শনিবার (৩০ আগস্ট) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো একটি বিবৃতিতে বলা হয়: ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার আদায়ের পক্ষে সাহসী ভূমিকা রাখা রাজনীতিবিদ নুরুল হক নূরের ওপর নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানায়। কেবল জনাব নুরুল হক নূরের ওপরই নয়, এই ধরনের সহিংসতা ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ঐতিহাসিক সংগ্রামে জাতিকে একত্রিত করা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্পিরিটের ওপরেও আঘাত বলে মনে করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাংলাদেশের জনগণকে আশ্বস্ত করছে যে, এই নৃশংস ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে সম্পন্ন করা হবে। প্রভাব বা পদমর্যাদা যাই হোক না কেন, জড়িত কোনো ব্যক্তি জবাবদিহিতা থেকে রেহাই পাবে না। স্বচ্ছতা এবং দ্রুততার সাথে এর বিচার সম্পন্ন করা হবে।’
গণমাধ্যমের খবর বলছে, শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাতে রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাঠিচার্জ করে। এতে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদসহ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন। গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গেছে, নুরসহ সেখানে অন্যদের ওপর লাঠিচার্জ করছে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এতে নুর গুরুতর আহত হন। তিনি ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন।
কেন সেখানে এই পরিস্থিতি তৈরি হলো বা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কেন গণঅধিকার পরিষদ নেতাকর্মীদের ওপর চড়াও হলো? এ বিষয়ে ঘটনার পরদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ঘটনার শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯ টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ারও চেষ্টা চালায়। এছাড়াও বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর শান্তিপূর্ণ সমাধানের সকল চেষ্টা তারা অগ্রাহ্য করে। ফলস্বরূপ, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়।
কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আছে কি না, সেটি বিরাট প্রশ্ন। বরং যেহেতু তারা অন্তর্বর্তী তথা একটি বিশেষ সময়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, ফলে দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে নিয়ে যাওয়াই প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে যেসব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বা নির্বাচন নিয়ে এখনও যেসব পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে, তাতে জনগণের ক্ষমতায়ন তথা দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এখানে কয়েকটি বাক্যে নজর দেয়া জরুরি। ১. শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ; ২. মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করা; ৩. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ; ৪. জননিরাপত্তা রক্ষা। তার মানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রধান সহযোগী জাতীয় পার্টির রাজনীনৈতিক কার্যক্রম ও রাজনীতি নিষিদ্ধ করার যে দাবিতে গণঅধিকার পরিষদ মিছিল করলো, সেটিকে একটি রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ ছিল সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা সেটি না মেনে তারা মব ভায়োলেন্সের পথ বেছে নেয়, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। ফলে জননিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তাদের প্রতিহত করে। এই বিবৃতি ও দাবি যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে পাঠানো বিবৃতিতে এই ঘটনার নিন্দা জানানো হলো কেন?
ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে, পুলিশ ও সেনা সদস্যরাই নুর ও অন্যদেরকে লাঠিপেটা করছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী তো সরকারেরই অংশ। সরকারি নির্দেশনা ছাড়া স্বপ্রণোদিত হয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো বাহিনী কোথাও কোনো অ্যাকশনে যায়, এটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কারণ প্রতিটি বাহিনীর ভেতরে একটা চেইন অব কমান্ড থাকে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে। তাহলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় কার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করলো? পুলিশ ও সেনবাহিনী কি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
নুরের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে সবচেয়ে বেশি তোপের মুখে পড়েছেন সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন: ‘ভিপি নুরুল হক নূরের উপর বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ ২৪ ঘণ্টায় তার এই পোস্টের নিচে কমেন্ট পড়েছে প্রায় এক লাখ। সেখানে অনেকেই তার এই স্ট্যাটাসের নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন: ‘সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে নিন্দা জানানোর অর্থ হলো আপনাদের দেশ চালানোর কোনো যোগ্যতাই নেই।’ তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে এই পোস্টের নিচে এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর কমেন্ট। তিনি লিখেছেন: ‘প্রতিবাদের কাজ আপনার? ভন্ডামি বাদ দেন স্যার। যেই জন্য বসানো হয়েছে সেটা না করে কী করছেন এসবের হিসাব দিতে হবে।’ হাসনাতের এই কমেন্টের পরে অনেকে রসিকতা করে লিখেছেন: ‘কী কলিকাল আইলো, ছাত্র এখন শিক্ষকরে জ্ঞান দেয়।’
বাস্তবতা হলো, অধ্যাপক আসিফ নজরুলের স্ট্যাসাসের নিচে হাসনাত যা লিখেছেন, সেখানে রাগ ও ক্ষোভের সাথে ভীষণরকম হতাশাও স্পষ্ট। রাগের কারণ, তিনিও আর দশজন কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের মতোই এটা মনে করেন যে, নিন্দা জানানো সরকারের কাজ নয়। সরকার অ্যাকশন নেবে। সরকার সাধারণ মানুষ তো বটেই, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিশেষ করে জনগণের প্রতিনিধি এবং দেশ ও জনগণের জন্য যারা রাজপথে লড়াই-সংগ্রাম করেন, তাদের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সরকার জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে না পেরে অথবা না দিয়ে যখন নিজেই নিন্দা জানায়, প্রতিবাদ করে—তখন বুঝতে হবে তারা এখনও সরকার হয়ে উঠতে পারেনি। বরং এখনও সুশীল সমাজের ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়ে আছে।
এমনিতেই ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে লোকেরা এনজিও বা ‘সুশীল সরকার’ মনে করে। কেননা এই সরকারে যারা আছেন, তাদের বিরাট অংশই মূলত এনজিওজীবী। কেউ কেউ শিক্ষক। দুয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা। এর মধ্যে দুজন আছেন ছাত্র প্রতিনিধি—যারা জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ছিলেন। তাদের একজন আবার প্রায়ই নানারকম বিতর্কের জন্ম দেন। নানারকম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। তবে এই সরকারের বিরুদ্ধে যতটা না অনিয়ম ও দুর্নীতি—তার চেয়ে বেশি অভিযোগ তাদের অদক্ষতা নিয়ে।
এই সরকারটি গঠিত হয়েছিল একটি বিরাট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে, অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। উপরন্তু একটি বিপদসংকুল সময়ে সমাজে ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত কিছু লোক যখন এই সরকারে যুক্ত হলেন, তখন সাধারণ মানুষের মনেও একটা বিরাট প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে, তাদের নেতত্বে সত্যি সত্যি দেশ একটি নতুন গন্তব্যের দিকে যাবে। দেশের মানুষ বছরের পর বছর ধরে যে ভোট ও গণতন্ত্রহীনতার মধ্যে ছিল, তার অবসান ঘটবে। সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিক করার চেষ্টা করবে। সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসগুলোয় সেবা নিতে গিয়ে আর হয়রানি ও ঘুষ দুর্নীতির শিকার হবে না। থানায় গিয়ে পুলিশের কাছ থেকে সম্মানজনক আচরণ পাবে। কিন্তু এই এক বছরে কোথাও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে? সরকারি অফিসগুলো কি আগের মতোই চলছে না? বরং কোথাও কোথাও দুর্নীত, অনিয়ম ও ঘুষ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি বলে শোনা যায়।
সরকার ইদানীং নির্বাচনের পক্ষে বেশ জোরালো বক্তব্য দিলেও তাদের প্রধান স্টেকহোল্ডাররা নির্বাচনের পক্ষে নয়। তারা জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই নিজেদের মতো করে নিজেদের আদর্শ ও ভাবনা-চিন্তা; নিজেদের দর্শন, নিজেদের রাষ্ট্রভাবনা (যার অনেক কিছুই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের মূল স্পিরিট এবং এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর চিন্তা ও মতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক) ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে চায়। কারণ জনগণ তাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠাবে—সেই আত্মবিশ্বাস সম্ভবত তারা এখনও অর্জন করতে পারেনি। পারেনি বলেই নির্বাচনটাই তাদের কাছে এখন সবচেয়ে অপ্রিয় বিষয়। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনগণের ওপর না দিয়ে নিজেরাই মব সৃষ্টি করে রাজনৈতিক দলের কার্যালয় জ্বালিয়ে দিতে চায়; তাদের নেতাকর্মীদের নিশ্চিহ্ন করতে চায়; সরকারকে চাপ দিয়ে দল নিষিদ্ধ করতে চায়। অথচ কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের আছে কি না, সেটি বিরাট প্রশ্ন। বরং যেহেতু তারা অন্তর্বর্তী তথা একটি বিশেষ সময়ের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছে, ফলে দ্রুত একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে নিয়ে যাওয়াই প্রধান কাজ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু গত এক বছর ধরে যেসব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বা নির্বাচন নিয়ে এখনও যেসব পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা চলছে, তাতে জনগণের ক্ষমতায়ন তথা দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও কতদিন অপেক্ষা করতে হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।
এইচআর/এমএস