নিম্নমানের খাবারে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা, ১৭ বছরেও মেলেনি কোনো ভর্তুকি
প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) আবাসিক হলগুলোর ডাইনিংয়ে এখনো চালু হয়নি কোনো ভর্তুকি ব্যবস্থা। ফলে চড়া দামে খাবার কিনেও মান, স্বাদ ও পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডাইনিংয়ে বাসি খাবার, পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি আবাসিক হল—ছাত্রীদের শহীদ ফেলানী হল এবং ছাত্রদের বিজয়-২৪ হল ও শহীদ মুখতার ইলাহী হল। এসব হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে। খাবারের বৈচিত্র্য কম, রান্নার মান খারাপ এবং নির্ধারিত দামের তুলনায় খাবারের পরিমাণ ও মান কম—এমন অভিযোগ তাদের। পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী ডাইনিংয়ের খাবার না খেয়ে হলের কক্ষে বৈদ্যুতিক হিটারে রান্না করছেন। কেউ কেউ আবার বাইরের হোটেল ও খাবারের দোকানে গিয়ে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার সময়ও নষ্ট হচ্ছে। বাসি খাবার পরিবেশনের অভিযোগ শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের হলের ডাইনিংয়ে একবেলা খাবার
প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) আবাসিক হলগুলোর ডাইনিংয়ে এখনো চালু হয়নি কোনো ভর্তুকি ব্যবস্থা। ফলে চড়া দামে খাবার কিনেও মান, স্বাদ ও পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ডাইনিংয়ে বাসি খাবার, পচা বা দুর্গন্ধযুক্ত খাবার এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি আবাসিক হল—ছাত্রীদের শহীদ ফেলানী হল এবং ছাত্রদের বিজয়-২৪ হল ও শহীদ মুখতার ইলাহী হল। এসব হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে। খাবারের বৈচিত্র্য কম, রান্নার মান খারাপ এবং নির্ধারিত দামের তুলনায় খাবারের পরিমাণ ও মান কম—এমন অভিযোগ তাদের।
পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী ডাইনিংয়ের খাবার না খেয়ে হলের কক্ষে বৈদ্যুতিক হিটারে রান্না করছেন। কেউ কেউ আবার বাইরের হোটেল ও খাবারের দোকানে গিয়ে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে পড়াশোনার সময়ও নষ্ট হচ্ছে।
বাসি খাবার পরিবেশনের অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছেলেদের হলের ডাইনিংয়ে একবেলা খাবারের জন্য দিতে হয় ৪০ টাকা। এর বিনিময়ে মাছ, মাংস অথবা ডিমের মধ্যে যেকোনো একটি এবং একটি সবজি দেওয়া হয়। অন্যদিকে শহীদ ফেলানী হলে ৬০ টাকায় তিনবেলার খাবার দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বর্তমান বাজারদর বিবেচনায় খাবারের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাদের আর্থিক সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দেওয়া হলে কম দামে তুলনামূলক ভালো মানের খাবার সরবরাহ করা সম্ভব বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে বিজয়-২৪ হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ করছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, ডাইনিংয়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে রান্নার দায়িত্বও একই ব্যক্তি পালন করায় একবার বেশি পরিমাণে খাবার রান্না করে তা পরবর্তী বেলায় পরিবেশন করা হয়। এতে খাবারে টক গন্ধ ও বাসি ভাব তৈরি হয়।
বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. মামুন বলেন, ‘হলের খাবারের কোয়ালিটি দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এটা নিয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। আমরা মেসে তিন বেলা ৭০ টাকায় মিল খেয়েছি, সেটাও অনেক ভালো ছিল। এখানে দুই বেলা ৮০ টাকা দিয়েও নিকৃষ্ট খাবার খেতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সবজি লবণ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না করলেও ভালো হওয়া সম্ভব। কিন্তু এখানে রান্না করা প্রায় সবকিছুই টক লাগে।’
একই হলের শিক্ষার্থী মাসফিকুল হাসানের অভিযোগ, ডাইনিংয়ে অবশিষ্ট খাবার যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করে আবার পরিবেশন করা হয়। তার ভাষ্য, মাছ ও মাংসের টুকরো খুব ছোট দেওয়া হয়। অনেক সময় আগের সিদ্ধ করা ডিমও পুনরায় পরিবেশন করা হয়। এতে খাবার নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে।
মাসফিকুল হাসান বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মুখতার ইলাহী হলের খাবার অন্তত খাওয়া যায়। কিন্তু এই হলের খাবার দেখে রুচি আসে না। অনেকে বাধ্য হয়ে খাচ্ছেন।’
দামের তুলনায় মান নিয়ে প্রশ্ন
শহীদ মুখতার ইলাহী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাদিকুল ইসলাম বলেন, হলের অধিকাংশ শিক্ষার্থী প্রতিদিন ডাইনিংয়ের খাবারের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যে দামে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, সেই অনুযায়ী সব সময় খাবারের মান, স্বাদ ও পরিমাণ পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় ভাত, তরকারি কিংবা মাছ-মাংসের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন থাকে। আমরা চাই প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুক। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ও স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করা হোক।’
