নজরুলের চেতনা ও দর্শন: আমাদের জীবনে কতটা প্রবাহিত

2 days ago 6

প্রতি বছর ২৭ আগস্ট এলেই আমরা নজরুলকে স্মরণ করি। সরকারি-বেসরকারি নানা আয়োজনে কবির প্রয়াণ দিবস এবং জন্মজয়ন্তী দিবস পালন করি। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে একটি গভীর প্রশ্ন উঁকি দেয়, আমরা কি নজরুলের চেতনা ও দর্শনকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পেরেছি? নজরুল কি শুধুই একটি প্রতীকী নাম, নাকি তিনি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সক্রিয় অনুপ্রেরণা?

বিদ্রোহের চেতনা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ

কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি, যিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে সমধিক পরিচিত। তার বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’তে লিখেছেন-

‘আমি চির বিদ্রোহী বীর-বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি চির-উন্নত শির’

এই চেতনা ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক উচ্চারণ। কিন্তু আজকের বাংলাদেশ বা বর্তমান সমাজে এই বিদ্রোহের চেতনা কতটা জীবন্ত? আমরা কি নজরুলের মতো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার, নাকি শুধুই তার কবিতা পাঠ করে চুপচাপ থাকি? বর্তমানে অনেকেই নজরুলকে পাঠ করে, স্মরণ করে, উৎসব করে-কিন্তু তার বিদ্রোহী আত্মার অনুসরণ করে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাজনীতিতে, সমাজে কিংবা পরিবারে যখন অন্যায় হয়, তখন প্রতিবাদের বদলে চুপ থাকাই যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ফলে নজরুলের বিদ্রোহ যেন কেবল পাঠ্যপুস্তক বা আনুষ্ঠানিক বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নজরুলের বিদ্রোহ ছিল মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সাম্যের পক্ষে। আজ যদি আমরা তার চেতনা বাস্তবে ধারণ না করি, তবে সেটা শুধু কাগজে-কলমেই রয়ে যাবে। নজরুলকে সত্যিকারভাবে সম্মান জানাতে হলে আমাদেরকেও হতে হবে বিদ্রোহী-অন্যায়, অবিচার, গোঁড়ামি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে।

সাম্যের বাণী বনাম বর্তমান সমাজ

নজরুলের সাম্যবাদ ছিল তার দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। তার কবিতা, গান ও গদ্যে বারবার উঠে এসেছে ধর্ম-বর্ণ-জাতপাত নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও সমতার কথা। তিনি লিখেছেন-

‘গাহি সাম্যর গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’

এই একটিমাত্র বাক্যেই ফুটে ওঠে নজরুলের সাম্যের বাণী। নজরুল ধর্মীয় গোঁড়ামি ও জাতিভেদের কঠোর বিরোধিতা করেছেন। হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য বা নারী-পুরুষের অমর্যাদা-সবকিছুর বিরুদ্ধেই ছিল তার কলম। কিন্তু আমাদের সমাজে আজও ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণিভেদে বৈষম্য প্রকট। মন্দির-মসজিদে ভিন্ন ভিন্ন প্রবেশপথ, নারী-পুরুষের অসম বেতন, উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণের বিভেদ-এসব কি নজরুলের সাম্যের স্বপ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? নজরুলের সাম্যের বাণী আমাদের শুধু উৎসবে নয়, বাস্তব জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই তার স্বপ্নের মানবিক সমাজ গঠন সম্ভব হবে।

সাংস্কৃতিক সমন্বয়: হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য

নজরুল ছিলেন বাংলা সংস্কৃতির এক অসামান্য সেতুবন্ধন। তার গানে-কবিতায় হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ কিংবা ‘কালী কালী বলো রে আজ কালীর নাম’ উভয়ই তার সৃষ্টি। কিন্তু আমরা কি সেই দৃষ্টিভঙ্গি ধরে রাখতে পেরেছি? আজকের সমাজে আমরা ক্রমেই একটি বিভক্ত সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছি। ধর্মীয় বিভাজন, সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে সেই সমন্বয়ের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যাচ্ছে। নজরুলের উদার ও সম্প্রীতির দৃষ্টিভঙ্গি আজ উপেক্ষিত। কবির দর্শনে থাকা এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় আমাদের জন্য একটি পথনির্দেশ হতে পারে-যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও মিলনের বার্তা রয়েছে।

