নতুন সরকারের বাজেট: স্বস্তির বার্তা নাকি কঠিন সমীকরণ?

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়নের রূপরেখা। একটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের গুরুত্ব সব সময়ই আলাদা। কারণ জনগণ এই বাজেটের মধ্যেই খুঁজে দেখতে চায় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের জন্য সরকারের দিকনির্দেশনা। সেই বিবেচনায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে জনমনে কৌতূহল, আশা ও উদ্বেগ—তিনটিই বিদ্যমান। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, আজ ১১ জুন নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ১৬ জুন থেকে বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে তা পাস করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। তবে এবারের বাজেট এমন এক সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। ফলে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি

নতুন সরকারের বাজেট: স্বস্তির বার্তা নাকি কঠিন সমীকরণ?

বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়নের রূপরেখা। একটি নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের গুরুত্ব সব সময়ই আলাদা। কারণ জনগণ এই বাজেটের মধ্যেই খুঁজে দেখতে চায় নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের জন্য সরকারের দিকনির্দেশনা। সেই বিবেচনায় ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট নিয়ে জনমনে কৌতূহল, আশা ও উদ্বেগ—তিনটিই বিদ্যমান।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম সম্প্রতি জানিয়েছেন, আজ ১১ জুন নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। ১৬ জুন থেকে বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু হয়ে ৩০ জুনের মধ্যে তা পাস করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে দেশ।

তবে এবারের বাজেট এমন এক সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের নানা সমস্যা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা—সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। ফলে নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এটি কতটা জনবান্ধব হবে এবং কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হবে?

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ ক্রমাগত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে জনগণের প্রথম প্রত্যাশা হলো দ্রব্যমূল্যের ওপর চাপ কমানো। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে রাতারাতি বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তবুও করনীতি, শুল্ক কাঠামো, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার তদারকির মাধ্যমে সরকার ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, শিশুখাদ্য এবং কৃষি উপকরণের ওপর কর ও শুল্কের যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস বাজারে স্বস্তি আনতে পারে।

বাজেট নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—করের আওতা বাড়বে, নাকি কমবে? অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা হলো কর-জিডিপি অনুপাতের নিম্নহার। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কর আদায়ের হার এখনো কম। ফলে সরকারকে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার জন্য ধার ও বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।

কিন্তু করের আওতা বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। বরং দীর্ঘদিন ধরে করের বাইরে থাকা উচ্চ আয়ের ব্যক্তি, অপ্রদর্শিত সম্পদ, বিলাসী ভোগব্যয় এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিভিন্ন খাত কার্যকরভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশ কর আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করে রাজস্ব বৃদ্ধি করেছে। বাংলাদেশেও কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।

অর্থনীতির বর্তমান সংকটময় সময়ে দেশবাসী কোনো অলৌকিক সমাধান প্রত্যাশা করছে না। তারা চায় একটি সৎ, বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা; এমন একটি বাজেট, যা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনে স্বস্তি এনে দেবে। কারণ একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য জিডিপির গ্রাফে নয়, বরং সাধারণ মানুষের মুখে ফিরে আসা স্বস্তির হাসিতে প্রতিফলিত হয়।

জনগণের আরেকটি বড় প্রত্যাশা হলো কর্মসংস্থান। দেশে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু সে তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত বেকারদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ফলে এবারের বাজেটে উৎপাদনশীল খাত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রণোদনা থাকা জরুরি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে এসএমই খাত গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এই খাত বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং বাজার সুবিধার অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা পিছিয়ে পড়ছেন। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট উদ্যোগ থাকলে তা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী, নিম্নআয়ের শ্রমজীবী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই সহায়তা সঠিক ব্যক্তির কাছে পৌঁছানোও সমান জরুরি। ডিজিটাল তথ্যভান্ডার ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।

তবে জনগণের প্রত্যাশা যত বড়ই হোক, বাজেট বাস্তবায়নের বাস্তবতা আরও কঠিন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রায় প্রতিটি বাজেটেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ঘাটতি। উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, ব্যয় বৃদ্ধি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্বল সমন্বয় অনেক সময় বাজেটের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

বিশেষ করে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়া দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। রাজস্ব কম আদায় হলে সরকারকে ঋণনির্ভর হতে হয়। এতে সুদের চাপ বাড়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কেবল বড় বাজেট ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; বরং রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার কথা বলছে। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ফলে বাজেট প্রণয়নের সময় বৈদেশিক ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাও এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও তাপপ্রবাহ কৃষি, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তাই জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি সময়ের দাবি।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে একটি মৌলিক বিষয়ের ওপর—এটি জনগণের বাস্তব জীবন কতটা স্পর্শ করতে পারে। বাজেট যদি কেবল সংখ্যার সমষ্টি হয়, তবে তা জনগণের কাছে অর্থহীন হয়ে যাবে। কিন্তু যদি এটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কার্যকর রূপরেখা দিতে পারে, তবে সেটিই হবে প্রকৃত অর্থে একটি সফল বাজেট।

বাজেট নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক। কিন্তু প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন সাহসী সিদ্ধান্ত, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সেই পরীক্ষারই প্রথম বড় মঞ্চ।

অর্থনীতির বর্তমান সংকটময় সময়ে দেশবাসী কোনো অলৌকিক সমাধান প্রত্যাশা করছে না। তারা চায় একটি সৎ, বাস্তবসম্মত ও দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা; এমন একটি বাজেট, যা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব জীবনে স্বস্তি এনে দেবে। কারণ একটি বাজেটের প্রকৃত সাফল্য জিডিপির গ্রাফে নয়, বরং সাধারণ মানুষের মুখে ফিরে আসা স্বস্তির হাসিতে প্রতিফলিত হয়। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সেই হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow