দাম্পত্যকলহ এড়ানোর উপায়

সুখময় জীবনের সন্ধানে মানুষ দাম্পত্যসম্পর্কে জড়ায়। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে এক মধুময় সম্পর্কে জড়িয়ে দুজন মানুষ বুনতে থাকে স্বপ্নের জাল, গড়ে তোলে স্বপ্নের সংসার। আজীবন সেই স্বপ্নমাখা জীবন কাটানোর আশায় অকৃত্রিম ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে শুরু হয় তাদের বর্ণিল পথযাত্রা। কিন্তু কখনো দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। ভেঙে যায় স্বপ্নের প্রাসাদ। যে কোনো বিচ্ছেদই পীড়াদায়ক। তারপরও মানুষ বিচ্ছেদকে বরণ করে নেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে বিচ্ছেদ প্রবণতা কেন বাড়ছে? কেন মানুষ বৈবাহিক জীবন ছেড়ে একাকী জীবন বেছে নিচ্ছে? এটা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করেছেন। তবে যে কথাটি প্রায় সবাই বলছেন, তা হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব। বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, জীবন-দর্শন ও জীবনধারা, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা, বিনয় ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, সন্দেহপ্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা, পর্দা রক্ষা করা, পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকা, যৌতুকবিহীন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, শারীরিকভাবে অক্ষম হলে বিয়ে থেকে বিরত থাকা—এ সবই ধর্মীয় অনুশাসনের অন্তর্ভুক্ত। এসব মানা হয় না বিধায় প্রতিনি

দাম্পত্যকলহ এড়ানোর উপায়

সুখময় জীবনের সন্ধানে মানুষ দাম্পত্যসম্পর্কে জড়ায়। বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে এক মধুময় সম্পর্কে জড়িয়ে দুজন মানুষ বুনতে থাকে স্বপ্নের জাল, গড়ে তোলে স্বপ্নের সংসার। আজীবন সেই স্বপ্নমাখা জীবন কাটানোর আশায় অকৃত্রিম ভালোবাসা আর বিশ্বাস নিয়ে শুরু হয় তাদের বর্ণিল পথযাত্রা। কিন্তু কখনো দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। ভেঙে যায় স্বপ্নের প্রাসাদ। যে কোনো বিচ্ছেদই পীড়াদায়ক। তারপরও মানুষ বিচ্ছেদকে বরণ করে নেয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজে বিচ্ছেদ প্রবণতা কেন বাড়ছে? কেন মানুষ বৈবাহিক জীবন ছেড়ে একাকী জীবন বেছে নিচ্ছে? এটা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীরা নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করেছেন। তবে যে কথাটি প্রায় সবাই বলছেন, তা হচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসনের অভাব।

বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, জীবন-দর্শন ও জীবনধারা, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের হক সম্পর্কে সচেতনতা, বিনয় ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, সন্দেহপ্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা, পর্দা রক্ষা করা, পরপুরুষ বা পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও মেলামেশা থেকে বিরত থাকা, যৌতুকবিহীন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, শারীরিকভাবে অক্ষম হলে বিয়ে থেকে বিরত থাকা—এ সবই ধর্মীয় অনুশাসনের অন্তর্ভুক্ত। এসব মানা হয় না বিধায় প্রতিনিয়ত বিচ্ছেদের মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। ইসলামে ডিভোর্সের প্রতি নানাভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হালাল হচ্ছে তালাক।’ (ইবনে মাজা : ২০১৮)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘যে নারী তার স্বামীর কাছে বিনাকারণে তালাক প্রার্থনা করে, তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ পর্যন্ত হারাম।’ (ইবনে মাজা : ২০৫৫)।