নারীর মর্যাদা: আজকের বাস্তবতা

কাজী নজরুল নারীমুক্তির অগ্রদূত ছিলেন। তিনি বাংলা সাহিত্যে নারীর মর্যাদা ও স্বাধীনতা নিয়ে উচ্চারণকারী অন্যতম কণ্ঠস্বর। তার রচনায় নারীর প্রতি অন্যায়, অবহেলা ও বৈষম্যের প্রতিবাদ যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নারীর শক্তি, সাহস ও সম্ভাবনার প্রশস্তি। তিনি লিখেছেন-

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

নজরুল নারীর কেবল সংসারের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকা মানেননি। তার কাব্যে নারী কখনো যোদ্ধা, কখনো বিপ্লবী, কখনো প্রেমিকা কিংবা দেবীরূপে প্রকাশিত। তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। বর্তমান বাস্তবতায় নজরুল যে নারীমুক্তির বিপ্লব শুরু করেছিলেন, তা কি বাস্তবে পূর্ণতা পেয়েছে? দুঃখজনকভাবে, না। সমাজে এখনো নারীরা বৈষম্যের শিকার-পারিবারিক, সামাজিক, এমনকি আইনি ক্ষেত্রেও। নারীর প্রতি সহিংসতা, অবহেলা, বঞ্চনা আমাদের চোখে প্রতিদিনই পড়ে। অতএব, নজরুলের যে বিপ্লব নারী মর্যাদার জন্য শুরু হয়েছিল, তা আজও অসম্পূর্ণ। তাকে পূর্ণতা দিতে হলে আমাদের ব্যক্তিজীবনে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে সেই চেতনা বাস্তবায়ন করতে হবে।

দারিদ্র্য ও মানবিকতা

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন শোষিত, বঞ্চিত ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের কবি। তার সাহিত্য ও সংগীতে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও মানবিকতার বার্তা। নজরুল দারিদ্র্যকে শুধু অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে দেখেননি, তিনি এটিকে একটি সামাজিক অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার রচনায় উঠে এসেছে-দরিদ্র মানুষও মর্যাদার অধিকারী, তারা কেবল সহানুভূতির নয়, সম্মানেরও দাবি রাখে। তিনি দারিদ্র্য কবিতায় লিখেছেন

‘হে দারিদ্র্য,
তুমি মোরে করেছো মহান, তুমি
মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান।
কণ্টক মুকুট শোভা। দিয়াছ তাপস,
অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।’

নজরুল ক্ষুধা, বঞ্চনা ও অবমাননার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন। ‘কাণ্ডারি হুঁশিয়ার’ কবিতায় তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরেন এবং অভিজাত শ্রেণির অবহেলা ও নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ জানান। তবে আজকের সমাজে কি আমরা নজরুলের মানবিকতা বাস্তবায়ন করেছি? দারিদ্র্য এখনো প্রকট, সমাজে শ্রেণিভেদ প্রকট এবং দরিদ্র মানুষের সম্মান এখনো অনেক ক্ষেত্রেই অবজ্ঞার পাত্র। ফলে নজরুলের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের কাছে আজও এক প্রাসঙ্গিক চ্যালেঞ্জ। নজরুলের মানবিক ও সাম্যের দর্শন অনুসরণ করলে আমরা একটি সহানুভূতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারি।

ধর্মনিরপেক্ষতা: অপব্যাখ্যার শিকার

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের একমাত্র কবি, যিনি সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী বহন করেছেন কাব্যে, গানে, প্রবন্ধে এবং নিজের জীবনে। তার ধর্মনিরপেক্ষতা নিছক মতাদর্শ নয়। বরং তা ছিল এক মানবিক দর্শন-যেখানে মানুষ তার ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে সম্মান ও মর্যাদা পায়। কবি ইসলামি গজল রচনা করেছেন, আবার শ্যামাসংগীত, কীর্তন ও শাক্ত পদাবলিও লিখেছেন। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই চেতনা তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। তার লেখায় ঈশ্বর ও আল্লাহর নাম পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে, যা তার অন্তর্নিহিত ধর্মীয় সহনশীলতার প্রমাণ। তবে এক শ্রেণির মানুষ এক শ্রেণি তাকে মুসলিম পরিচয়ে আবদ্ধ করে, শুধুই ইসলামী গানের রচয়িতা বলে দেখিয়েছে। অপরদিকে কেউ কেউ তার হিন্দু ভাবধারায় কাজ করাকে ধর্মান্তরের সন্দেহ বা অভিযোগেও রূপান্তর করেছে। রাজনৈতিকভাবে অনেকেই তাকে নিজেদের মতাদর্শের মুখপাত্র বানাতে চেয়েছে, যা নজরুলের সার্বজনীন দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বর্তমানে সমাজে অনেক সময় ধর্ম-বিরোধিতা হয়, আবার কখনো এক ধর্মকে অন্যের বিপরীতে খাড়া করা হয়। নজরুল এমন দ্বিচারিতার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি চাইতেন এক সহনশীল সমাজ-যেখানে ভিন্ন মত থাকবে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকবে না। আজকের দিনে তার দর্শনকে সঠিকভাবে বোঝা ও প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।

সাংস্কৃতিক বিমুখতা: নজরুলগীতি থেকে দূরে থাকা

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতা-যিনি ধর্ম, প্রেম, দেশপ্রেম, মানবতা, বিদ্রোহসহ জীবনের নানা দিক নিয়ে প্রায় ৪ হাজারের বেশি গান রচনা ও সুরারোপ করেন। যদিও এই সংখ্যা আট হাজারেরও বেশি, তবে তার বেশিরভাগই সংরক্ষণ করা যায়নি। এই গানগুলো ‘নজরুলগীতি’ নামে পরিচিত। একসময় নজরুলগীতি ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আজ ক্রমেই তা জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। বর্তমানে আধুনিক ও পশ্চিমা ধারার গানের প্রতি তরুণদের ঝোঁক বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ট্রেন্ডিং’ গান, রক, পপ, ডিজে সংস্কৃতি বা শর্ট ভিডিও কনটেন্টে নজরুলগীতির জায়গা নেই বললেই চলে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই নজরুলগীতি শুনেনি বা চেনেই না। তাছাড়া স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে নজরুলগীতির চর্চা সীমিত। টিভি, রেডিও বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তার গান এখন শুধু প্রয়াণ দিবস, নজরুল জয়ন্তী বা বিশেষ দিনে বাজানো হয়। সারাবছর তার গানের সঠিক পরিবেশনা বা প্রচার হয় না। অনেক শিল্পীও নজরুলগীতি শুদ্ধভাবে পরিবেশন করতে আগ্রহী নন বা প্রশিক্ষণ পান না। নজরুলগীতি কেবল সংগীত নয়, এটি একটি জীবনদর্শনের বাহক-যেখানে আছে সাম্য, প্রতিবাদ, প্রেম ও মানবতার মেলবন্ধন। এটিকে আবার জনপ্রিয় করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, নতুন সংগীতায়োজন, আধুনিক মিডিয়ায় প্রচার এবং তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দেওয়া জরুরি। নজরুলগীতি থেকে দূরে সরে যাওয়া শুধু একটি সাংস্কৃতিক পরাজয় নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও ঐতিহ্যের বিচ্যুতি। এই বিমুখতা দূর করতে হলে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সচেষ্ট হতে হবে।

বাস্তবজীবনে আমাদের নজরুলের চর্চা

ব্যক্তিগত স্তরে, প্রতিদিন নজরুলের একটি কবিতা বা গান পড়া/শোনা যায়। সম্ভব হলে তার দর্শন নিয়ে পারিবারিক আলোচনা চক্রের আয়োজন করা যায়। নজরুলের আদর্শে জীবন গড়ার ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা করতে হবে। সামাজিক স্তরে, স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনে নজরুল চর্চা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। যুবসমাজের জন্য নজরুল বিষয়ক কর্মশালার ব্যবস্থা করতে হবে। নজরুলের সাম্যবাদী চিন্তা সম্প্রসারণে সামাজিক মিডিয়ার সদ্ব্যবহার করা উচিত। শিক্ষা ব্যবস্থায়, পাঠ্যক্রমে নজরুলের দর্শনের গভীর প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘নজরুল মঞ্চ’ গঠন করা যায়। নজরুল গবেষণায় বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরুলের দর্শন বাস্তবায়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নজরুলের আদর্শে সমাজ সংস্কারের বিশেষ প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে।

নজরুলকে শুধু স্মরণ করব না, তাকে বাঁচিয়ে রাখব আমাদের চিন্তায়, কর্মে ও সংগ্রামে। যতদিন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি টিকে থাকবে, ততদিন নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা আমাদের পথ দেখাতে থাকুক।

‘আমি চিরন্তন, আমি যুগে যুগে আসি’ এই বিশ্বাসে আমরা নজরুলকে ধারণ করি, আমাদের সমাজের প্রতিটি কণায়।

কেএসকে/জিকেএস

Read Entire Article