নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় নিখোঁজের প্রায় দুই মাস পরও হদিস মেলেনি যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম শামীমের (৩৬)। গত ২ জুলাই বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তিনি। শামীমের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি তিনদিন পর স্থানীয় একটি সেতুর নিচে পানি থেকে উদ্ধার হলেও তার সন্ধান মেলেনি।
পরিবারের ভাষ্য, প্রতিপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতার আতঙ্কে বাড়ি থেকে ২ জুলাই বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন শামীম। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তাকে গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবারের সদস্যদের।
শামীম জেলার কেন্দুয়া উপজেলার গন্ডা ইউনিয়নের মনকান্দা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের আক্কাস মিয়ার ছেলে। শামীম ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য ও ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় কেন্দুয়ার মনকান্দা এম ইউ আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ এ এম এন মহিবুল্লাহ ও সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সেই বিরোধের জেরে গ্রামে দুটি পক্ষ হয়। মহিবুল্লাহের পক্ষে ছিলেন যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম আর সাইফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন মোস্তফা কামাল নামে অপর একজন। রফিকুল ও মোস্তফা প্রতিবেশী। ওই বিরোধের জেরে গত ৮ জুন দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজন আহত হন। দুই পক্ষেই থানায় মামলা করে।
রফিকুলের স্ত্রী নাজমা আক্তার বলেন, ‘গ্রামের মাদরাসার বিরোধ নিয়া গ্রামে দুইডা পক্ষ হইছে। এ নিয়া হামলা-মামলা চলতাছে। গত ২ জুলাই রাত সাড়ে ১২টা থাইক্কা আমার স্বামীর কোনো খোঁজ নাই। তার মোটরসাইকেল স্থানীয় সড়কের ব্রিজের নিচে থাইক্কা পুলিশ উদ্ধার করছে। নিখোঁজের সপ্তাহখানেক আগে প্রতিপক্ষ বাড়িত আইয়া অস্ত্রের মহড়া দিয়া প্রকাশ্যে কইয়া গেছে আমার স্বামীরে আর জীবিত রাখতো না। তারে গুম কইরালবো। তারে গুম করছে। আমি আমার স্বামীরে জীবিত বা মৃত ফেরত চাই।’
জানতে চাইলে মনকান্দা এম ইউ আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ এ এম এন মহিবুল্লাহ বলেন, ‘মাদ্রাসার একটি ঘটনায় গ্রামে সালিশ হয়েছিল। ওই সালিশে আমার একটি কথা নিয়ে গ্রামের একটি পক্ষ আমাকে মাদরাসায় আসতে বাধা দেয়। পরে ওই পক্ষের সঙ্গে মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম যোগ দিয়ে আমার কাছে ১৬ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে আমার পক্ষে রফিকুল কথা বলে। তাদের টাকা দিতে নিষেধ করে। এ নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে মারামারিও হয়। এরপর হঠাৎ একদিন রফিকুল নিখোঁজ হয়।’
রফিকুলের বাবা আক্কাস মিয়া বলেন, ‘নিখোঁজের একদিন আগে জোহরের নামাজ পড়ে আসার সময় সাইফুল মাস্টার ও মোস্তফা কামাল লোকজন নিয়ে আইয়া আমারে ধইয়া নিয়ে গেছিল। পরে পুলিশ আইয়া আমারে ছাড়ায়া দিছে। এই সময় আমারে কইছে আমারে, আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইবো। আমরার বাড়িতে হামলা করছে, আগুন দিছে। আমার ছেলেরে গুম করছে। আমার ছেলেরে আমি চাই।’
গন্ডা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল আলম ও সাংগঠনিক সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘নিখোঁজের প্রায় ২ মাস চলে গেলেও আমরা রফিকুল ইসলামের কোনো সন্ধান পাচ্ছি না। তাকে ফিরে পেতে চাই। আমরা প্রশাসনের প্রতি আস্থাশীল। আশা করছি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তারা আমাদের নেতাকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে। পরিকল্পিতভাবে যুবদল নেতা শামীমকে গুম করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোস্তফা কামালের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রফিক নিখোঁজের পর থেকে তারা বাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছেন।
তবে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘যুবদল নেতা নিখোঁজের বিষয় নিয়ে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত তাকে উদ্ধারের আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।’
কেন্দুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘নিখোঁজ রফিকুল ইসলামের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে হত ২৪ আগস্ট র্যাব সাইফুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেফতার করেছে। আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এইচ এম কামাল/এমএন/এমএস