নকশাখচিত অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ভুশন্ডা

প্রকৃতির নীরব ভাষা কখনো শব্দে নয়, ধরা দেয় রঙে আর গতির মায়ায়। সেই মায়ার এক অনন্য প্রকাশ প্রজাপতি, যারা শূন্যে ভেসে ভেসে দোদুল্যমান ছন্দে যেন রচনা করে চলে সৌন্দর্যের কাব্য। ছোট এই প্রাণীগুলো কেবল চোখজুড়ানো দৃশ্য উপহার দেয় না বরং পরিবেশের সুস্থতা ও ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। গ্রামবাংলার সবুজ মাঠ, ঝোপঝাড় কিংবা নদীপাড়ে হঠাৎ করে উড়ে বেড়ানো রঙিন প্রজাপতি মুহূর্তেই বদলে দেয় আশপাশের দৃশ্যপট। তাদের ডানার নকশা আর নীরব ওড়াউড়ি এনে দেয় প্রশান্তি, জাগিয়ে তোলে প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা। প্রকৃতির এই নিঃশব্দ সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয়, অলঙ্কারহীন সরলতাতেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত প্রাণবন্ততা।  কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গ্রামীণ জনপদে এমনই এক নান্দনিক উপস্থিতি নিয়ে বিচরণ করছে নকশাখচিত অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ‘ভুশন্ডা’। উপজেলার থানা কমপ্লেক্সের সামনের প্রকৃতিতে এদের বিচরণ চোখে পড়ে। প্রকৃতির এই রঙিন বাসিন্দারা শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং পরাগায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  স্থানীয়রা জানান, আগের তুলনায় প্রজাপতির সংখ্যা কিছুটা কমে এলো এখনো গ্রামীণ

নকশাখচিত অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ভুশন্ডা
প্রকৃতির নীরব ভাষা কখনো শব্দে নয়, ধরা দেয় রঙে আর গতির মায়ায়। সেই মায়ার এক অনন্য প্রকাশ প্রজাপতি, যারা শূন্যে ভেসে ভেসে দোদুল্যমান ছন্দে যেন রচনা করে চলে সৌন্দর্যের কাব্য। ছোট এই প্রাণীগুলো কেবল চোখজুড়ানো দৃশ্য উপহার দেয় না বরং পরিবেশের সুস্থতা ও ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করে। গ্রামবাংলার সবুজ মাঠ, ঝোপঝাড় কিংবা নদীপাড়ে হঠাৎ করে উড়ে বেড়ানো রঙিন প্রজাপতি মুহূর্তেই বদলে দেয় আশপাশের দৃশ্যপট। তাদের ডানার নকশা আর নীরব ওড়াউড়ি এনে দেয় প্রশান্তি, জাগিয়ে তোলে প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা। প্রকৃতির এই নিঃশব্দ সৌন্দর্য মনে করিয়ে দেয়, অলঙ্কারহীন সরলতাতেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত প্রাণবন্ততা।  কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার গ্রামীণ জনপদে এমনই এক নান্দনিক উপস্থিতি নিয়ে বিচরণ করছে নকশাখচিত অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি ‘ভুশন্ডা’। উপজেলার থানা কমপ্লেক্সের সামনের প্রকৃতিতে এদের বিচরণ চোখে পড়ে। প্রকৃতির এই রঙিন বাসিন্দারা শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং পরাগায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  স্থানীয়রা জানান, আগের তুলনায় প্রজাপতির সংখ্যা কিছুটা কমে এলো এখনো গ্রামীণ পরিবেশে এদের দেখা পাওয়া যায়। বিশেষ করে ফুলবিশিষ্ট প্রকৃতিতে এদের বিচরণ বেশি দেখা যায়। এদের বিচরণে প্রকৃতিও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সব বয়সী মানুষকেই আকৃষ্ট করে।  জানা গেছে, ‘ভুশন্ডা’ বা ‘ভূষণ্ডা’ প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম ইউথালিয়া অ্যাকোন্থিয়া। এর ইংরেজি নাম কমন ব্যারন। এটি লেপিডোপ্টেরা বর্গের, নিমফ্যালিডি পরিবারের এবং এউথালিয়া উপগোত্রের সদস্য। এরা মাঝারি আকারের প্রজাপতি। এই প্রজাপতির বাংলা অন্য নাম কপিলধনু। মাঝারি আকারের এ প্রজাপতির ডানার রং সোনালি বাদামি। এর ডানার ওপর জলপাই রঙের ছোপ রয়েছে। প্রসারিত অবস্থায় এ প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৫৫ থেকে ৮০ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের হয়ে থাকে। এরা বেশ দ্রুত উড়তে পারে।  এই প্রজাতি ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটান, বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়।  ভুশন্ডা প্রজাপতির স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের উভয় জানাতে কালো ছোট সাব-টার্মিনাল ছোপের সারি এবং উভয় ডানার সেল এ কালো রেখা দ্বারা আবৃত দুটি করে ছোপ থাকে। এদের পিছনের ডানার উপরিতলের কালো সাবটার্মিনাল ছোপগুলো সুস্পষ্ট এবং সমবণ্টিত। লেপিডোপ্টেরা বর্গের সদস্যদের মধ্যে ভুশন্ডা সবচেয়ে বেশি বিস্তার সম্পন্ন প্রজাতি। এদের ভোজ্য উদ্ভিদ আম গাছ এবং কাজুবাদাম গাছ এলাকায় এদের বেশি দেখতে পাওয়া যায়। একমাত্র শুকনো নিচু ঝোপঝাড় ও তৃণভূমি সম্পন্ন অঞ্চল ছাড়া বিভিন্ন প্রকারের বাসভূমিতে এদের বিচরণ পরিলক্ষিত হয়। সমতল ছাড়াও পার্বত্য অঞ্চলে ৪ হাজার ফুট উচ্চতা পর্যন্ত এদের দর্শন মেলে। ভুশন্ডা প্রজাপতি ভূমির কাছাকাছি নীচ দিয়ে ওড়ে। স্ত্রী ও পুরুষ উভয়েই মাটিতে অথবা গাছের পাতায় বসে ডানা মেলে রোদ পোহায়। এরা পাকা বা পচা ফল ও গাছের ডালের রসের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়। মাড-পাডল করার ব্যাপারে এরা দারুণ আগ্রহী। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পুরো বছরজুড়েই এদের সক্রিয়তা চোখে পড়ে।  ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. শঙ্খজিৎ সমাজপতি বলেন, প্রজাপতি পরিবেশের একটি সংবেদনশীল সূচক। তাদের উপস্থিতি নির্দেশ করে একটি এলাকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের স্বাস্থ্য। তাই প্রজাপতির আবাসস্থল রক্ষা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। নীরবে উড়ে বেড়ানো এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো যেন প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু দেখার নয়, সংরক্ষণেরও। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুল মতিন কালবেলাকে বলেন, প্রজাপতি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, কৃষি ব্যবস্থার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘ভুশন্ডা’সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতি ফুলের পরাগায়নের ভূমিকা রাখে, যা ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক। তবে এদের শুয়োপোকা পাতা খেয়ে ফসলের ক্ষতিসাধন করে থাকে। তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, ঝোপঝাড় ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তাই পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা, বিশেষ করে জৈব পদ্ধতি ও নিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে প্রজাপতির আবাসস্থল সংরক্ষণ করা জরুরি। এতে কৃষি উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্য উভয়ই টেকসই থাকবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow