নতুন সরকার দেশ কেমন চালাবে?
আলোচনার টেবিলে এখন একটাই আলাপ নতুন সরকার দেশ কেমন চালাবে? বদলে যাওয়া তারেক জিয়া গণমানুষের আশা কতটা পূরণ করতে পারবেন? দলটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখল রাজনীতি থেকে কতটা বের হয়ে আসতে পারবে? ১৭ বছর আগের বিএনপি কি পারবে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলোকে সারিয়ে তুলতে? তাছাড়া জামায়াতে ইসলাম এইবারই প্রথম বিএনপি’র বিরোধীদল হিসেবে যথেষ্টসংখ্যক আসন নিয়ে সংসদে বসতে যাচ্ছে। এর আগে জামায়াত বরাবরাই বিএনপি’র জোটে ছিল। কাজেই সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সেই হিসাবটাইবা কেমন হবে, সেটাও দেখার বিষয়। আওয়ামী সরকার চলে যাওয়ার পর গত দুই বছর নানাকারণে মানুষ কনফিউজড ছিল। বিশেষ করে মবের উত্থান, ঢালাও মামলা ও গ্রেফতার, জ্বালাও-পোড়াও, লাগাতার আন্দোলন, খুন-জখম, ছিনতাই নিয়ে মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। ফলে নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসাতে মানুষ নতুন করে হিসাব করতে শুরু করেছে। বিএনপি আগেও ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এবার নয়া নেতৃত্ব, নয়া অভিজ্ঞতা। তারেক জিয়া ১৭ বছর একটি সভ্য দেশে বাস করেছেন, স্বভাবতই তাঁর আচার-আচরণে ও কথাবার্তায় এর প্রভাব পড়েছে। আধুনিক রাজনীতিকে উনি রপ্ত করতে পারলে দলের লাভ। যদিও নেতার একার পরিবর্তনে খুব বড় কোনো অর্
আলোচনার টেবিলে এখন একটাই আলাপ নতুন সরকার দেশ কেমন চালাবে? বদলে যাওয়া তারেক জিয়া গণমানুষের আশা কতটা পূরণ করতে পারবেন? দলটি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখল রাজনীতি থেকে কতটা বের হয়ে আসতে পারবে? ১৭ বছর আগের বিএনপি কি পারবে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলোকে সারিয়ে তুলতে?
তাছাড়া জামায়াতে ইসলাম এইবারই প্রথম বিএনপি’র বিরোধীদল হিসেবে যথেষ্টসংখ্যক আসন নিয়ে সংসদে বসতে যাচ্ছে। এর আগে জামায়াত বরাবরাই বিএনপি’র জোটে ছিল। কাজেই সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সেই হিসাবটাইবা কেমন হবে, সেটাও দেখার বিষয়।
আওয়ামী সরকার চলে যাওয়ার পর গত দুই বছর নানাকারণে মানুষ কনফিউজড ছিল। বিশেষ করে মবের উত্থান, ঢালাও মামলা ও গ্রেফতার, জ্বালাও-পোড়াও, লাগাতার আন্দোলন, খুন-জখম, ছিনতাই নিয়ে মানুষ বেশ উদ্বিগ্ন ছিল। ফলে নির্বাচনের পর একটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসাতে মানুষ নতুন করে হিসাব করতে শুরু করেছে।
বিএনপি আগেও ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এবার নয়া নেতৃত্ব, নয়া অভিজ্ঞতা। তারেক জিয়া ১৭ বছর একটি সভ্য দেশে বাস করেছেন, স্বভাবতই তাঁর আচার-আচরণে ও কথাবার্তায় এর প্রভাব পড়েছে। আধুনিক রাজনীতিকে উনি রপ্ত করতে পারলে দলের লাভ। যদিও নেতার একার পরিবর্তনে খুব বড় কোনো অর্জন আসবে না, যতক্ষণ না তাঁর দল, বাকি নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনীর মন মেজাজ ও আচরণ পরিবর্তন হবে না। আবার অন্যভাবেও বলা যায় নেতা কঠোর হলে তিনি যেভাবে চাইবেন, দলকে সেভাবেই চালাতে পারবেন।
বিএনপি’র সামনে এবার বড় নজির আওয়ামী লীগের ১৭ বছরের শাসন। এই শাসনের মন্দ দিকগুলো খুঁজে বের করে, সেই পথে না যাওয়াটাই সবচেয়ে সহজ ও বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দুর্নীতি ও শাসন আঁকড়ে রাখার অভিযোগ আছে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, কাজেই সেদিকে দৃষ্টি দেয়া জরুরি।
আমরা সবসময় চাই সরকার জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হবে এবং জনগণের অধিকারকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন, গণমাধ্যম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
জানি এইসব দাবি খুব সহজে অর্জিত হওয়ার নয়। তবে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় চার নেতা ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার কাজটা খুব কঠিন হবে না। মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে এদেশে যে রাজনীতি করা যাবে না, গেল নির্বাচনে তা মানুষ প্রমাণ করেছে। বাংলাদেশের জন্য “রিসেট বাটন” নয়। যদি তাই হতো, তাহলে পুরোনো দল বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হতো না।
পাশাপাশি মব নিয়ন্ত্রণ, জঙ্গীবাদি তৎপরতা বন্ধ, নারীর অসম্মান রোধ করা, নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধার করা, রাস্তায় আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে নেওয়াটা খুব জরুরি। গত দুই বছরে অনেককিছু দুর্বল হয়ে গেছে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক অস্থিরতা মানুষের সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়, অর্থাৎ ডিসেনসিটাইজেশন তৈরি করে। যার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।
বিএনপি আগেও ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু এবার নয়া নেতৃত্ব, নয়া অভিজ্ঞতা। তারেক জিয়া ১৭ বছর একটি সভ্য দেশে বাস করেছেন, স্বভাবতই তাঁর আচার-আচরণে ও কথাবার্তায় এর প্রভাব পড়েছে। আধুনিক রাজনীতিকে উনি রপ্ত করতে পারলে দলের লাভ। যদিও নেতার একার পরিবর্তনে খুব বড় কোনো অর্জন আসবে না, যতক্ষণ না তাঁর দল, বাকি নেতৃত্ব ও কর্মীবাহিনীর মন মেজাজ ও আচরণ পরিবর্তন হবে না। আবার অন্যভাবেও বলা যায় নেতা কঠোর হলে তিনি যেভাবে চাইবেন, দলকে সেভাবেই চালাতে পারবেন।
যেহেতু সমস্যা অনেক, তাই নতুন সরকারকে অবশ্যই প্রায়োরিটি ঠিক করে নিতে হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এরমধ্যে খুব জরুরি। শিশু থেকে তরুণ সবারই পড়াশোনার দিক থেকে ইন্টারেস্ট সরে গেছে। পড়াশোনার পাশাপাশি চাই সহবত ফিরে আসুক। তারুণ্যের উদ্দাম থাকবে, আনন্দ থাকবে, সৃষ্টি থাকবে, রাজনীতি থাকবে কিন্তু বেয়াদবি নয়।
এর বাইরে নতুন সরকারের আরো অনেক প্রায়োরিটি আছে, থাকবে। কিন্তু পা ফেলতে হবে সাবধানে। কারণ চারিদিকেই গর্ত। আমরা নিজেদের চিনি। অপরিমিত সুযোগ পেলে আমরা কেমন হয়ে যাই, তাও জানি। জানি কীভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি যেতে হয় এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তির চোখ কালো কাপড়ে ঢেকে দিতে হয়। এমনভাবে তাঁর সামনে বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়, যা ভুল ও সাজানো।
নতুন নেতৃত্বের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ, অনেক দায়িত্ব। তবে জরুরি হচ্ছে তেলবাজদের কাছ থেকে দূরে থাকা। রাজনীতিতে তেলবাজি সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ। তেলবাজি এমন একটি রাজনৈতিক প্রথা, যেখানে কিছু মানুষ তাদের নেতা বা নেত্রীর অতিরিক্ত প্রশংসা করে, অন্যায় সমর্থন ও ভক্তি দিয়ে নেতা বা নেত্রীর ভুল কাজ বা ভুল সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়ন করানোর চেষ্টা করে।
দেশে, সমাজে ও রাজনীতিতে তেলবাজদের খপ্পরে পড়ে কর্মক্ষেত্র ও রাষ্ট্রচালনা করতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার অনেক ঘটনা ঘটেছে। এমনকি রাজ্যপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে একথাও সত্যি অফিসের বস থেকে রাষ্ট্রের প্রধান পর্যন্ত প্রায় সবাই তেলবাজদের তেলবাজিকে এনজয় করেন।
নেতৃত্বের প্রতি অযৌক্তিক, অতিরঞ্জিত প্রশংসা এবং সমর্থনের সংস্কৃতি এদেশে চলমান। যেখানে দলের লোকজন নেতার ভালো-মন্দ পর্যালোচনা না করে নেতাকে অনন্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই ধারণা নেতা নেত্রীকে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং সমালোচনামূলক রাজনৈতিক বিতর্ককে দুর্বল করে তোলে। এতে সমালোচনা করার পথ রুদ্ধ হয়। নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তকে কেউ সমালোচনা করে না বা করতে চায় না। ফলে কোনো প্রশ্ন তৈরি হয় না। নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্ত জনগণের জন্য ক্ষতিকর হলেও পাশ হয়ে যায়। চাটুকাররা মনে করেন তারা নেতা/নেত্রীর ইমেজ গঠনে নিয়োজিত, কাজেই তারা প্রায়শই নেতার কোনো ভুলকে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ওই নেতা বা নেত্রী।
নতুন সরকার প্রধানের কাছে আমরা প্রত্যাশা এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। সমালোচনাকে গ্রহণ করতে হবে, ভালো নিউজ ও ভিউজকে গুরুত্ব দিতে হবে, জনগণের কথা জনগণের মুখ থেকে শুনতে হবে এবং জনসংযোগ বাড়াতে হবে।
নেতা/নেত্রীকে মনে রাখতে হবে তেলবাজি সবসময় নেতার প্রতি ভালোবাসা বা সমর্থন নয়, এটি নেতাকে ভুলভাবে ক্ষমতাশালী করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। একটি শক্তিশালী সমাজে ও আধুনিক রাজনীতিতে সমালোচনা ও স্বতন্ত্র ব্যাখ্যার জায়গা থাকাটা খুবই জরুরি।
ব্যক্তিপূজার এই সংস্কৃতি সবার জন্যই ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। সুস্থ রাজনীতির জন্য দরকার যুক্তি, সমালোচনা ও জবাবদিহিতা সেখানে তেলবাজি এই তিনটিকেই দুর্বল করে দেয়। প্রধানকে খুশি করতে গিয়ে সত্য গোপন করা বা অর্ধসত্য বলা ঘোরতর ভুল।
ইতিহাস বলে সমালোচনা না থাকলে কোনো ভুল বা ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয় না। বরং ভুল স্থায়ী হয়ে সমস্যাকে জটিল করে তোলে। এর অসংখ্য প্রমাণ আছে। এভাবেই ব্যক্তি ও দল বড় হয়ে যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। আর প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্রের কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য। বছরের পর বছর এগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করছি কিন্তু নিজেদের জীবন, সমাজ ও দলে কার্যকর করতে পারিনি। এটাই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও পলিটিক্যাল বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। এর ফলে কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতার বদলে আনুগত্য মূল্য পায় এবং মেধাবীরা নিরুৎসাহিতবোধ করে।
শুধু রাজনৈতিক সেক্টরে নয় তেলবাজি চলে সর্বত্র। যারা কোনো কারণ ছাড়াই ক্ষমতাধর ব্যক্তির অতিরিক্ত প্রশংসা করেন অথবা প্রশংসা করে ফায়দা অর্জন করতে চান বা প্রশংসা করার যোগ্য না হলেও প্রশংসা করেন, এটা তাদের একধরনের আচরণগত প্রবণতা।
মানুষ উপরের নির্দেশে অনেক সময় নিজের নৈতিক বোধকেও উপেক্ষা করে। যেহেতু আমাদের মতো সমাজে রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যক্তিগত সুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, কাজেই রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরির সময় সচেতন হতে হবে। বুঝতে হবে এই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেন অপরিমিত প্রশংসা করছে বা সুবিধা দিচ্ছে?
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ, প্রযুক্তিগত বিস্তার এবং বৈশ্বিক সংযোগ সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ বেড়েছে। বিদেশি রাষ্ট্রগুলোও যার যার অ্যাজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে আসছে। সেখানে বাংলাদেশের স্বার্থকে প্রথমে রেখে দেন-দরবার করাটাও বড় চ্যালেঞ্জ হবে নতুন সরকারের পক্ষে।
নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা উন্নয়ন, ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু চায় না, শুধু চায় শান্তি, নিরাপত্তা, সামাজিক অস্থিরতার অবসান এবং দুইবেলা খাওয়ার সংস্থান। নতুন সরকার সফল হোক এই আমাদের প্রত্যাশা।
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
লেখক : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক।
এইচআর/এমএস
What's Your Reaction?