দুর্যোগ-দরপতনে দিশাহারা কৃষক
খলায় স্তূপ করে রাখা ভেজা ধান। রোদ না থাকায় সেগুলোতে গজিয়েছে অঙ্কুর। পাশে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন ইটনার কৃষক কামরুল হাসান। তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছে। যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তিনি বিক্রি করছেন মাত্র ৬৫০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে যা মণে ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান। হতাশ কণ্ঠে এসব কথা জানান কামরুল হাসান। মলিন মুখে বলেন, ‘ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু, এই চিন্তায় আছি।’ হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। আরও পড়ুন:খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরুজ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধসবুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে
খলায় স্তূপ করে রাখা ভেজা ধান। রোদ না থাকায় সেগুলোতে গজিয়েছে অঙ্কুর। পাশে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেন ইটনার কৃষক কামরুল হাসান। তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। কিন্তু অতিবৃষ্টি আর উজানের ঢলে অর্ধেক ফসল তলিয়ে গেছে। যা বাঁচানো গেছে, তা-ও আধাপাকা অবস্থায় কাটতে হয়েছে। এখন সেই ধান তিনি বিক্রি করছেন মাত্র ৬৫০ টাকা মণে। উৎপাদন খরচের হিসাবে যা মণে ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
হতাশ কণ্ঠে এসব কথা জানান কামরুল হাসান। মলিন মুখে বলেন, ‘ঋণ শোধ করমু না সংসার চালামু, এই চিন্তায় আছি।’
হাওরাঞ্চলে এবার বোরো মৌসুমে প্রায় সব কৃষকের অবস্থাই এমন। সরকারিভাবে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা, অর্থাৎ মণপ্রতি ১৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।
আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে আবাদ হয়েছে এক লাখ ৪ হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে। জেলায় চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত লাখ ৯৬ হাজার ৬৮৬ টন, যার বড় অংশই আসবে হাওর থেকে। এর মধ্যে সোমবার বিকেল পর্যন্ত অতিবৃষ্টি ও ঢলে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় ৪৯ হাজার কৃষক।
‘রোদ নাই, ধান শুকায় না। খলাতেই নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারি গুদামে দিতে গেলে শুকনো ধান লাগে, চকচকে রং লাগে’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছর এ সময় ধানের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। কিন্তু এবার একদিকে দুর্যোগ, অন্যদিকে দামের পতন, দ্বিমুখী চাপে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচ যেখানে মণপ্রতি ১০০০-১২০০ টাকা, সেখানে ৭০০ টাকায় বিক্রি মানে মণপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা লোকসান।
অষ্টগ্রামের আলীনগর গ্রামের কৃষক তৌহিদ বলেন, ‘শ্রমিক সংকট, বাড়তি মজুরি, আবার জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টারও নামানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এখন বাঁচমু কেমনে? এভাবে চলতে থাকলে বাপ-দাদার পেশা কৃষি ছাড়তে হবে।’
জেলার কয়েকটি হাওর ঘুরে দেখা যায়, ইটনা, অষ্টগ্রাম, মিঠামইন, নিকলীসহ বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা। কোমর পানির মধ্যেই ধান কাটছেন কৃষকরা। খলায় এনে শুকাতে না পেরে ভেজা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অনেক জায়গায় সেই ধানে অঙ্কুর গজাচ্ছে।
মিঠামইনের গোপদীঘির গ্রামের কৃষক আলাল মিয়া বলেন, ‘ঋণ করে সাত বিঘা জমিতে ধানচাষ করেছি। খলায় আনার পর ৬০০-৭০০ টাকা দাম বলে। ভেজা ধান কেউ নিতে চায় না। সরকার ১৪৪০ টাকায় ধান কিনবে বলে শুনেছি, তবে সেই খবরও ঠিকমতো পাইনি। পেলেই বা কী, তলিয়ে যাওয়া ধানের রং ও ভালোমতো না শুকানোয় সরকারি গুদামে ধান নেবে না।’
নিকলীর কৃষানি আমেনা খাতুন বলেন, ‘রোদ নাই, ধান শুকায় না। খলাতেই নষ্ট হচ্ছে। বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। সরকারি গুদামে দিতে গেলে শুকনো ধান লাগে, চকচকে রং লাগে সেই সুযোগ তো এবার আমরা পাইনি।’
‘সরকারিভাবে মণপ্রতি ১৪৪০ টাকা দাম নির্ধারণ থাকলেও বাস্তবে সেই তার কোনো প্রতিফলন নেই। খলা থেকে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় ধান কিনে নিচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীরা’
ধান ব্যবসায়ী মজলু খাঁ বলেন, ‘ভেজা ধান কিনলে ঝুঁকি বেশি থাকে। শুকাতে খরচ, ওজন কমে যাওয়া ও মান নষ্টের কারণে কম দামেই ধান কিনছি।’
তবে কৃষকদের অভিযোগ, সংকটাবস্থার সুযোগে ফঁড়িয়ারা ইচ্ছেমতো দাম চাপিয়ে দিচ্ছে।
রোববার (৩ মে) থেকে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। জেলা খাদ্য বিভাগের তথ্য মতে, এলএসডির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে ও মূল্য ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে।
সরকারি গুদামে ধান দেওয়া নিয়ে জটিলতা
কিশোরগঞ্জের সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩ উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত মান বজায় থাকলে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে।
আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
এদিকে নির্ধারিত আর্দ্রতা বজায় রাখতে না পারায় অনেক কৃষকই সরকারি গুদামে ধান দিতে পারছেন না। পাশাপাশি অনেকেই এই কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না বলে জানা গেছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য না পৌঁছানো, ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা ও সংরক্ষণ সুবিধার অভাব, এই তিন কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, সরকারি দাম আর বাস্তব বাজারের মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি এখন কৃষকের অস্তিত্বের লড়াই। এই পরিস্থিতির নিরসনের ব্যবস্থা না নিলে কৃষিতে আগ্রহ হারাবে কৃষক।
ইটনার কৃষক কামরুল হাসানের কাতর কণ্ঠেও একই কথা শোনা গেলো। তিনি বলেন, ‘ধান ফলাইছি, কিন্তু দামে বিক্রি করতে পারছি না। এইভাবে আর কৃষিকাজে কতদিন টিকমু?’
কিশোরগঞ্জ পৌর মহিলা কলেজের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ে অস্থায়ী ধান শুকানোর ব্যবস্থা করা, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে দ্রুত ক্রয়, মোবাইল বা এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। এসব উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। না হলে কৃষকরা হতাশ হয়ে কৃষিতে আগ্রহ হারাবে। এতে খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দেবে।’
সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কৃষকরা যাতে সহজে সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন সেজন্য উপজেলায় উপজেলায় মাইকিংসহ সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি বিবেচনায় ১৫ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকা ধান সংগ্রহ কার্যক্রম এগিয়ে ৩ মে থেকেই শুরু করা হয়েছে।’
পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত মান বজায় রেখে ধান গুদামে দিতে হবে, এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।’
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা যাতে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করতে না পারে, সে বিষয়ে জেলা মনিটরিং কমিটির সভায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
এমএন/এএইচ/জেআইএম
What's Your Reaction?