শহীদ ফেলানী হলের শিক্ষার্থী সুমাইয়া খান বলেন, ডাইনিংয়ের নতুন ব্যবস্থাপকের আচরণ ও খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তার অভিযোগ, দুইদিন ডালের মধ্যে পোকা পাওয়া গেছে। ডাল খাওয়ার সময় মনে হয়েছে পচা ডাল রান্না করে দিয়েছে। ৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী মিল চালালেও খাবারের মানের তেমন উন্নতি হয়নি। মাছ-মাংস মোটামুটি ভালো রান্না হয়, কিন্তু সবজি খাওয়ার উপযোগী থাকে না।’
তবে শিক্ষার্থীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে সব অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি বলে জানিয়েছেন শহীদ ফেলানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক সিফাত রুমানা।
শহিদ ফেলানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক সিফাত রুমানা বলেন, খাবার মুখে নেওয়া যাচ্ছে না, পোকা পাওয়া যাচ্ছে- এমন অভিযোগ আমি পাইনি। খাবারে পোকা পাওয়া এটি মোটেও ভালো বিষয় নয়। আমাদের কাছে অফিশিয়ালি অভিযোগ আসলে আমরা তখন সেটির ব্যবস্থা নিতে পারব।
তিনি বলেন, হলে ৬০ টাকায় তিনবেলা খাবার দেওয়া হয়। এই পরিমাণ টাকায় খাবারের মান। সাড়ে ৩শ সিট, তার মধ্যে ৩০-৫০ জন শিক্ষার্থী মিল চালায়। আমার দুই বছরের দায়িত্বপালনকালে ১শ জন ডাইনিংয়ে মিল খেয়েছেন বলে এমন রেকর্ড নেই। আমাদের উভয় দিক থেকে কথা শুনতে হয়।
সিফাত রুমানা বলেন, একদিকে শিক্ষার্থীরা খাবারের মান, পরিমাণ নিয়ে অভিযোগ করেন, অন্যদিকে ডাইনিং পরিচালক অভিযোগ করেন। ৬০ টাকায় তিন বেলা ভালো খাবার দেওয়া সম্ভব নয় ৷ এই টাকার মধ্যে সবজি, আমিষ, চাল, ডাল এবং খড়ি কিনতে হয়। আবার মিলের সংখ্যা বেশি না। তবে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে বার বার এ বিষয়ে কথা বলে যাচ্ছি, কীভাবে খাবার মান ভালো করা যায়।
ভুর্তকির বিষয়ে যা বলছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট মো. আমির শরীফ ডাইনিংয়ে ভর্তুকি বিষয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভর্তুকি বাজেট ইউজিসি সেন্ট্রাল বাজেটের মাধ্যমে দিয়ে থাকে। আমরা একাধিকবার আবেদন করেছি। অফিসিয়ালি চিঠিও দিয়েছি কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউজিসি আমাদের হলের জন্য ভর্তুকি বিষয়টি অনুমোদন করেনি ৷
খাবারের মান বিষয়ে তিনি বলেন, খাবারের মানটা উন্নত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং বাবুর্চিকে বার বার সতর্ক করা হয় ৷ আমরা হলের ডাইনিং শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে দিয়ে পরিচালনা করতে চেয়েছি। যেন খাবারের মান মুখতার ইলাহী হলের মতো ভালো হয়। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী দায়িত্ব নেয়নি।
হল ডাইনিংয়ের খাবারের ভর্তুকি বিষয়ে বেরোবি রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘হলগুলোতে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছি। ভর্তুকির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে, পর্যায়ক্রমে সবকিছু বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, উপাচার্য স্যার বর্তমানে ইউজিসির খণ্ডকালীন সদস্য, তিনি হলগুলোতে ভর্তুকি আনার বিষয়ে কাজ করছেন। আর ইউজিসি হলে ভর্তুকি বাজেট দিলে সেটা সরাসরি হলগুলো পেয়ে যাবে। এটা সিন্ডিকেটের কোনো আলোচনা বিষয় না এবং সিন্ডিকেট আলোচনা করলে যে হয়ে যাবে এমন নয়।
ডাইনিংয়ের খাবারের মান তদারকি ও বৈদ্যুতিক হিটার চালানোর বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যদি সবাই মিল না চালায় তাহলে খাবারের মান ভালো হবে কেমন করে? তারা ডাইনিংয়ের মিল না চালিয়ে প্রত্যেক হিটারে রান্না করে। এতে যেমন বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে, তেমন প্রায় শর্ট সার্কিট মতো ঘটনা ঘটছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেব, যদি ডাইনিং চালাতে হয়, তাহলে হিটার চালানো যাবে না। দুইটি কাজ তো আর একসঙ্গে করা চলে না।
তিনি বলেন, আমরা খাবারে মান ভালো করার জন্য হল প্রভোস্ট সঙ্গে মিটিং করেছি। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা হিটারে রান্না করে মিল চালাতে চায় না। হলের সব শিক্ষার্থী মিল চালালে খাবারের মান ভালো হবে।
অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমান, হলে আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়েছি, যেগুলো আগে ছিল না। শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য হলে রিডিং রুমে এসি দেওয়া হয়েছে, পানির ফিল্টার দেওয়া হয়েছে। ঈদ, বিজয় দিবস ও জুলাই দিবসে শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়া হয়, যেটি আগে ছিল না। পর্যায়ক্রমে ভর্তুকিসহ শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আজিজুর রহমান/কেএইচকে/এএসএম
What's Your Reaction?




