নীলফামারীর ডিমলায় সড়কের সংস্কারকাজে নিম্নমানের ইটের খোয়া ব্যবহারের অভিযোগের পর উপজেলা প্রকৌশলীর লিখিত নির্দেশনার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও তা অপসারণ করা হয়নি। একইসঙ্গে সংস্কারকাজও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে গয়াবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী ও নাউতারা, এই চার ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদর ও রংপুরে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান সড়কটিতে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের লিখিত নির্দেশনার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় ভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে।
সোমবার (০৩ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার গয়াবাড়ী ইউনিয়নের বাবুরহাট জিসি-ডালিয়া আরঅ্যান্ডএইচ ভায়া শুটিবাড়ী সড়কে সংস্কারকাজের জন্য রাখা বটের খোয়াগুলো দেখা যায়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ডিমলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ কর্মসূচির আওতায় সমায়ান্তর রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের অধীনে সড়কটির সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ২ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার ৩১৫ টাকা। তবে ২ কোটি ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৯ টাকা চুক্তিমূল্যে কাজটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় নীলফামারী সদর উপজেলার মসজিদপাড়া এলাকার মেসার্স সিদ্দি ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কস। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি কাজ শুরু হয়ে ১৮ মে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কাজ সম্পন্ন হয়নি।
গয়াবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী ও নাউতারা, এই চার ইউনিয়নের বৃহত্তম শুটিবাড়ী হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সড়কটি উপজেলা সদর ও রংপুরগামী যাত্রী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবীদের অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ। শুটিবাড়ী হাটের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও সড়কটির গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। ধুলাবালি, অসমাপ্ত সড়ক ও চলাচলের ঝুঁকির কারণে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
এ বিষয়ে গত ২৯ জুন ‘আড়াই কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ’ শিরোনামে দৈনিক কালবেলায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। ওই সংবাদের পর ১ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান, এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী শিশির চন্দ্র দাস, উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী জিকরুল আমিন পাটোয়ারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নির্মাণাধীন সড়ক পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে সড়কে বিছানো ইটের খোয়াগুলো নিম্নমানের বলে তাদের কাছে প্রতীয়মান হলে সেগুলো অপসারণ করে দরপত্রের শিডিউল অনুযায়ী মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার এবং দ্রুত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘কাজটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করছে। তাই সরাসরি আমার করার কিছু নেই। তবে পরিদর্শনের সময় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ দেখে আমাদের কাছে সড়কে ব্যবহৃত ইটের খোয়াগুলো নিম্নমানের বলে মনে হয়েছে। তাই সেগুলো অপসারণ করে মানসম্মত উপকরণ ব্যবহারের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করতেও বলা হয়েছে।’
পরিদর্শনের পর উপজেলা প্রকৌশলী একই বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লিখিত নির্দেশনা দেন। তবে সেই নির্দেশনা দেওয়ার প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও নিম্নমানের ইটের খোয়া অপসারণ করা হয়নি। উল্টো নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।
শুটিবাড়ী হাট-বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আব্দুল বাতেন বলেন, ‘সড়কে নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এখনই সেগুলো ভেঙে যাচ্ছে। এভাবে কাজ হলে সড়কটি টেকসই হবে না।’
শুটিবাড়ী হাটের কাপড় ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, ‘এত অনিয়ম আগে দেখিনি। রাবিশ ইটের খোয়া দিয়ে সড়কের কাজ করা হয়েছে। একটি ভ্যানগাড়ি চলাচল করলেই খোয়াগুলো গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। ঠিকাদারের লোকজন নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করেছেন।’
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মাহাবুব হোসেন বলেন, ‘শুরু থেকেই নিম্নমানের ইট ব্যবহার হলেও তখন এলজিইডি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। লিখিত নির্দেশনার প্রায় এক মাস পরও নিম্নমানের ইটের খোয়া অপসারণ না হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।’
নীলফামারী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হাসান বলেন, ‘অভিযোগ তদন্তে জেলা কার্যালয় থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কাজ বন্ধ, বিল স্থগিত, জামানত জব্দসহ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘কাজের মেয়াদ শেষ হলেও এখনো বিল দেওয়া হয়নি। নিম্নমানের ইট ব্যবহার করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ইটের খোয়া অপসারণের জন্য লিখিতভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ইটের খোয়াগুলো অপসারণ করে দরপত্রের শিডিউল অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।’
এ বিষয়ে মেসার্স সিদ্দিক ইঞ্জিনিয়ারিং মার্কসের ব্যবসায়িক পার্টনার সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।