকাতা থেকে। এরপর নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনায় ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ীরা প্রথমে এই বাহন আমদানি করেন নিজেদের ব্যবহারের জন্য। ১৯৩৬-৩৭ সালে মৌলভীবাজারের দুই ব্যক্তি (একজন ডাক্তার) চন্দননগর থেকে দুটি সাইকেল রিকশা আনেন। ১৯৪১ সালে ঢাকায় মাত্র ৩৭টি রিকশা ছিল, ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১টি। ১৯৪৪ সালে ঢাকায় প্রথম রিকশা লাইসেন্স জারি হয়। দেশভাগের পর (১৯৪৭) রিকশা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তেজগাঁও: শিল্প থেকে রিকশার কেন্দ্রে
রাজধানীতে গণপরিবহনের সংকট, ছোট ছোট গলি আর যানজটের কারণে রিকশার চাহিদা সবসময়ই প্রচুর। কিন্তু তেজগাঁও এই চাহিদার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কয়েকটি বিশেষ কারণে। প্রথম কারণটি ঐতিহাসিক। তেজগাঁওয়ের রিকশা ইতিহাসের মূল চালিকাশক্তি হলো এর শিল্পায়ন। ১৯৫০-এর দশকে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট ৫০০ একর জমিতে তেজগাঁওকে ঢাকার প্রধান শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলে। কারখানা, ওয়ার্কশপ, মিল সবকিছু গড়ে ওঠে এখানে। ফলে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন, থাকতেন, চলাফেরা করতেন। তখন এমন আগন্তুকদের চলাফেরার জন্য সস্তা ও সুবিধাজনক যান দরকার পড়ে। তবে বাস্তবতা ছিল, তেজগাঁওয়ের ভেতরে বড় মহাসড়ক তেমন ছিল না। ছিল ছোট ছোট গলি, সরু রাস্তা। গাড়ি চলার মতো রাস্তা যেখানে সীমিত, সেখানে রিকশাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে কার্যকরী যান। ফলে কল-কারখানা স্থাপনের শুরু থেকেই রিকশা এখানে প্রচলিত হয়ে যায়। এই প্রবণতা এখনও চলছে।
গ্যারেজ ও মেকানিকদের ভূমিকা
তেজগাঁওয়ের রিকশা সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার আরেকটি বড় কারণ লোকমুখে জানা যায়। শোনা যায়, একসময় তেজগাঁওয়ে মেকানিকদের একটা বড় দল থাকতেন। রিকশাওয়ালারা এবং গ্যারেজ মালিকরা তাদের কাছেই রিকশা সারাতেন। সারাইয়ের সুবিধা হাতের কাছে থাকায় নতুন রিকশাওয়ালা এই এলাকার প্রতি আকৃষ্ট হয়, গ্যারেজ বাড়ে, পুরোনো গ্যারেজ আরও বড় হয়। এভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম তৈরি হয় রিকশা আছে, চালক আছে, সারাই আছে, গ্যারেজ আছে। অন্য এলাকায় এই চক্র এতটা শক্তিশালী হয়নি। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রিকশার সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।
আজ যেন রিকশাওয়ালাদের ছোট্ট জগৎ
বর্তমানে তেজগাঁও এলাকা যেন রিকশাওয়ালাদের একটা ছোট ছোট্ট জগৎ। জানা গেছে, শিল্পাঞ্চল হওয়ায় তেজগাঁও-এর আশপাশে একাধিক বস্তি রয়েছে। সেসব বস্তির হাজার হাজার মানুষের জীবিকা হয়ে ওঠে রিকশা চালানো। বস্তির পাশাপাশি প্রচুর গ্যারেজ থাকায় রিকশাচালকদের জন্য তেজগাঁও আরও পছন্দের জায়গা হয়ে উঠেছে। সকালে গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়েন চালকরা, সন্ধ্যায় ফিরে আসেন। এই গ্যারেজগুলো শুধু গাড়ি রাখার জায়গা নয়, এগুলো যেন রিকশাওয়ালাদের সামাজিক কেন্দ্র। এই চক্র তেজগাঁওকে রিকশাপ্রবণ করে তোলে।
তেজগাঁও রিকশাওয়ালাদের অবস্থানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তেজগাঁওয়ের ভৌগোলিক অবস্থান। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে এখান থেকে রিকশা সহজেই যে কোনো দিকে চলে যেতে পারে মহাখালী, ফার্মগেট, মগবাজার, কারওয়ানবাজার, এমনকি গুলশান-বনানীর দিকেও। এই সুবিধার কারণে রিকশার গ্যারেজ বাড়তে বাড়তে এখন অসংখ্য হয়ে গেছে।
একজন রিকশাওয়ালা বলেন, ‘তেজগাঁও থেকে সারাদিন ভাড়া পাওয়া যায়, ফেরার রাস্তাও কাছে। এই সুবিধা অন্য কোনো এলাকায় তেমন নেই।’
আজকের তেজগাঁও: সংকট ও ঐতিহ্য
তেজগাঁওয়ে এখন আছে ৫০টির অধিক রিকশার গ্যারেজ। আজ তেজগাঁওয়ে রিকশার গ্যারেজ এবং ট্রাক স্ট্যান্ডের কারণে এলাকাটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শিল্পাঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরিত হচ্ছে তেজগাঁও, কিন্তু রিকশার সংখ্যা ও গ্যারেজের ঘনত্ব কমেনি। এক বাক্যে বলতে গেলে, সে প্রাচীন থেকে এই এলাকায় এখনো রিকশার রাজত্ব চলছে। সকাল-সন্ধ্যায় রিকশার উপস্থিতিতে তেজগাঁওয়ের গলিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তেজগাঁওয়ের রিকশা শুধু পরিবহন নয় এটা শিল্পায়নের স্মৃতি, শ্রমিকদের জীবিকা, বস্তির সংস্কৃতি এবং ঢাকার এক অমোঘ ঐতিহ্যের প্রতীক। ইউনেস্কো যে রিকশা ও রিকশাচিত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তার মধ্যে তেজগাঁওয়ের অবদান অনস্বীকার্য। এই এলাকা না থাকলে ঢাকার রিকশা সংস্কৃতি হয়ত এতটা সমৃদ্ধ হতো না।
তেজগাঁও শুধু একটি জায়গার নাম নয় এটা রিকশার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়। ক্রমে ক্রমে তেজগাঁওকে নিজ চোখে পরিবর্তন হতে দেখেছেন মোকাব্বের মিয়া। ৮০ বছর বয়সের ওই বৃদ্ধের চোখে তেজগাঁও এলাকা এখনো অনেক পুরোনো স্মৃতি বহন করে। তেজগাঁওয়ের রিকশার সাম্রাজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একসময় ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা ছিল, তেজগাঁওয়ের আশেপাশে বস্তিও ছিল। বিধায় অনেক আগ থেকেই লোকসমাগম প্রচুর ছিল। স্বাধীনতার পরেও তেজগাঁওয়ের ভেতরে তেমন কোনো ভালো রাস্তাঘাট বা মহাসড়ক ছিল না। ফলে রিকশার প্রচলন শুরু হয় তখন থেকেই।
আজও যখন সন্ধ্যায় তেজগাঁওয়ের গলিগুলোতে রিকশার লাইন দেখা যায়, তখন মনে হয় এটা শুধু পরিবহন নয়, এটা একটা সংস্কৃতি, একটা জীবিকা, একটা ঐতিহ্য। রিকশা আজও তেজগাঁওয়ের সেই পুরোনো শক্তিকে বহন করে চলেছে। ঢাকার অন্য কোনো এলাকায় এতটা ঘনীভূতভাবে রিকশার এই সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি। তেজগাঁও তাইতো চলছে ‘রিকশার রাজত্ব’।
- আরও পড়ুন
সদরঘাট: যেখানে প্রতিদিন গড়ে ওঠে হাজারো জীবিকার গল্প
চাকরির পাশাপাশি সাইক্লিং-ম্যারাথনে অনন্য সাফল্য মামুনের
কেএসকে
What's Your Reaction?