নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার

বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ দেশজুড়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।  দীর্ঘদিন যাবৎ নদী দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের নদ-নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনি সীমাবদ্ধতা থাকায় নদী ও খালের দখল এবং দূষণ চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সরকার ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩’ সংশোধনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে কমিশনকে কেবল সুপারিশকারী সংস্থা থেকে বাস্তব ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনায় কমিশনকে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ, তদন্ত পরিচালনা, মামলা দায়ের এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নদী রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বিবেচিত হবে। সংশোধনীতে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল দখল এবং দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাক

নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার

বর্তমান সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ দেশজুড়ে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। 

দীর্ঘদিন যাবৎ নদী দখল, দূষণ ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের নদ-নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনি সীমাবদ্ধতা থাকায় নদী ও খালের দখল এবং দূষণ চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সরকার ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩’ সংশোধনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রস্তাবিত ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে কমিশনকে কেবল সুপারিশকারী সংস্থা থেকে বাস্তব ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের পরিকল্পনায় কমিশনকে সরাসরি পদক্ষেপ গ্রহণ, তদন্ত পরিচালনা, মামলা দায়ের এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা নদী রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বিবেচিত হবে।

সংশোধনীতে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল দখল এবং দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পৃথক ‘নদী আদালত’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিশেষায়িত বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। এই আদালত গঠিত না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত আদালতেই বিচার কার্যক্রম চলবে।

আইনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো দেশের সব নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ বা ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব। এর ফলে নদীর অধিকার রক্ষায় আইনি ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি’ হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে এগুলোকে জনগণের সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নদ-নদীর আইনগত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

সংশোধনীতে কমিশনকে তল্লাশি, জব্দ, বাজেয়াপ্ত এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর ফলে দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সুযোগ থাকায় প্রান্তিক স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।

এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকার শুধু আইন প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বাস্তবায়নের জন্য একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাচ্ছে। নদী, খাল ও উপকূল ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় সাধন, গবেষণা এবং ডাটাবেজ তৈরির মতো কার্যক্রম কমিশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা একটি আধুনিক ও টেকসই জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা দেয়।

সংশোধনী কার্যকর হলে নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূল সংক্রান্ত সব কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করবে কমিশন। একই সঙ্গে নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বিলুপ্ত বা মৃতপ্রায় নদী ও খালের নাব্যতা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে সরকারকে সুপারিশ ও নির্দেশনা দিতে পারবে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে।

সংশোধিত আইন কার্যকর হলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাস্তব ক্ষমতাসম্পন্ন একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলে নদী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তাদের ভাষায়, আগে কমিশন শুধু সুপারিশ দিতে পারত, ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হতো না; কিন্তু নতুন আইনের মাধ্যমে সরাসরি তদন্ত, মামলা দায়ের, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং দখল-দূষণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আইন বাস্তবায়িত হলে দেশের মৃতপ্রায় নদীগুলো পুনরুজ্জীবিত হবে, নৌপথ সচল থাকবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা পাবে। 

উল্লেখ্য, ২০২০ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার একটি খসড়া প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। তবে বর্তমান সরকার সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে এবং এ বিষয়ে আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে মতামত আহ্বান করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করার এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারের একটি সময়োপযোগী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ, যা দেশের নদী, খাল ও উপকূল রক্ষায় সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow