তেলের লাইন ছোট হবে; তেলেসমাতির কারণ জানাবে কে?

দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পরপরই বিএনপিকে ভোগাচ্ছে জ্বালানি তেলের সংকট—যে সংকটকে বিএনপি তথা সরকার ‘সংকট’ বলেই স্বীকার করে না। অথচ সংকট মোকাবিলায় সংসদে ১০ সদস্যদের একটি কমিটিও করা হয়েছে—যে কমিটিতে আছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য। গত ২৩ এপ্রিল বিকালে সংসদ অধিবেশনে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে এই কমিটি করা হয়। কমিটিতে আরও আছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সরকারি দলের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, মইনুল ইসলাম খান শান্ত এবং মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। বিরোধীদল থেকে আছেন সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম, মো. আব্দুল বাতেন, মো. নূরুল ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও মোহাম্মদ আবুল হাসান। প্রশ্ন হলো, সরকার যেখানে শুরু থেকেই বলে আসছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা অর্জন এবং নাগরিকদের প্যানিক বায়িং তথা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাটাকাটার জন্যই এই সংকট—তখন সংসদে কেন এরকম একটি কমিটি করতে হলো? কমিটিতে যারা আছেন, তাদের মধ্যে জ্বালানিমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নন বা এই ক্ষেত্রে তাদের কাজের কোনে

তেলের লাইন ছোট হবে; তেলেসমাতির কারণ জানাবে কে?

দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পরপরই বিএনপিকে ভোগাচ্ছে জ্বালানি তেলের সংকট—যে সংকটকে বিএনপি তথা সরকার ‘সংকট’ বলেই স্বীকার করে না। অথচ সংকট মোকাবিলায় সংসদে ১০ সদস্যদের একটি কমিটিও করা হয়েছে—যে কমিটিতে আছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য।

গত ২৩ এপ্রিল বিকালে সংসদ অধিবেশনে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল মাহমুদ টুকুর সভাপতিত্বে এই কমিটি করা হয়। কমিটিতে আরও আছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, সরকারি দলের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, মইনুল ইসলাম খান শান্ত এবং মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু। বিরোধীদল থেকে আছেন সংসদ সদস্য মো. সাইফুল আলম, মো. আব্দুল বাতেন, মো. নূরুল ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও মোহাম্মদ আবুল হাসান।

প্রশ্ন হলো, সরকার যেখানে শুরু থেকেই বলে আসছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অধিক মুনাফা অর্জন এবং নাগরিকদের প্যানিক বায়িং তথা আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাটাকাটার জন্যই এই সংকট—তখন সংসদে কেন এরকম একটি কমিটি করতে হলো? কমিটিতে যারা আছেন, তাদের মধ্যে জ্বালানিমন্ত্রী ছাড়া অন্য কেউ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ নন বা এই ক্ষেত্রে তাদের কাজের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে বলে শোনা যায় না। ফলে এই কমিটি সত্যিই সমস্যা সমাধানে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। তবে সরকারি ও বিরোধী দল থেকে সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে এরকম একটি কমিটি গঠন সংসদীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক।

যদিও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সংসদে এই কমিটি গঠনের পরদিনই ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা চাপ থাকলেও দেশে বড় কোনো সংকট নেই। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার ফলে সমগ্র বিশ্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশে তেলের সরবরাহে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হয়নি। বরং কিছু অসাধু মহলের অনৈতিক ব্যবসার কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। তেল নিয়ে কালোবাজারি ও অসাধু সিন্ডিকেট রুখতে প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মির্জা ফখরুল এবং জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের বক্তব্য শুরু থেকেই মোটামুটি একইরকম যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে পাম্পগুলোর আশেপাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল চোখে পড়ার মতো। সরকার একদিকে বলছে সংকট নেই, অন্যদিকে যানবাহনের এই দীর্ঘ সারিতে মানুষের ভোগান্তির চিত্র বিপরীতমুখী।

বস্তুত তেল পেতে মানুষের এই লম্বা লাইনও একটি বড় সংকট। সেই সংকটি চাহিদার তুলনায় পণ্যের সরবরাহ কমের কারণে নাকি মানুষের প্যানিক বায়িং অথবা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা নাকি বিপুল পরিমাণ তেল পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে এই সংকট—সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই খুঁজতে হবে। তার বিভিন্ন গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই এটা বলতে হবে যে, এটি কোন ধরনের সংকট। কিন্তু সংকট নেই বা ছিল না—এ কথা বলার সুযোগ নেই। বরং সংকট স্বীকার করে নিয়েই সমাধান বের করতে হয়। জ্বালানি তেলের সংকট না থাকলে কেন অনেক পাম্প দিনের পর দিন বন্ধ; কেন পাম্পগুলো দৈনিক চাহিদা অনুযায়ী তেল পায়নি, সেই প্রশ্নও জনমনে রয়েছে।

সরকারের তরফে বারবার যে যুক্তিটা দেয়া হয়েছে সেটি হলো, মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কেনার কারণে চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এটি হয়তো ঠিক। কিন্তু সেইসাথে বিভিন্ন পাম্প থেকে নির্ধারিত দামে তেল কিনে অনেকেই খোলা বাজারে দেড় থেকে দুই গুণ দামে তেল বিক্রি করে দিয়েছে, এমন অভিযোগও আছে। সংকটের সুযোগ নিয়ে পাম্প কর্মচারীদের একটি অংশ নানারকম অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনেককে তেল দিয়েছে—এমন অভিযোগও আছে। উপরন্তু আছে তেল পাচারের অভিযোগ। চতুর্থত, সংকটের দোহাই দিয়ে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। যে অভিযোগটা শুরু থেকেই পাম্প মালিকদের বিরুদ্ধে ছিল এবং অবশেষে তেলের দাম সত্যিই বাড়ানো হয়েছে।

কাকতালীয় হলেও সত্যি যে, তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকেই পাম্পের আশেপাশে যানবাহনের লাইন ছোট হতে শুরু করেছে। তার মানে পুরোটাই ছিল দাম বাড়ানোর কৌশল?

সংকটকে পুঁজি করে এই সময়ের মধ্যে কত লোক তেল পাচার করে কিংবা দেড় থেকে দুই গুণ দামে তেল বিক্রি করে অথবা নানারকম ফন্দিফিকির করে কত শত কোটি টাকা কামিয়ে নিলো, সেই তথ্য কি সরকারের কাছে আছে বা সরকার কি এই বিষয়গুলো অনুসন্ধান করছে?

আশার সংবাদ হলো, পাম্পের সামনে ও আশেপাশে যানবাহনের লাইন ছোট হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপে নিবন্ধনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ এবং তেলের দাম বাড়ার কারণে লাইন কমে গেছে। কারণ সবাই এখনও ‘ফুয়েল পাস’ আপে নিবন্ধন করেননি এবং দাম বাড়ার কারণেও আগের মতো অনেকে আর তেল নিতে আসছেন না। সেইসাথে জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যানবাহনে তেল নেয়ার ক্ষেত্রে যে রেশনিং পদ্ধতি ছিল, সেটিও তুলে দেয়ার ফলে লাইন ছোট হয়েছে। কারণ এই যানবাহনগুলোকে এখন আর তেলের জন্য প্রতিদিনই লাইনে দাঁড়াতে হয় না। একসঙ্গে অনেক তেল নিতে পারে।

তার মানে আপাতত বোঝা যাচ্ছে যে, তিনটি কারণে তেলের লাইন ছোট হচ্ছে। ১. ফুয়েল পাস অ্যাপে নিবন্ধন, ২. রেশনিং তুলে দেয়া এবং ৩. তেলের দাম বৃদ্ধি।

প্রশ্ন হলো, এই লাইন আরও ছোট হতে হতে আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কতদিন লাগবে? সেইসাথে গত দেড় মাস ধরে জ্বালানি তেল নিয়ে যে তেলেসমাতি চলছে, সেই সুযোগ নিয়ে কত লোক কত শত কোটি টাকা মুনাফা তুলে নিলো, সেটি জানা যাবে কি না? এই তেলেসমাতির সঙ্গে যুক্ত দুষ্ট লোকদের ধরা হয়েছে কি না বা ধরা হবে কি না? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, সরকারের কেউ কেউ এরকম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সরকারকে বিব্রত করতে বা বিপদে ফলেত কোনো একটি গোষ্ঠী এই কৃত্রিম সংকট তৈরির পেছনে ইন্ধন দিয়েছে। সেখানে সরকারের সাথে যুক্ত কেউ কেউ (গুপ্ত) থাকতে পারে বলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। যদিও এর সবই পারসেপশন। পারসেপশন তৈরির পেছনে যেমন অনেক সময় কোনো না কোনো বাস্তবতা থাকে, তেমনি অনেক সময় বিনা কারণেই পারসেপশন তৈরি হতে পারে। জ্বালানি তেল নিয়ে সত্যিই কী হয়েছে বা এখনও কী হচ্ছে, তা সত্যিই এখনও পরিষ্কার নয়। পরিষ্কার করতে হবে।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow