দুই বছরেও অধরা মূল অস্ত্রধারীরা, বিচারের আশায় শহীদের স্বজনরা
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর একটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে হাজারো আন্দোলনকারী প্রস্তুত হচ্ছিলেন জোহরের নামাজের জন্য। ঠিক তখনই ট্রাংক রোডের দিক থেকে ছুটে আসে মুহুর্মুহু গুলি। মুহূর্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে চারপাশ, লুটিয়ে পড়েন একাধিক শিক্ষার্থী ও পথচারী। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই রক্তঝরা স্মৃতির আজ দুই বছর। তবে ২০২৬ সালের এই ৪ আগস্টেও স্বস্তি ফেরেনি মহিপালে গুলিতে নিহতদের পরিবার ও আহত আন্দোলনকারীদের মনে। সরকারের পতন হলেও ঘাতকদের মূল হোতা ও প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালানো বেশিরভাগ ক্যাডার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেদিনের রক্তঝরা স্মৃতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ফেনী। সংঘাত এড়াতে আন্দোলনকারীরা মহিপাল এলাকা বেছে নিলেও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা ট্রাংক রোড থেকে এসে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পাঁচজন। ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও দুজন। নিহতের তালিকায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, মো. মাহবুবুল হাসান, মো. সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাই
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর একটা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে হাজারো আন্দোলনকারী প্রস্তুত হচ্ছিলেন জোহরের নামাজের জন্য। ঠিক তখনই ট্রাংক রোডের দিক থেকে ছুটে আসে মুহুর্মুহু গুলি। মুহূর্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে চারপাশ, লুটিয়ে পড়েন একাধিক শিক্ষার্থী ও পথচারী।
২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সেই রক্তঝরা স্মৃতির আজ দুই বছর। তবে ২০২৬ সালের এই ৪ আগস্টেও স্বস্তি ফেরেনি মহিপালে গুলিতে নিহতদের পরিবার ও আহত আন্দোলনকারীদের মনে। সরকারের পতন হলেও ঘাতকদের মূল হোতা ও প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালানো বেশিরভাগ ক্যাডার এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সেদিনের রক্তঝরা স্মৃতি
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একদফা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেদিন উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ফেনী। সংঘাত এড়াতে আন্দোলনকারীরা মহিপাল এলাকা বেছে নিলেও আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা ট্রাংক রোড থেকে এসে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পাঁচজন। ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান আরও দুজন।
নিহতের তালিকায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, মো. মাহবুবুল হাসান, মো. সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাইদুল ইসলাম, জাকির হোসেন, অটোরিকশাচালক মো. সবুজ। এছাড়া চট্টগ্রাম ও ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রাণ হারান আরও চার ফেনীবাসী।
মামলার পাহাড়ে মূল আসামিরা অধরা
ফেনী মডেল থানা সূত্র জানায়, মহিপালের ঘটনায় ৭টি হত্যা ও ১৫টি হত্যাচেষ্টাসহ মোট ২২টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ২,১৯৯ জন, অজ্ঞাতনামা আসামি প্রায় ৪ হাজার জন। মামলায় মোট গ্রেফতার প্রায় ১২০০ জন, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন ১১ জন, চার্জশিট জমা হয়েছে ৩টি মামলায়।
হাইপ্রোফাইল আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ফেনীর সাবেক তিন সংসদ সদস্য। তবে পুলিশ এ পর্যন্ত সহস্রাধিক আসামিকে গ্রেফতার করলেও তাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজনই কেবল প্রকাশ্য হামলাকারী।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফুটেজে সেদিন অন্তত ৩০ জন ক্যাডারকে শটগান, পিস্তল ও রাইফেল উঁচিয়ে গুলি চালাতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে যুবলীগ নেতা সম্রাট ও নূর নবী মেম্বারের মতো হাতেগোনা কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও, বাকি অস্ত্রধারীরা এখনো আত্মগোপনে। উদ্ধার হয়নি তাদের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রও।
দুই শহীদের মায়ের আকুতি ও ক্ষোভ
মহিপালে নিহত শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণের মা ফাতেমা আক্তার শিউলি বলেন, ‘দুই বছর হয়ে গেল আমার শ্রাবণ নেই। ৪ আগস্ট সকালে ও যখন বের হয়, আমি বারবার বলছিলাম, বাবা আজ যাস না, চারদিকে খুব গণ্ডগোল। ও আমার হাতটা ধরে বলেছিল, মা আমরাতো কোনো অশান্তি করতে যাচ্ছি না, আমরা শুধু সত্যের পক্ষে কথা বলব। দুপুর গড়িয়ে আসার পর যখন একের পর এক গুলির খবর পেতে লাগলাম, আমার বুকটা কেঁপে উঠেছিল। বিকেলে হাসপাতালে গিয়ে দেখি আমার বাচ্চাটার রক্তে ভেসে যাচ্ছে শরীর। আজ দুই বছর পার হয়ে গেল, কিন্তু যারা আমার ছেলেকে কাঁচা বয়সে কেড়ে নিলো, তারা নাকি এখনো মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে! আমি টিভির পর্দায়, ছবিতে দেখেছি কারা অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালাচ্ছিল। পুলিশ তাদের কেন ধরতে পারছে না? আমার ছেলে তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু ঘাতকদের বিচার দেখে যেতে না পারলে এই বুকটা ঠান্ডা হবে না। আমি কোনো টাকা-পয়সা বা সান্ত্বনা চাই না, আমার ছেলের হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই।’
নিহত অটোরিকশাচালক মো. সবুজের মা বিবি খতিজা বলেন, ‘আমার সবুজতো কোনো দল করত না। ও ছিল আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনের সম্বল। দিন এনে দিন খাওয়া সংসার আমাদের। সেদিন মহিপালে ও অটোরিকশা নিয়ে গিয়েছিল একটু রুজির আশায়, কিন্তু ঘাতকদের একটা গুলি তাকে শেষ করে দিলো। ৫ আগস্টের পর সবাই বললো, দেশ স্বাধীন হইছে, এবার বিচার পাইবা। কিন্তু আজ দুইটা বছর হয়ে গেলো, আমার ছেলে হত্যার মূল অপরাধীরা ধরা পড়লো না। অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। সংসার চালানো তো দূরের কথা, ওষুধের টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছি। সরকার পরিবর্তন হইছে, কত কিছু বদলাইলো, কিন্তু আমাদের কান্নাতো থামলো না। আমার একটাই দাবি- আমার নিরপরাধ ছেলেরে যারা মারল, পুলিশ যেন অতি দ্রুত তাদের গ্রেফতার করে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলায়।’
সাবেক সমন্বয়ক ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব মুহাইমিন তাজিম বলেন, ‘সংঘাত এড়াতেই আমরা মহিপালে অবস্থান নিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলো। দুই বছর পরও জড়িতদের অনেকে এলাকায় ও দেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং হুমকি দিচ্ছে। বিচার ও নিরাপত্তা কোনটিই নিশ্চিত হয়নি।’
পুলিশ যা বলছে
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মূল ঘাতকদের গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী মডেল থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম জানান, অনেক অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করা গেলেও ব্যবহৃত অস্ত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানা যায়নি। সেগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ১২০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মূল অস্ত্রধারীদের বেশিরভাগই পলাতক, তবে তাদের গ্রেফতার ও ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নিহতদের পরিবার এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা চান জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, আহতদের পুনর্বাসন এবং অতি দ্রুত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এই গণহত্যার বিচার সম্পন্ন করা।
এফএ/এএসএম
What's Your Reaction?