নিজ ঘরেও কেন অনিরাপদ নারীরা?

1 day ago 4

কেয়া নামের একজন সুন্দরী তরুণী। বয়স মাত্র পঁচিশ। স্বপ্ন ছিল ছোট্ট সংসার গড়ে তোলার, হাসিমুখে দিন পার করার। কিন্তু সেই স্বপ্নের আঙিনা পরিণত হলো রক্তাক্ত ঘরে—যেখানে স্বামীর হাতে নিজের জীবনটাই হারাতে হলো তাকে। হত্যার পর ঘাতক স্বামী পালিয়ে গেছে, রেখে গেছে এক গভীর শূন্যতা, কয়েক ফোঁটা প্রশ্নচিহ্ন, আর এক মর্মন্তুদ সংবাদ যা তার সন্তানদের জন্য অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ!

প্রশ্ন জাগে—সংসার নামের যে জায়গাটি নারীর নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেটি কবে থেকে হয়ে উঠল মৃত্যুকূপ? এই হত্যাগুলোর পেছনে কারণ প্রায় একই: যৌতুক, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক টানাপড়েন, কিংবা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের মানসিকতা। আইনের শাসন দুর্বল, বিচার প্রক্রিয়া ধীর, আর সামাজিক নীরবতা এই অপরাধকে আরও প্রশ্রয় দিচ্ছে। ফলে নারীর জীবন হয়ে উঠছে সবচেয়ে সস্তা বিনিময়ের উপাদান। আরও ভয়ংকর সত্য হলো—মানুষ এসব হত্যার খবরে খুব দ্রুত অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে! সংবাদপত্রে পড়ে, দু-একজন প্রতিবাদী কণ্ঠ উচ্চারিত হয়, তারপর নিস্তব্ধতা। কিন্তু সমাজের এই নীরবতাই ঘাতকদের আরও সাহসী করে তোলে।

সংবাদপত্রের একটি সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে অকালপ্রয়াণ, ভাঙা পরিবার, অনেকগুলো নিঃস্ব সন্তান। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে বাংলাদেশে মাত্র ৭ মাসে ১১৩ জন নারী খুন হয়েছেন তাদের স্বামীর হাতে। ভাবুন, মাসে গড়ে ১৬ জন অর্থাৎ প্রায় প্রতি দু’দিনে একজন নারী স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন!

এতদিন পুরুষগণ জেনে এসেছেন নারীদের তাদের কথামতো চলতে হবে, যদিও তা ভুল বা অন্যায় হতে পারে, তাদের শারীরিক খায়েশ মেটাতে হবে, বছর বছর সন্তান জন্ম দিতে হবে, দাসীর মতো সেবাযত্ন করতে হবে৷ চাকরি করে বা বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা এটা সেটা আনতে হবে৷ এই মানসিক গণ্ডি থেকে বের হতে না পারা পুরুষগণই সংসারে অশান্তি করে। তারা নারীকে মানুষ মনে করে না। নারী শুধু ভোগ্যবস্তু! যখনই নারী নিজের অধিকার বুঝতে চায় তখনই তাকে সইতে হয় শারীরিক মানসিক নির্যাতন।

নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি পারিবারিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় সংকট। কারণ, একজন নারী খুন মানে কেবল একটি প্রাণহানি নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর আঘাত। একজন নারী খুন হলে সন্তান হারায় মাকে, পরিবার হারায় মেয়েকে, সমাজ হারায় তার অর্ধেক শক্তিকে। এজন্য আমাদের জানতে হবে—কেন এত আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও নারী হত্যা থামছে না? কেন পুলিশি তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে? কেন পরিবার ও সমাজ এখনও ‘ঘরোয়া বিষয়’ ভেবে চুপ করে থাকে?

নারী কেবল স্ত্রী, মা, বোন বা কন্যা নয়—সে একজন স্বাধীন মানুষ। তার জীবন, তার অস্তিত্ব রাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ মূল্যবান হওয়া উচিত। যদি এ দায় আমরা এড়িয়ে যাই, তবে প্রতি মাসেই নতুন নতুন কেয়া, রূপা, শিলা কিংবা শিউলির রক্তে ভিজবে সংবাদপত্রের পাতা। আজ প্রয়োজন শক্ত আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, এবং সর্বোপরি সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। নারী হত্যাকে “ঘরোয়া ঘটনা” নয়, “জাতীয় অপরাধ” হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। না হলে ইতিহাস শুধু মনে রাখবে—৭ মাসে ১১৩ নারী খুন, আর আমরা দেখেও চুপ করে ছিলাম।

আমরা প্রায়ই দেখি—সংবাদপত্রের এক কোণে ছোট্ট একটি শিরোনাম: “স্ত্রী খুন স্বামী পলাতক”! প্রথমে অবাক হই, তারপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাই। যেন এ সব খবর আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই অভ্যস্ততা আসলে খুব ভয়ংকর। আমরা ভুলে যাই, প্রতিটি হত্যার পেছনে কয়েকটি পরিবার, অকালপ্রয়াণ, আর একটি সমাজব্যবস্থার ব্যর্থতা লুকিয়ে থাকে। কেয়ার মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি নারীর নিরাপত্তাহীনতার নগ্ন চিত্র। ঘর, যা হওয়া উচিত ছিল আশ্রয়স্থল, সেখানে রক্ত ঝরে—এ কেমন সমাজ? সংসারে দ্বন্দ্ব, অভিমান কিংবা মতবিরোধ স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেই দ্বন্দ্ব যদি হত্যার মতো নির্মমতায় পৌঁছায়, তবে বুঝতে হবে—আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি কাঠামোতে ভয়াবহ শূন্যতা রয়েছে।

নারীর প্রতি সহিংসতার খবর দিন দিন বাড়ছে। প্রেমে ব্যর্থতা, যৌতুক, অর্থনৈতিক টানাপড়েন বা সামান্য বিবাদ—যেকোনো কারণেই নারীর জীবন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আইনের চোখে এটি হত্যা, কিন্তু আমাদের সমাজ এখনো একে দেখে “পারিবারিক সমস্যা” হিসেবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। কেয়ার মৃত্যু যেন আরেকটি সংখ্যা হয়ে না যায় পরিসংখ্যানের খাতায়। তাকে ঘিরে আমাদের ভাবতে হবে—আইন প্রয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে? নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজের ভূমিকা কতটা সক্রিয়? শিক্ষা ও সচেতনতার মাধ্যমে কীভাবে সহিংস মানসিকতা প্রতিরোধ করা যায়?

কেয়া আর ফিরবে না। কিন্তু তার রক্ত যেন আমাদের ঘুম ভাঙায়। প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি সমাজকেই ভাবতে হবে—নারীর জীবনের মূল্য কতটা? নারী কেবল মা, বোন বা স্ত্রী নয়—সে একজন পূর্ণ মানুষ। তার বেঁচে থাকার অধিকার অনড়, অনস্বীকার্য। আজ আমরা যদি কেয়ার হত্যার বিচার চাই, তবে আগামীকাল হয়তো আরও একটি প্রাণ রক্ষা পাবে। নাহলে সংবাদপত্রের পাতায় বারবার ফিরে আসবে সেই পরিচিত বাক্য –স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন! আহা স্বামীগণ! ৭ মাসে ১১৩ নারীকে খুন করলেন!? এরপরও দু'একজন নারী যদি মুখে মুখে কথার জবাব দেয়, কিংবা পুরুষদের অত্যাচার না মানতে চায় তাদেরকে ছিঃ ছিঃ করতে থাকে এই পুরুষসমাজ! বলুন তো, এই ১১৩ নারী কি সবাই পরকীয়ায় লিপ্ত ছিলেন? তারা কি আপনার মেয়ে, বোন, ভাগিনা বা কেউ নয়? নিজেদের স্বভাব, চরিত্র, দোষ ঢাকতে একটিই দোষ দিয়ে থাকেন পুরুষসমাজ– পরকীয়া! অথচ নিজের স্ত্রীকে মন থেকে ভালোবাসার চেষ্টা করেন না তারা! কেবল স্বার্থ, লোভ, ভোগ ছাড়া নারী তাদের কাছে মানুষ নয়, নারী কিছুই নয়!

এতদিন পুরুষগণ জেনে এসেছে নারীদের তাদের কথামতো চলতে হবে, যদিও তা ভুল বা অন্যায় হতে পারে, তাদের শারীরিক খায়েশ মেটাতে হবে, বছর বছর সন্তান জন্ম দিতে হবে, দাসীর মতো সেবাযত্ন করতে হবে৷ চাকরি করে বা বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা এটা সেটা আনতে হবে৷ এই মানসিক গণ্ডি থেকে বের হতে না পারা পুরুষগণই সংসারে অশান্তি করে। তারা নারীকে মানুষ মনে করে না। নারী শুধু ভোগ্যবস্তু! যখনই নারী নিজের অধিকার বুঝতে চায় তখনই তাকে সইতে হয় শারীরিক মানসিক নির্যাতন।

আর বাবা মা? তাদের মেয়ের জামাই যত অত্যাচারই করুক, যত বিয়েই করুক পরামর্শ দেন মেনে নাও! ছিঃ বাবা মা! মেয়েকে ঠকিয়ে ঠিকই ছেলেদের একদিন উদোর ভর্তি করেন, অথচ মেয়েও আপনারই সন্তান! মেয়ের বিপদে পাশে থাকা আপনাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। মেয়ে বিয়ে দিয়েই যদি মনে করেন দায়িত্ব শেষ তাহলে তো হবে না! মেয়ের বিপদে আপনাদেরই পাশে থাকতে হবে৷ যে সকল বাবা মার পুরুষসন্তান তাদের স্ত্রী, সন্তানকে ভরণপোষণ দেয় না, অত্যাচার করে, খুন করে সেসব কুলাঙ্গারের পরিবারও অনেকাংশে দায়ী! তারা কেন তাদের সন্তানকে কাউন্সেলিং করেন না, মানসিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসা করান না?

আসলে, আমাদের দেশের শিক্ষিত পুরুষদেরও মানসিক সমস্যা রয়েছে। এ বিষয় তারা তো স্বীকার করেনই না, বরং চিকিৎসার কথা বললে উল্টো তাকেই পাবনা মানসিক হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়! ফলশ্রুতিতে এক পর্যায়ে খুন পর্যন্ত গড়ায়! পুরুষদের মানসিক সমস্যা শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। আর বাংলাদেশের পরিবার যতদিন নারী বা পুরুষকে এক করে না দেখবে ততদিন এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেকে বোঝেন নারীকে ছাড় দিতে হবে, কিন্তু ছাড় দিতে দিতেই পুরুষগণ মনে করেন ছাড় দেওয়ার জন্যই নারীদের জন্ম! সবাইকে এ ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে– নইলে, আগামীকাল আপনার বোন, আপনার কন্যা, আপনার স্ত্রী যে খুন হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই!

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক।

এইচআর/এএসএম

Read Entire Article