দাম্পত্যজীবনে দুজনের মধ্যে মতের অমিল হতেই পারে। রাগ-অভিমান, মনোমালিন্য থাকতেই পারে। পৃথিবীতে সমস্যা যেমন হতে পারে, তেমনি থাকে উত্তরণেরও অনেক উপায়। এজন্য সাংসারিক জীবনে সমস্যার সৃষ্টি হলে সর্বপ্রথম তা উদ্ভবের কারণ চিহ্নিত করতে হবে। সম্ভাব্য সব সমাধানের পথে বিচরণ করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিশ্বাসের ভিত গড়ে তুলতে হবে। প্রথমত উভয়কেই ধৈর্য ধারণ করতে হবে এবং সন্দেহপ্রবণতা ছেড়ে দিতে হবে। একপক্ষ মানিয়ে চলবে আর অন্য পক্ষ ঔদ্ধত্য স্বভাবের হলে ‘শান্তি’ ও ‘সুখ’ নামক শব্দ সংসার থেকে বিদায় নেবে। এজন্য দুজনেরই ছাড় দেওয়ার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে। ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বৈবাহিক সম্পর্ক রক্ষায় প্রয়াসী হওয়া। তালাক ও বিবাহবিচ্ছেদের পর্যায়টি হচ্ছে সর্বশেষ পর্যায়, যা অনিবার্য প্রয়োজনের স্বার্থেই বৈধ রাখা হয়েছে। এজন্য যথাসম্ভব মনোমালিন্য দেখা দিলে নিজেরাই মিটমাট করে নেবে, যদি তা বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা হয়, তখন দুই পরিবার আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। বর্ণিত হয়েছে, ‘তাদের উভয়ের মধ্যে বিরোধ আশঙ্কা করলে তার (স্বামীর) পরিবার থেকে একজন ও তার (স্ত্রী) পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত করবে। তারা উভয়ে নিষ্পত্তি চাইলে আল্লাহ তাদের মধ্যে মীমাংসার অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা নিসা : ৩৫)। আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, উভয় সালিশ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মীমাংসা করে দেওয়ার সদুদ্দেশ্য রাখলে আল্লাহতায়ালা তাদের নেক নিয়ত ও সঠিক চেষ্টার বদৌলতে বনিবনা করে দেবেন। কাজেই বিবাহবিচ্ছেদের আগে এই কোরআনী শিক্ষা অনুসরণ করা কাম্য।

দাম্পত্য জীবন সুদৃঢ় রাখতে ও মধুময় করে তুলতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হয় স্বামীকে। দাম্পত্যের মেরুদণ্ড কীভাবে সুদৃঢ় থাকে সংসারের চাকা কীভাবে সচল থাকে—এটা স্বামীকেই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে লক্ষ করতে হবে। পৃথিবীর সফলতম স্বামী ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তার জীবনী আমরা অনুসরণ করতে পারি। রাসুল (সা.) নিয়মিতই স্ত্রীদের প্রশংসা করতেন। ভালো কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা ও অভিবাদন জানাতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-এর স্ত্রীদের মধ্যে থেকে খাদিজা (রা.)-এর চেয়ে অন্য কোনো স্ত্রীর প্রতি বেশি ঈর্ষা পোষণ করিনি। কারণ, রাসুল (সা.) প্রায় তার কথা স্মরণ করতেন এবং তার প্রশংসা করতেন।’ (বুখারি : ৫২২৯)। মনের বিষণ্নতা দূর করার জন্য মানুষ অন্যের কাছে নিজের প্রিয় মানুষটার সমালোচনা করে বেড়ায়। এতে করে সংসারে কলহ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয় এবং সুখ-শান্তি চলে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্রপশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সুরা হুমাজাহ : ১)। আর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দোষ বলে বেড়ানো তো আরও ভয়াবহ বিষয়।

সর্বশ্রেষ্ঠ রাসুল ও সমাজের নেতা হওয়া সত্ত্বেও ঘরের ভেতর আল্লাহর রাসুল স্ত্রীদের সাংসারিক কাজে সহযোগিতা করতেন। হজরত আসওয়াদ (রহ.) বলেন, আমি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, নবীজি (সা.) ঘরে থাকা অবস্থায় কী করতেন? তিনি বললেন, ঘরের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। অর্থাৎ, পরিবারের কাজে সহায়তা করতেন। অতঃপর সালাতের সময় হলে সালাতে চলে যেতেন।’ (বুখারি : ৬৭৬)। অনেক পরিবারে স্ত্রী সারা দিন হাড়ভাঙা খাটুনির পরও স্বামীর মন পায় না। সামান্য ত্রুটি চোখে পড়লেই স্বামীরা কথা শোনায়। এটা চরম অন্যায় ও জুলুম। স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করা উচিত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ভালো, যে তার পরিবারের কাছে ভালো। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি : ৩৮৯৫)। মনে রাখতে হবে, নারীকে সৃষ্টি করা হয়েছে পুরুষের অনুগামী করে। পুরুষ যেমন ব্যবহার করবে, নারীও অনুরূপ ব্যবহারে অভ্যস্ত হবে। পুরুষের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি নারীরও দায়িত্ব রয়েছে। তবে সংসারের পরিচালক হিসেবে প্রধান দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত। মহান আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow