দীর্ঘসূত্রতায় মামলার জট, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় শ্রমিকরা

অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো শ্রমিক। তাদের পরিশ্রমেই শিল্পের চাকা ঘোরে এবং গড়ে ওঠে উন্নয়নের স্থাপত্য। অথচ বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রতিনিয়ত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা। শ্রম আদালতে ন্যায়ের সন্ধান করতে গিয়ে বছরের পর বছর সিঁড়ি ভাঙছেন শ্রমিকরা। কেউ বকেয়া মজুরির দাবিতে, কেউ চাকরিতে পুনর্বহালের আশায়, আবার কেউ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মামলা করেছেন। সময় গড়ালেও শেষ হচ্ছে না বিচারপ্রক্রিয়া। মে দিবসের আগের দিনও সেই অপেক্ষাই রয়ে গেছে চট্টগ্রামের শ্রম আদালতে। মজুরি বকেয়া, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ না পাওয়া, বিমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া, নোটিশ ছাড়া চাকরিচ্যুতি, বকেয়া থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরিতে পুনর্বহাল, পাওনা আদায়, চুক্তি লঙ্ঘন, বেতন-ভাতা ও ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত নানা মামলা শ্রম আদালতে দায়ের হয়। সাধারণত শেষ ভরসা হিসেবে শ্রমিকরা এসব মামলা করেন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২১৬ ধারার (১২) উপধারা অনুযায়ী, শ্রম আদালতের যে কোনো মামলা দাখিলের ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে রায় দেওয়ার কথা। প্রয়োজনে কারণ উল্লেখ করে আরও ৯০ দিন সময় বাড়ানো যায়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের

দীর্ঘসূত্রতায় মামলার জট, ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় শ্রমিকরা

অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো শ্রমিক। তাদের পরিশ্রমেই শিল্পের চাকা ঘোরে এবং গড়ে ওঠে উন্নয়নের স্থাপত্য। অথচ বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রতিনিয়ত এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হন তারা।

শ্রম আদালতে ন্যায়ের সন্ধান করতে গিয়ে বছরের পর বছর সিঁড়ি ভাঙছেন শ্রমিকরা। কেউ বকেয়া মজুরির দাবিতে, কেউ চাকরিতে পুনর্বহালের আশায়, আবার কেউ ক্ষতিপূরণ না পেয়ে মামলা করেছেন। সময় গড়ালেও শেষ হচ্ছে না বিচারপ্রক্রিয়া। মে দিবসের আগের দিনও সেই অপেক্ষাই রয়ে গেছে চট্টগ্রামের শ্রম আদালতে।

মজুরি বকেয়া, কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ না পাওয়া, বিমা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া, নোটিশ ছাড়া চাকরিচ্যুতি, বকেয়া থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরিতে পুনর্বহাল, পাওনা আদায়, চুক্তি লঙ্ঘন, বেতন-ভাতা ও ট্রেড ইউনিয়ন সংক্রান্ত নানা মামলা শ্রম আদালতে দায়ের হয়। সাধারণত শেষ ভরসা হিসেবে শ্রমিকরা এসব মামলা করেন। অথচ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২১৬ ধারার (১২) উপধারা অনুযায়ী, শ্রম আদালতের যে কোনো মামলা দাখিলের ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে রায় দেওয়ার কথা। প্রয়োজনে কারণ উল্লেখ করে আরও ৯০ দিন সময় বাড়ানো যায়। অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে বহু মামলা বছরের পর বছর ঝুলে আছে।

আড়াই হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন

সরেজমিন তথ্যমতে, চট্টগ্রামের দুটি শ্রম আদালতে ২ হাজার ৫৩৯টি মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে প্রথম শ্রম আদালতে মামলা রয়েছে ১ হাজার ৬৭০ এবং দ্বিতীয় শ্রম আদালতে ৮৬৯টি। দুই আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে ২১টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিচারাধীন ২ হাজার ৫৩৯ মামলার মধ্যে ৩২৬ মামলা পাঁচ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। ১৪৯টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে।

নিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা বেশি

প্রথম শ্রম আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারিতে ১ হাজার ৩২৯ মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৬টি। নতুন করে দায়ের হয় ১৪টি। ফেব্রুয়ারি মাসে বিচারাধীন ১ হাজার ৩৪১টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৮ মামলা। নতুন দায়ের হয় ৩০টি। মার্চে ১ হাজার ৩৬৫ বিচারাধীন মামলার মধ্যে ১টি নিষ্পত্তি হয়। নতুনভাবে দায়ের হয় ৩৫টি। একেবারে ডিসেম্বরে তাকালে দেখা যায়, ডিসেম্বরে ১ হাজার ৬৪২ বিচারাধীন মামলার মধ্যে ৩টি নিষ্পত্তি হয়। নতুনভাবে দায়ের হয় ৩৫৬টি। এর মধ্যে ১২ মাসে বিচারাধীন ২৪৬ মামলা রয়েছে, যা পাঁচ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। এদিকে চলতি বছর জানুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত দেখা যায়, ৩ মাসে ১৬৭০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ১৫টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ১২টি মামলা। উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রথম শ্রম আদালতে স্থগিত রয়েছে ১২৮টি মামলা।
অন্যদিকে, দ্বিতীয় শ্রম আদালতেও একই চিত্র। 

এ বছরের জানুয়ারিতে ৮৩৭ মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১৮টি। নতুন করে দায়ের ২০টি। ফেব্রুয়ারিতে বিচারাধীন ৮৩৪টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১২টি। এর মধ্যে নতুন দায়ের ৯টি। মার্চে ৮৬৯ বিচারাধীন মামলার মধ্যে ৯টি নিষ্পত্তি হয়। নতুনভাবে দায়ের ৪৫টি। তিন মাসে বিচারাধীন ১১৮ মামলা রয়েছে, যা পাচ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। উচ্চ আদালতের নির্দেশে দ্বিতীয় শ্রম আদালতে স্থগিত রয়েছে ২১টি মামলা।  তবে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি(ADR) এর মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা একেবারেই নেই।

গত বছর জানুয়ারিতে ৫৪৩ টি মামলা বিচারাধীন ছিল। ডিসেম্বরে এসে তা পৌঁছে সংখ্যা দাঁড়ায়  ৮৩৫ টি মামলা। গত বছরেও ৫ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি এমন মামলা ছিল ১১৮টি যা চলতি বছরের মার্চ মাসেও পরিবর্তন হয়নি। এখনও ১১৮টিই রয়ে গেছে। 

সব মিলিয়ে দেখা গেছে, দ্বিতীয় শ্রম আদালতে গত এক বছরে (জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত) মামলার জট প্রকট আকার ধারণ করেছে। আদালতের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দায়েরকৃত মামলার তুলনায় নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত ধীর, যার ফলে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেও মামলার চাপ কমেনি। বছরের শুরুতে (জানুয়ারি) ৮৩৫টি মামলা নিয়ে কাজ শুরু হয়। মার্চ নাগাদ বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৯টিতে। এই তিন মাসে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে ৪৫টি, বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯টি।

আদালতে ফাঁকা বিচারপ্রার্থী, জটিলতা যেখানে

চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ এলাকার একটি সরকারি বাড়িতে দুটি শ্রম আদালতের কার্যক্রম চলে। সম্প্রতি সেখানে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন আইনজীবী, পেশকার, পুলিশ সদস্য ও কর্মচারী আছেন তবে বিচারপ্রার্থী কেউ নেই।

আইনজীবীরা বলছেন, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি, জবাব দাখিলে বারবার সময় নেওয়া এবং দীর্ঘ শুনানি প্রক্রিয়ার কারণে মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

এদিকে শ্রম আইনে বলা আছে, শ্রম আদালতের রায়, সিদ্ধান্ত বা রোয়েদাদ, প্রত্যেক ক্ষেত্রে মামলা করার তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে প্রদান করতে হবে। ৬০ দিনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে রায় দেওয়া সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ লিপিবদ্ধ করে আদালত সময়সীমা আরও ৯০ দিন বাড়াতে পারবেন। শ্রম আদালতে নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ঢাকায় শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করা যায়।

এক শ্রমিক প্রতিনিধি বলেন, যত দ্রুত বিচার পাওয়া যাবে, শ্রমিকদের জন্য ততই উপকার। কিন্তু বাস্তবে আমরা বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকি।

শ্রম আদালতে মামলা ঝুলে থাকার কারণ নিয়ে আইনজীবী, শ্রমিক নেতা, ভুক্তভোগী ও আদালত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মামলার তুলনায় আদালতের সংখ্যা কম। এ ছাড়া মালিকপক্ষের আইনজীবীরা মামলা বিলম্বে নানা যুক্তি দাঁড় করান। শ্রম আদালতের কার্যক্রমে বিচারককে বলা হয় চেয়ারম্যান।চট্টগ্রাম প্রথম শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান জেলা ও দায়রা জজ ওসমান গনি। দ্বিতীয় শ্রম আদালতের চেয়ারম্যান সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. বেগম জেবুন্নেছা। 

প্রথম শ্রম আদালতের বেঞ্চ সহকারী আলী নেওয়াজ কালবেলাকে বলেন, এই আদালতের আওতায় রয়েছে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলার আনোয়ারা, কর্ণফুলী, চন্দনাইশ, পটিয়া, ফটিকছড়ি, বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড, সন্দীপ ও সাতকানিয়া উপজেলা এবং কর্ণফুলী, কোতোয়ালি, হালিশহর, খুলশী, বায়েজিদ বোস্তামী, আকবর শাহ্, চকবাজার, পাঁচলাইশ ও পাহাড়াতলী এলাকা। দ্বিতীয় শ্রম আদালত সূত্র জানায়, এ আদালতের আওতায় রয়েছে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী, মিরসরাই, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, লোহাগাড়া, হাটহাজারী উপজেলা এবং ডবলমুরিং, বাকলিয়া, সদরঘাট, চাঁদগাঁও, বন্দর, পতেঙ্গা ও ইপিজেড থানা।

বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধানগুলো কতটা সহায়ক হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিল্লোল সাহা কালবেলাকে বলেন, শ্রম আদালতের ওপর মামলার অতিরিক্ত চাপ ও দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। 

তার মতে, শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন সংস্কৃতি ও কার্যকর কালেকটিভ বার্গেনিং প্রক্রিয়া গড়ে তোলা এবং সেগুলোর যথাযথ চর্চা নিশ্চিত করা গেলে আদালতে মামলার প্রবাহ স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। 

কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সরকারের চালু করা হেল্পলাইন ১৬৩৫৭ সম্পর্কে শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow