দর্শনার্থীর চোখ জুড়ায় যেসব দুর্লভ গাছ

খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল অচেনা ও দুর্লভ গাছে শোভিত আনন্দ মোহন কলেজের আঙিনা, যেন জীবন্ত উদ্ভিদ পাঠাশালা। এত বাহারি প্রজাতির বৃক্ষ আমাদের ক্যাম্পাসে আছে, সেটা কখনো ভাবিনি। ক্যাম্পাসের শেষপ্রান্তে নোংরা ও লতাপাতা ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতেই পরিবেশকর্মী রাতুল মুন্সি পরিচয় করিয়ে দিলেন অবহেলা ও অযত্নে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণবট ও রুদ্রাক্ষ গাছের সঙ্গে। প্রবেশপথের উভয় প্রান্তে আছে ছাতিম গাছ। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্তমঞ্চের পাশে সারি সারি বোতল ব্রাশ। বৈচিত্র্যময় গাছগুলো ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়েছে। কৃষ্ণবট একসময় বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে বেশ কয়েক প্রজাতির বটবৃক্ষের দেখা মিলতো। সময়ের পরিক্রমায় এখন বটগাছের দেখা পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন জায়গায় এখনো দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে বটবৃক্ষ। তেমনই একটি বটগাছ আনন্দ মোহন কলেজ ক্যাম্পাসে আছে। যদিও গাছটা খুব একটা বৃহৎ নয়। তবে এটি সাধারণ বটগাছের তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির। গাছটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর পাতা। পাতা এতটাই নিখুঁত যে, প্রথম দেখাতেই মনে হবে কেউ যেন টেনে আঠা দিয়ে জুড়ে পকেট তৈরি করে দিয়েছে। এ অদ্ভুত আকৃতিই কৃষ্ণবটকে অন্যান্য বটগাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। এর পাতা ৮

দর্শনার্থীর চোখ জুড়ায় যেসব দুর্লভ গাছ

খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল

অচেনা ও দুর্লভ গাছে শোভিত আনন্দ মোহন কলেজের আঙিনা, যেন জীবন্ত উদ্ভিদ পাঠাশালা। এত বাহারি প্রজাতির বৃক্ষ আমাদের ক্যাম্পাসে আছে, সেটা কখনো ভাবিনি। ক্যাম্পাসের শেষপ্রান্তে নোংরা ও লতাপাতা ঠেলে সামনে এগিয়ে যেতেই পরিবেশকর্মী রাতুল মুন্সি পরিচয় করিয়ে দিলেন অবহেলা ও অযত্নে বেড়ে ওঠা কৃষ্ণবট ও রুদ্রাক্ষ গাছের সঙ্গে। প্রবেশপথের উভয় প্রান্তে আছে ছাতিম গাছ। সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুক্তমঞ্চের পাশে সারি সারি বোতল ব্রাশ। বৈচিত্র্যময় গাছগুলো ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বহুগুণে বাড়িয়েছে।

কৃষ্ণবট

একসময় বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে বেশ কয়েক প্রজাতির বটবৃক্ষের দেখা মিলতো। সময়ের পরিক্রমায় এখন বটগাছের দেখা পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন জায়গায় এখনো দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছে বটবৃক্ষ। তেমনই একটি বটগাছ আনন্দ মোহন কলেজ ক্যাম্পাসে আছে। যদিও গাছটা খুব একটা বৃহৎ নয়। তবে এটি সাধারণ বটগাছের তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির। গাছটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর পাতা। পাতা এতটাই নিখুঁত যে, প্রথম দেখাতেই মনে হবে কেউ যেন টেনে আঠা দিয়ে জুড়ে পকেট তৈরি করে দিয়েছে। এ অদ্ভুত আকৃতিই কৃষ্ণবটকে অন্যান্য বটগাছ থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

এর পাতা ৮ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতার বোঁটা ভাঙলে সেখান থেকে সাদা দুধের মতো আঠালো কষ ঝরে। কৃষ্ণবট গাছের আরেকটি চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এর পাতা বটের পাতার মতো সম্পূর্ণ ঝরে যায় না এবং সাধারণ বট গাছের মতো অনেক পাতা নিয়ে ঘন ছায়াও তৈরি করে না। এটি চিরসবুজ বৃহদাকার বৃক্ষ। গাছটি ৮ থেকে ২২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। ডালপালাগুলো এলোমেলোভাবে ছড়ায়। গাছের বয়স্ক ডাল থেকে অল্প কিছু ঝুরি নামে। এর ফল খুব ছোট, আকার মাত্র ১ থেকে ৩ মিলিমিটার। ফল পাকলে লাল হয়। কৃষ্ণবট গাছের আছে ঔষধি গুণ। এ গাছের শিকড়, ডালপালা, পাতা ও ফল থেকে বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করা হয়।

রুদ্রাক্ষ

কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের বামপাশে থোকা থোকা শুভ্র ফুল ও সুমিষ্ট ঘ্রাণে শিক্ষার্থীদের নজর কাড়ে রুদ্রাক্ষ। মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলো দেখে মনে হবে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে বিছিয়ে দিয়েছে ফুলের চাদর। বাংলাদেশে দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে রুদ্রাক্ষ অন্যতম। রুদ্রাক্ষ নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পৌরাণিক কাহিনি। চওড়া পাতাওয়ালা চিরসবুজ বৃক্ষ, যা ২০-৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। জলপাই বা বকুলের মতো ফুলের কুঁড়ি হয়। থোকায় থোকায় ফুল ফোটে। ফুলের রং হালকা ঘিয়া-সাদা। ফুল দেখতে অনেকটা জলপাই ফুলের মতো। পরিণত বা গাছ বড় হলে তার গোড়ায় ঝাউ ও শিমুল গাছের মতো অধিমূল জন্মে। ফল দেখতে গাঢ় নীল রঙের। এর ইংরেজি নাম ব্লুবেরি বিডস। ফলের ভেতরের শক্ত আবরণটিই রুদ্রাক্ষ, যার ওপর প্রাকৃতিকভাবে খাঁজ বা ‘মুখ’ থাকে।

বোতল ব্রাশ

সবুজ পাতার ভিড় ঠেলে উঁকি দিচ্ছে লাল রঙের ফুল। চির সবুজের মাঝে উজ্জ্বল লাল যেন প্রিয় মাতৃভূমির সাজে সজ্জিত। সচরাচর আমরা যেসব প্রচলিত ফুল দেখতে পাই; সেই ফুল থেকে যথেষ্ট ভিন্ন। প্রথম দেখাতেই আপনার মনে হতে পারে ব্রাশ বা বোতলের কথা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অনবদ্য সুন্দর ফুলটির নাম ‘বোতল ব্রাশ’। চিরহরিৎ গুল্ম বোতল ব্রাশ। ফুলগুলো উজ্জ্বল লাল রঙের সাথে রেশমি কোমল। ফুলের অগ্রভাগ আর নিচে থাকে সবুজ পাতা। মাঝারি ঝাড় জাতীয় এ বৃক্ষ ৬-১০ মিটার উঁচু হয়। ফুল ফোটার উপযুক্ত সময় বসন্ত। তবে শরৎকালেও ফুলের উপস্থিত লক্ষ্য করা যায়। হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ ফুলের।

এর আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়া। স্যাঁতস্যাঁতে বা ভেজা মাটিতে এ গাছ বেশি জন্মে। এর অনেকগুলো প্রজাতি আছে। গুল্ম প্রজাতির বোতল ব্রাশ সাধারণত কাদামাটি ও দোআঁশ এবং বালি মাটিতে ভালো হয়। মাটি মাঝারিভাবে উর্বর ও আর্দ্র কিন্তু ভালো নিষ্কাশনযুক্ত হতে হবে। চির সবুজ ঝোপাকৃতির গাছটি ৪০-১৫০ বছর পর্যন্ত টিকতে পারে। তবে গাছ খুব বেশি উঁচু হয় না। সেই সাথে মন্থর গতিতে বাড়ে। এটি বাংলাদেশে মূলত সৌখিন গাছ হিসেবেই সমাদৃত। সরু ডালের আগায় গুচ্ছবদ্ধভাবে ফুল ফোটে। নিখুঁত এ ফুল। প্রতিটি একক ফুলেই পুরুষ ও নারী অংশ থাকে। বছরে কয়েকবার ফুল ফোটে। বেশিরভাগ লাল ফুল দেখা গেলেও এ ফুল কিন্তু হালকা সুবজাভ সাদা রঙেরও হয়ে থাকে।

ছাতিম

ক্যাম্পাসের প্রবেশমুখের দুপ্রান্তে দুটি ছাতিম গাছ পথচারীদের ছায়া দিচ্ছে। তেমন বড়সড় না হলেও তপ্ত রৌদ্রময় সময়েও পথচারীরা এখানে এসে স্বস্তি পায়। গাছের নিচে ক্লান্ত রিকশা ও মিশুক চালকেরা গাড়ি থামিয়ে আরাম করে নেয়। এর সুঘ্রাণ ভরা ফুলে দর্শনার্থীরা সৌন্দর্যের পিপাসা নিবারণ করেন। এর থোকা থোকা ফুল ও ফলের সুঘ্রাণ পথচারীদের মোহমুগ্ধ করে রাখে। ছাতিম গাছ মূলত অ্যাপোসাইনেসি বর্গের অন্তর্ভুক্ত উদ্ভিদ। আদি নিবাস ভারত উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।

তবে গাছটি বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের সর্বত্র জন্মে। ছাতিম মূলাবর্তে সাতটি পাতা একসঙ্গে থাকে বলে সংস্কৃত ভাষায় একে ‘সপ্তপর্ণ’ বা ‘সপ্তপর্ণা’ নামে ডাকা হয়। গাছ ৪০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বহু শাখাবিশিষ্ট গাছটির ছাল গন্ধহীন, অসমতল ও ধূসর। পাতার ওপরের দিক চকচকে আর তলার দিক ধূসর। শাখার শীর্ষে সবুজে মেশানো সাদা রঙে থোকায় থোকায় ক্ষুদ্রাকৃতি ফুল ফোটে। বীজ লম্বাটে ডিম্বাকার ও কিনারায় আঁশ থাকে। শেষপ্রান্তে এক গোছা চুল থাকে। ছাতিম গাছের অভ্যন্তরে দুধের মতো সাদা এবং অত্যন্ত তেঁতো কষ প্রচুর থাকে। এর আছে অনন্য ঔষধি গুণ।

যেভাবে যাবেন

সময়-সুযোগ পেলে আপনিও ঘুরতে আসতে পারেন কলেজ ক্যাম্পাসে। দেখে নিতে পারেন বৃক্ষগুলো। কলেজটি ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে ছোটবাজার এলাকায় অবস্থিত। ঢাকা বা অন্য জেলা থেকে ট্রেনে বা বাসে ময়মনসিংহ শহরে এসে যে কোনো রিকশা বা অটোরিকশা যোগে সহজেই যাওয়া যায়। ময়মনসিংহ বড় স্টেশন থেকে কলেজের দূরত্ব খুব কম, যা রিকশায় ১০-১৫ মিনিটে যাওয়া সম্ভব।

লেখক: শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow