‘নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি’

১৫ বছর ধরে কনটেন্ট রাইটিং করে জীবিকা চালিয়েছেন লিসা। কলেজ থেকে বের হওয়ার পর লেখালেখি শুরু করেন তিনি। দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার পর দ্রুত বাড়তে থাকা আউটসোর্সিং খাতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। লিসার ভাষ্য, নিজের কাজে কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র আট মাস পর এবং স্থায়ী হওয়ার এক মাস আগে তাকে ছাঁটাই করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে সম্প্রতি অনেকের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটছে। লিসা জানান, চাকরি হারানোর আগে তার প্রতিষ্ঠান একটি জনসংযোগ সংস্থাকে এআই দিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করতে দিয়েছিল। পরে সেই কনটেন্ট সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয় লিসা ও তার সহকর্মীদের। শুধু তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানের লেখার ধরন বোঝাতে তাদের দক্ষতা ব্যবহার করে এআইকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। এ কারণে এখন লিসার মনে হচ্ছে, যে প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে তারা সাহায্য করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রযুক্তিই তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে। লিসা বলেন, আমার মনে হচ্ছে, আমি নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি। আমরা নিজেরাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যে পরে আমাদের জায়গ

‘নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি’

১৫ বছর ধরে কনটেন্ট রাইটিং করে জীবিকা চালিয়েছেন লিসা। কলেজ থেকে বের হওয়ার পর লেখালেখি শুরু করেন তিনি। দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার পর দ্রুত বাড়তে থাকা আউটসোর্সিং খাতে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন।

লিসার ভাষ্য, নিজের কাজে কখনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের প্রয়োজন মনে করেননি।

কিন্তু নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার মাত্র আট মাস পর এবং স্থায়ী হওয়ার এক মাস আগে তাকে ছাঁটাই করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইনে সম্প্রতি অনেকের সঙ্গেই এমন ঘটনা ঘটছে।

লিসা জানান, চাকরি হারানোর আগে তার প্রতিষ্ঠান একটি জনসংযোগ সংস্থাকে এআই দিয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট তৈরি করতে দিয়েছিল। পরে সেই কনটেন্ট সম্পাদনার দায়িত্ব দেওয়া হয় লিসা ও তার সহকর্মীদের। শুধু তা-ই নয়, প্রতিষ্ঠানের লেখার ধরন বোঝাতে তাদের দক্ষতা ব্যবহার করে এআইকে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।

এ কারণে এখন লিসার মনে হচ্ছে, যে প্রযুক্তিকে প্রশিক্ষণ দিতে তারা সাহায্য করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রযুক্তিই তাদের চাকরি কেড়ে নিয়েছে।

লিসা বলেন, আমার মনে হচ্ছে, আমি নিজের কবর নিজেই খুঁড়েছি। আমরা নিজেরাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যে পরে আমাদের জায়গা নিয়েছে।

লিসা তার আসল নাম নয়। বিবিসির সঙ্গে কথা বলা আরও কয়েকজন সাবেক আউটসোর্সিং কর্মীও পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি। চাকরি ছাড়ার সময় তারা গোপনীয়তা চুক্তিতে সই করে ক্ষতিপূরণ নিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, প্রকাশ্যে কথা বললে ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। কারণ এই খাতে কর্মীদের নেটওয়ার্ক তুলনামূলকভাবে ছোট।

তাদের অভিজ্ঞতা ফিলিপাইনের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরছে—যে চাকরিগুলো লাখ লাখ মানুষকে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উঠে আসতে সাহায্য করেছে, এআই সেই চাকরিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে করতে শুরু করলে কী হবে?

যেভাবে গড়ে উঠল আউটসোর্সিং শিল্প

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার কিউবাও এলাকায় প্রতিদিন বিকেল ৫টার দিকে বহুতল অফিস থেকে বিপুলসংখ্যক কর্মী বেরিয়ে আসেন। তাদের অনেকের গলায় থাকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র।

ম্যানিলার এমন কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান কল সেন্টার, হিসাবরক্ষণ, সফটওয়্যার তৈরি এবং বিপণন কনটেন্টসহ নানা ধরনের আউটসোর্সিং সেবা দিয়ে থাকে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব ব্যবসায়িক এলাকা ফিলিপাইনের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রতীক হয়ে আছে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে ইংরেজিভাষী দেশ হিসেবে ফিলিপাইনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং বা বিপিও খাতে তুলে ধরা হয়।

এরপর বিভিন্ন সরকার কর ছাড়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে দেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেয়।

অ্যাকসেঞ্চার, কনসেন্ট্রিক্স ও টেলিপারফরম্যান্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠান ফিলিপাইনে বিশাল কার্যালয় গড়ে তোলে। এসব প্রতিষ্ঠানে লাখ লাখ ফিলিপিনো কর্মী কাজ করেন।

বর্তমানে দেশটির আউটসোর্সিং খাতে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ কাজ করেন। এ খাত থেকে বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার আয় হয়, যা ফিলিপাইনের অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআইয়ের প্রভাবের দিক থেকে এই শিল্প অন্য অনেক খাতের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসাবে, ফিলিপাইনে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ মানুষ এমন পেশায় কাজ করেন, যেগুলো জেনারেটিভ এআইয়ের প্রভাবে পড়তে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটিই সবচেয়ে বেশি হার।

তবে আইএলও মনে করছে, এসব চাকরির অনেকগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার বদলে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ফিলিপাইনের কর্মসংস্থানের বড় অংশ যেহেতু সেবা খাতনির্ভর, তাই দেশটি এআইয়ের প্রভাবের ঝুঁকিতে বেশি রয়েছে।

দ্রুত বাড়ছে এআই ব্যবহার

ফিলিপাইনের আইটি ও বিজনেস প্রসেস অ্যাসোসিয়েশনের (আইবিপিএপি) প্রেসিডেন্ট জ্যাক মাদ্রিদ স্বীকার করেছেন, দেশটির আউটসোর্সিং খাতে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

তার হিসাবে, আইবিপিএপির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এরই মধ্যে এআই নিয়ে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালাচ্ছে।

মাদ্রিদ বলেন, এজেন্টিক এআই আরও দ্রুতগতিতে কাজ স্বয়ংক্রিয় করার সম্ভাবনা রাখে। কিছু কাজ এমন আছে, যেগুলো স্বয়ংক্রিয় করা সম্ভব বা এরই মধ্যে করা হয়েছে।

তবে তার দাবি, এআইয়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বেশিরভাগ কর্মীকেই একই প্রতিষ্ঠানের অন্য কাজে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, কর্মী নিয়োগে ধীরগতির পেছনে শুধু এআই দায়ী নয়। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং কোন কাজ কীভাবে বিদেশে করানো হবে, তা নিয়ে কোম্পানিগুলোর অনিশ্চয়তাও এর কারণ।

তবু মাদ্রিদ স্বীকার করেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে।

তার মতে, কর্মীদের নতুন দক্ষতা শেখানোর গুরুত্ব কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

মেরি নামের আরেক সাবেক কনটেন্ট রাইটারও এআইয়ের কারণে চাকরি হারিয়েছেন। এটিও তার আসল নাম নয়।

তিনি জানান, তার প্রতিষ্ঠান কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে এআই ব্যবহারে উৎসাহিত করেছিল।

কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ছিল ভিন্ন।

মেরি বলেন, এআই তার কাজ সহজ করার বদলে দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

তিনি বলেন, আমাদের আরও বেশি সম্পাদনা করতে হতো, আরও বেশি তথ্য যাচাই করতে হতো, কারণ এআই যে তথ্য তৈরি করতো, তার অনেকটাই ভুল ছিল। প্রযুক্তিগতভাবে আমাদের কাজ বরং বেড়ে গিয়েছিল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খরচ কমানো এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য কোম্পানিগুলোর ওপর এআই ব্যবহারের চাপ বাড়ছে।

বড় কোম্পানিগুলোর দাবি, এআই কর্মীদের পুরোপুরি সরাবে না

বিশ্বের সবচেয়ে বড় কল সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং ফিলিপাইনের অন্যতম বড় বেসরকারি নিয়োগদাতা টেলিপারফরম্যান্স বলেছে, এআই কর্মীদের বাদ দেওয়ার বদলে তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।

কোম্পানিটির পরিকল্পনা হলো, নিয়মিত ও সহজ কাজগুলো এআই করবে এবং কর্মীরা আরও জটিল দায়িত্ব নেবেন।

টেলিপারফরম্যান্স কর্মীদের নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।

অ্যাকসেঞ্চারও বলেছে, জেনারেটিভ এআই প্রায় সব ধরনের চাকরির ধরন বদলে দেবে, তবে চাকরি পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেবে—এমন নয়।

কোম্পানিটি এআই সক্ষমতা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ফিলিপাইনের সবচেয়ে বড় আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠান কনসেন্ট্রিক্স জানিয়েছে, তাদের এআই ব্যবস্থাগুলো মানুষের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হবে। নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র: বিবিসি

এমএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow