দুই দশক পর বিএনপির বাজেট পরীক্ষা নাকি সুযোগ?

ঠিক দুই দশক আগে ২০০৬–০৭ অর্থবছরে সবশেষ বাজেট উপস্থাপন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার সেই বাজেট ছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ১২তম ও শেষ বাজেট। ২০ বছর আগের সেই বাজেটে বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনকে উপস্থাপন করা হয়েছিল মূলত শাসন সংস্কার, উন্নয়নমূলক অর্থনীতি ও জাতীয়তাবাদী উন্নয়ন চিন্তার সমন্বয় হিসেবে। এতে বলা হয়েছিল, বিএনপি এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছে যখন দেশ অর্থনৈতিক সংকট ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু তারা প্রতিবারই সে পরিস্থিতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে এনেছে। বিএনপি শাসনামলে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে, এমন দাবি করা হয়েছিল বাজেট বক্তৃতায়। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিএনপির দর্শনে বেসরকারি খাতনির্ভর উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। যেখানে উৎসাহিত করা হয়েছিল বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে। আরও পড়ুন এবারের বাজেটে রাজস্বে বড় বাজি, ঘাটতিও বড় সে সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, যেখানে নারী, যুবসমাজ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠ

দুই দশক পর বিএনপির বাজেট পরীক্ষা নাকি সুযোগ?

ঠিক দুই দশক আগে ২০০৬–০৭ অর্থবছরে সবশেষ বাজেট উপস্থাপন করেছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খালেদা জিয়া। ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার সেই বাজেট ছিল তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের ১২তম ও শেষ বাজেট।

২০ বছর আগের সেই বাজেটে বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শনকে উপস্থাপন করা হয়েছিল মূলত শাসন সংস্কার, উন্নয়নমূলক অর্থনীতি ও জাতীয়তাবাদী উন্নয়ন চিন্তার সমন্বয় হিসেবে।

এতে বলা হয়েছিল, বিএনপি এমন সময়ে ক্ষমতায় এসেছে যখন দেশ অর্থনৈতিক সংকট ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত ছিল। কিন্তু তারা প্রতিবারই সে পরিস্থিতি থেকে দেশকে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে এনেছে। বিএনপি শাসনামলে বাংলাদেশ ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে সম্ভাবনাময় অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে, এমন দাবি করা হয়েছিল বাজেট বক্তৃতায়।

অর্থনৈতিক দিক থেকে বিএনপির দর্শনে বেসরকারি খাতনির্ভর উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। যেখানে উৎসাহিত করা হয়েছিল বিনিয়োগ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজারভিত্তিক অর্থনীতিকে।

সে সময় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, যেখানে নারী, যুবসমাজ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলা হয়। নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মতো সংস্কারের বিষয়ও উল্লেখ ছিল। সঙ্গে ছিল প্রযুক্তি গ্রহণ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে আধুনিক ও আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের ধারণা।

টানা প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে ছিল বিএনপি। এর মধ্যে ১৬ বছর আওয়ামী লীগ ও ১৭ মাসের একটি অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট দেখেছে দেশের মানুষ। দীর্ঘ বিরতির পর সরকার গঠন করে বিএনপি আজ (১১ জুন) আবার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সূত্রে দলটি পেয়েছে একটি নাজুক অর্থনীতি, যেখানে দুর্বল ব্যাংকিং খাত, স্থবির বিনিয়োগ, ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, নেতিবাচক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং যুদ্ধ ও সংঘাতজনিত বৈশ্বিক চাপ অর্থনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

দলের দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত এ বাজেট বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর সরকারে প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এমন এক সময়ে এই বাজেট আসছে, যখন সমাজের সব স্তরের মানুষের প্রত্যাশা তুঙ্গে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকারের সামনে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ। এ বাস্তবতায় সরকারকে একদিকে জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা এবং অন্যদিকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, বিএনপির দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থনৈতিক দর্শন ও নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ইতোমধ্যে অর্থনীতিতে সৃষ্ট চাপ ও অস্থিরতা প্রশমিত করতে কতটা সক্ষম হবে।

সবার নজর এখন এই বাজেটের দিকে—এটি কি প্রবৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে পারবে?

এই প্রেক্ষাপটে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গড় মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

এবার গুরুত্বপূর্ণ এ বাজেট উপস্থাপনের দায়িত্ব অভিজ্ঞ বিএনপি নেতা ও প্রবীণ অর্থনীতিবিদ আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ওপর ন্যস্ত। এটি তার প্রথম বাজেট উপস্থাপন। ফলে তার জন্যও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে বিএনপির সবশেষ দুই ক্ষমতার মেয়াদে ১০টি বাজেটই উত্থাপন করেছিলেন দলটির প্রয়াত নেতা এম সাইফুর রহমান। ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮১-৮২ সালের দুই অর্থবছরের বাজেটও উত্থাপন করেছিলেন তিনি।

নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের মূল দর্শন হলো নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিনিয়োগবান্ধব ও কল্যাণমুখী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলা। এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা পুনরুদ্ধার করে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য।

মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার

বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। একই সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের মাধ্যমে একটি কল্যাণকর রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি

এই বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি। দক্ষতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ বিকাশ এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো খাতে যথাযথ প্রকল্প নির্বাচন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো

স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়গুলোও এ বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে বিধিনিষেধ শিথিলকরণ, বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ ও বেসরকারি খাতকে আরও গতিশীল করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দর্শন হলো—‘উচ্চ প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সমন্বয়ে একটি আধুনিক, প্রতিযোগিতামূলক ও কল্যাণমুখী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা।’

ফলে এটি শুধু একটি আর্থিক দলিল নয়, বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থনৈতিক দর্শন ও নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থনৈতিক চাপ ও জনগণের প্রত্যাশা

সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদ—সবার চোখ এখন সংসদের দিকে। প্রশ্ন একটাই—এই বাজেটে কি মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটবে?

মূল্যস্ফীতির চাপে বিপর্যস্ত মানুষ

গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। খাদ্যপণ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। মূলত খাদ্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি এ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে কার্যকর বাজেট সহায়তা ও নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে এবং অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে বাজারে অর্থের প্রবাহ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার বিষয়টিও সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তাই সাধারণ মানুষের প্রধান প্রত্যাশা হলো এমন একটি বাজেট, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর বা শুল্ক আরোপ না করার দাবি রয়েছে ভোক্তাদের।

কর্মসংস্থানের রূপরেখা চান তরুণরা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অর্থনীতির চাহিদার তুলনায় অনেক কম। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও পর্যাপ্ত চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্য প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সঙ্গে শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী বেকারত্বের হার প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাপ বেশি। প্রকৃতপক্ষে বেকারত্বের হার আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।

এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবিত করা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক উদ্দীপনামূলক প্যাকেজ গ্রহণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি, যা দারিদ্র্য হ্রাস ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তাই তরুণরা এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করছেন, যেখানে নতুন শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ও রপ্তানিমুখী খাতের জন্য কার্যকর প্রণোদনা থাকবে।

বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম উদ্বেগের জায়গা হলো বেসরকারি বিনিয়োগের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ব্যবসায়িক আস্থার দুর্বলতা, বিনিয়োগের ধীরগতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের ক্রমবর্ধমান চাপকে প্রতিফলিত করে।

উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা এমন একটি বাজেট চান, যা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দেবে।

রপ্তানিতে ধারাবাহিক পতন

চলতি অর্থবছরের ১১ মাসের ৯ মাসেই রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে যা বাড়িয়েছে উদ্বেগ।

বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থরগতি, চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব—সব মিলিয়েই রপ্তানি খাত চাপে পড়েছে।

খেলাপি ঋণে ন্যুব্জ ব্যাংকিং খাত

নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোতে সম্মিলিতভাবে কু-ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা সরাসরি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, বাজেটে ব্যাংকিং খাত সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর অবস্থানের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।

সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু করহার বা ব্যয়ের অঙ্কের ওপর নয়; বরং এটি কতটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব পথনকশা দিতে পারে তার ওপর।

এখন দেখার বিষয়, সংসদে উপস্থাপিত বাজেট কতটা মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে এবং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক যাত্রার জন্য কতটা শক্ত ভিত তৈরি করতে সক্ষম হয়। 

যদি এই যাত্রা সঠিক পথে থাকে, তাহলে তা জনগণের মধ্যে নতুন করে আশা জাগাতে পারে। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু প্রতিশ্রুতিতে ভরা বাজেট বক্তৃতার ওপর নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়ন ও বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণের ওপর। জনগণের আস্থা ও সন্তুষ্টি ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে জনমনে অসন্তোষ। বিএনপির জন্য এ বাজেট আসলে পরীক্ষা নাকি নতুন সুযোগ- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আইএইচও/এএসএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow