দামের চেয়ে দুষ্প্রাপ্যতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে রিজার্ভে সাময়িক স্বস্তি, অন্যদিকে ঋণের চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যাংকিং খাতে গভীর সংকট। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ তুলে ধরেছেন এমন এক কাঠামোগত সমস্যার চিত্র, যা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’। তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কীভাবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল যোগসূত্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, বৈষম্য ও আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। নতুন সরকারের জন্য তাই শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয় বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জই এখন সবচেয়ে বড়। জাগো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সে পরামর্শও দিয়েছেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন। জাগো নিউজ: নতুন সরকার অর্থনৈতিকভাবে কী ধরনের উত্তরাধিকার পেয়েছে? এম এম আকাশ: বর্তমান সরকার অনুকূল ও প্রতিকূল—উভয় ধরনের অর্থনৈতিক অবস্থা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। ইতিবাচক দিকের মধ্যে সবচ

দামের চেয়ে দুষ্প্রাপ্যতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে রিজার্ভে সাময়িক স্বস্তি, অন্যদিকে ঋণের চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও ব্যাংকিং খাতে গভীর সংকট। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদ ড. এম এম আকাশ তুলে ধরেছেন এমন এক কাঠামোগত সমস্যার চিত্র, যা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’।

তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে কীভাবে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল যোগসূত্র রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, বৈষম্য ও আস্থাহীনতার জন্ম দিয়েছে। নতুন সরকারের জন্য তাই শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা নয় বরং সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জই এখন সবচেয়ে বড়।

জাগো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের কোন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সে পরামর্শও দিয়েছেন বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাঈদ শিপন

জাগো নিউজ: নতুন সরকার অর্থনৈতিকভাবে কী ধরনের উত্তরাধিকার পেয়েছে?

এম এম আকাশ: বর্তমান সরকার অনুকূল ও প্রতিকূল—উভয় ধরনের অর্থনৈতিক অবস্থা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে। ইতিবাচক দিকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক অবস্থান। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর একসময় রিজার্ভ অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল। কারণ আগে যে উচ্চ রিজার্ভ দেখানো হতো তার মধ্যে পরিমাপের কারসাজি ও অস্থিতিশীলতা ছিল।

পরবর্তীসময়ে বিশেষ করে আইএমএফের মুদ্রার অবমূল্যায়ন সংক্রান্ত নীতিমালা অনুসরণ, রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধি ও রপ্তানি ত্বরান্বিত হওয়ার ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। তবে একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে।

জাগো নিউজ: নেতিবাচক উত্তরাধিকার হিসেবে প্রধান সমস্যাগুলো কী?

এম এম আকাশ: বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেড়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে কিস্তি পরিশোধের সময় রিজার্ভের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করবে। নতুন শর্তের কারণে মুদ্রার অবমূল্যায়নের চাপ বাড়তে পারে, ফলে আমদানি পণ্যের দাম বাড়বে এবং ‘কস্ট-পুশ’ ইনফ্লেশন (মূল্যস্ফীতি) বাড়বে। যদিও আপাতত রিজার্ভ থাকায় আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, তবুও তেল সংকটের ঝুঁকি রয়েছে- এক্ষেত্রে দামের চেয়ে দুষ্প্রাপ্যতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। সুযোগ নিতে পারে মজুতদাররা।

জাগো নিউজ: সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

এম এম আকাশ: নতুন সরকার একধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মধ্যে যাত্রা শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি তেলের দাম বাড়িয়ে দিলে সরকারকে হয়তো সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ও রেশনিংয়ের পথে যেতে হতে পারে।

জাগো নিউজ: দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যাগুলো কী কী?

এম এম আকাশ: সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ক্রোনি ক্যাপিটালিজম, যেখানে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, আমলা ও রাজনীতিবিদদের একটি ত্রিভুজ ক্ষমতা কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি ও বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে চলেছে। ১৯৭৫ সালের পর ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর সীমা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়। ফলে দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা, মানি লন্ডারিং ও পুঁজি পাচার বেড়েছে। কর ব্যবস্থার আওতায় তাদের আনা সম্ভব হয়নি।

জাগো নিউজ: ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলো কীভাবে দেখছেন?

এম এম আকাশ: ব্যাংকিং খাত এই ত্রিভুজ কাঠামোর সবচেয়ে বড় শিকার। সাধারণ মানুষের আমানত থেকে ঋণ দেওয়া হলেও বড় ঋণগ্রহীতারা তা পরিশোধ করেন না এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে শাস্তি এড়ান। অতীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংক বোর্ডগুলো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই লুটপাট পরিচালিত হয়েছে।

আরও পড়ুন

ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ৫-৬ হাজার, দ্রব্যমূল্যে প্রভাব পড়ার শঙ্কা
দোকানপাট, শপিংমল খোলা থাকবে ৭টা পর্যন্ত
৩ মাসের জ্বালানির মজুত নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার
জ্বালানি সংকট ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’, প্রভাব পড়বে দ্রব্যমূল্যে

অন্তর্বর্তী সরকার খেলাপি ঋণের প্রকৃত হিসাব প্রকাশ করে, ফলে হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে দাবি করা হয়। তবে পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে সমস্যা আড়াল করা হয়েছে। যেমন- ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট, গ্রেস পিরিয়ডসহ দীর্ঘমেয়াদি পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা পুরোনো সমস্যাকেই টিকিয়ে রেখেছে।

জাগো নিউজ: খেলাপি ঋণের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সম্পর্কে কী বলবেন?

এম এম আকাশ: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি থেকে কমে ১ লাখ ৪৬ হাজার ১০৭ কোটি টাকায় নেমেছে। বেসরকারি ব্যাংকে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৫ কোটি থেকে কমে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকায় এসেছে। বিদেশি ব্যাংকেও কিছুটা কমেছে। কিন্তু এটি মূলত পুনঃতফসিলীকরণের ফল—বাস্তবে সমস্যাটি রয়ে গেছে।

জাগো নিউজ: বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আপনার মত কী?

এম এম আকাশ: বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে চেষ্টা করলেও সফল হয়নি। বর্তমান সরকার গভর্নর অপসারণের ক্ষেত্রে কর্মচারীদের বিক্ষোভকে ব্যবহার করেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সংসদের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় এটি করা উচিত ছিল। এতে ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক বার্তা গেছে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

জাগো নিউজ: বিনিয়োগ পরিস্থিতি কেমন?

এম এম আকাশ: বিনিয়োগ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা হলেও বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ দশমিক ০৩ শতাংশ, যা দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। চার বছর ধরে এ হার কমছে। বিনিয়োগ না বাড়লে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

জাগো নিউজ: বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কী প্রয়োজন?

এম এম আকাশ: প্রথমে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। অনিশ্চয়তায় কেউ বিনিয়োগ করে না। বিদেশি বিনিয়োগ ‘শীতের পরিযায়ী পাখির মতো’—নিরাপত্তা ও মুনাফা না পেলে আসে না। তাই স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।

জাগো নিউজ: বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে কোন ধরনের সতর্কতা দরকার?

এম এম আকাশ: জ্বালানি ও বন্দর খাতের মতো কৌশলগত খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। এসব খাতের নিয়ন্ত্রণ হারালে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিনিয়োগকারীর উদ্দেশ্য ও শর্ত—দুটিই যাচাই করা জরুরি। সংসদে আলোচনা করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

জাগো নিউজ: চট্টগ্রাম বন্দর ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে আপনার মত কী?

এম এম আকাশ: লাভজনক প্রতিষ্ঠান বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যৌক্তিক নয়। চট্টগ্রাম বন্দর লাভজনকভাবে চলছিল, তারপরও তা বিদেশিদের হাতে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। এটি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। একইভাবে অতীতে আদমজী জুট মিলের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে ভুল হয়েছে।

জাগো নিউজ: সুদের হার ও শিল্প বিনিয়োগ প্রসঙ্গে কী বলবেন?

এম এম আকাশ: উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগের বড় বাধা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বেশি সুদে টিকে থাকতে পারে না। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো লক্ষ্যভিত্তিক কম সুদের নীতি গ্রহণ করা উচিত, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে।

জাগো নিউজ: সরকারের রাজস্ব নীতি সম্পর্কে আপনার পরামর্শ কী?

এম এম আকাশ: সরকারের ব্যয় মেটাতে প্রোগ্রেসিভ ট্যাক্সেশন চালু করতে হবে এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে আধুনিকায়ন করতে হবে। সম্পদ কর চালুর কথাও ভাবা যেতে পারে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতে খুবই কম। এটি বাড়ানো জরুরি, নইলে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে।

জাগো নিউজ: সার্বিকভাবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

এম এম আকাশ: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ সংগ্রহ করা এবং তা স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে উন্নয়নে ব্যবহার করা। অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

এমএএস/এএসএ/ এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow