নতুন সরকারের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা

১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এখন সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দেখতে চাইবে তারা। স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই হতে পারে নতুন সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি। প্রথম একশ দিনের পদক্ষেপই অনেকটা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ। শক্তিশালী ম্যান্ডেটকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে এবং উন্নয়নকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান করতে হবে। সেই পথচলাই নির্ধারণ করবে আমাদের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিগন্ত। দেশবাসীর প্রত্যাশা বাস্তববাদী হলেও গভীর। তারা জানে সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়, কিন্তু তারা দেখতে চায় সঠিক উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতা। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের জন্য সুযোগও, আবার পরীক্ষাও বটে। এই শক্তি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণে ব্যবহৃত হয়, তবে আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে এগোতে পারে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিস্থিতি সবসময়ই জটিল। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক

নতুন সরকারের কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা

১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এখন সেই পরিবর্তনের বাস্তব রূপ দেখতে চাইবে তারা। স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠাই হতে পারে নতুন সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি। প্রথম একশ দিনের পদক্ষেপই অনেকটা নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ। শক্তিশালী ম্যান্ডেটকে দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে, গণভোটের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে এবং উন্নয়নকে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান করতে হবে। সেই পথচলাই নির্ধারণ করবে আমাদের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিগন্ত।

দেশবাসীর প্রত্যাশা বাস্তববাদী হলেও গভীর। তারা জানে সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়, কিন্তু তারা দেখতে চায় সঠিক উদ্যোগ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতা। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকারের জন্য সুযোগও, আবার পরীক্ষাও বটে। এই শক্তি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণে ব্যবহৃত হয়, তবে আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথে এগোতে পারে।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে পরিস্থিতি সবসময়ই জটিল। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজনীতিতে যে ধারা গড়ে উঠেছে, তাতে সংঘাত ও পাল্টা সংঘাত নিয়মিত দেখা গেছে। সহিংসতা, অবরোধ, অগ্নিসংযোগ, গ্রেপ্তার ও মামলার সংস্কৃতি মানুষকে ক্লান্ত করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা অনুভব করেছে, সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়েছে, আর তরুণ প্রজন্ম ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধায় আছে। তাই নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, তারা প্রথম থেকেই একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, স্থিতিশীলতা ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রই তাদের অগ্রাধিকার।

বিএনপি যদিও রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি অভিজ্ঞ দল, কিন্তু এবার তাদের চ্যালেঞ্জ বিগত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। এবার বিরোধী দলগুলোর চাপ বিশেষভাবে বাড়বে। যদি উচ্চকক্ষ গঠিত হয় সে ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো যে আসন পাবে সেটি তাকে অনেকটা দুর্বল করে তুলবে। তার ওপর অন্তর্বর্তী সরকারের করা অনেক চুক্তি হয়তো চাপে ফেলে দেবে নতুন সরকারকে। বিদেশি শক্তিগুলোর সেসব বড় চ্যালেঞ্জ তাদের মোকাবিলা করতে হবে হয়তো। এ ছাড়া নতুন সরকারের জন্য এই মুহূর্তে ফার্স্ট প্রায়োরিটি হবে আওয়ামী সরকারের ফেলে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো।

জনগণ নতুন সরকারের প্রতি যে আস্থা রেখেছে, সেই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার জন্য তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা এবং নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। বিগত সরকারের সময়গুলোতে বাজার সিন্ডিকেটের কারণে জনগণের যে নাকাল অবস্থা সেখান থেকে তাদের অন্তত স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। নতুন সরকারকে যেভাবেই হোক বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো রকম নমনীয়তা দেখানো যাবে না। তাদের মনে রাখতে হবে, তারা জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত শক্তিশালী সরকার। ব্যবসায়ীদের অন্যায়, অতিরিক্ত মুনাফার লোভ নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব তাদেরই।

সাধারণ জনগণের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণের ট্রেনিংও দেওয়া দরকার হবে তরুণ কর্মীদের। মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে কোন্দল-সহিংসতা এবং সেই সূত্রে হানাহানি পছন্দ করে না। এ ধরনের চর্চা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। বিএনপিকে টিকে থাকতে হবে বহুকাল- এই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। তাই তাদের ল্যান্ডস্লাইডিং ভিক্টোরি যেন কখনও ব্রুটাল মেজরিটি না হয়ে ওঠে বিএনপিকে সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গত কয়েক দশকে কিছুটা প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও অর্থনৈতিক মন্দা, জ্বালানি সংকট, রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ সৃষ্টি করেছে। নতুন সরকারের জন্য জরুরি একটি বাস্তবসম্মত এবং বিশ্বাসযোগ্য অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো, রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। উন্নয়ন যেন কেবল নতুন অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বৈষম্য হ্রাসে বাস্তব প্রভাব ফেলে।

ক্ষমতার পরিবর্তনের সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, দখল বা প্রতিশোধের প্রবণতা দেখা যায়। নতুন সরকার যদি শুরুতেই কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেয়, তবে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরবে। পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে তারা রাষ্ট্রের সেবক, কোনো দলের নয়। এতে করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা অনুভব করবে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও সরকারের দক্ষতা পরীক্ষা হবে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রবাসী শ্রমিকদের বাজার রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে জাতীয় স্বার্থ দৃঢ়তার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নতুন সরকারের পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংস্কার দৃশ্যমান হলে আন্তর্জাতিক আস্থা বাড়বে।

সব শেষে বলতেই হয়, রাষ্ট্রক্ষমতা যেন দলীয় নেতাকর্মীদের টাকা কামানোর উৎস হয়ে না ওঠে। ক্ষমতার রাজনীতি যেন আধিপত্য বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত না হয়। গত দেড় দশকের অপশাসন, লুণ্ঠন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রকে হত্যা করার যে দৃষ্টান্ত বিএনপির সামনে রয়েছে, বিএনপি তা যেন অনুসরণ না করে। বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের যে অভিযোগ রয়েছে; এবারের নির্বাচনের প্রচারণায় বিএনপিকে সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগের সম্মুখীন হতে হয়েছে; এ থেকে বের হয়ে দল হিসেবে বিএনপিকে একটি ক্লিন ইমেজ পেতে হলে এবং সরকার হিসেবে টিকে থাকতে হলেও এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে কর্মীদের বিরত রাখতে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সাধারণ জনগণের সঙ্গে সৌজন্যপূর্ণ আচরণের ট্রেনিংও দেওয়া দরকার হবে তরুণ কর্মীদের। মানুষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং রাজনৈতিক দলের নিজেদের মধ্যে কোন্দল-সহিংসতা এবং সেই সূত্রে হানাহানি পছন্দ করে না। এ ধরনের চর্চা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। বিএনপিকে টিকে থাকতে হবে বহুকাল- এই রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। তাই তাদের ল্যান্ডস্লাইডিং ভিক্টোরি যেন কখনও ব্রুটাল মেজরিটি না হয়ে ওঠে বিএনপিকে সেদিকে কঠোর নজর দিতে হবে। আপাতত একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে এই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow