ন্যূনতম কর ও উৎসে করের দ্বৈত চাপ অর্থনীতির নীরব ঝুঁকি
বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর অধীনে এই ব্যবস্থার সঙ্গে টার্নওভার-ভিত্তিক ন্যূনতম করের সমন্বিত প্রয়োগ সরকারকে একটি স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করলেও, এর ফলে ব্যবসা খাতে সৃষ্ট হচ্ছে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা, বিশেষ করে নগদ প্রবাহ, কর-সমতা এবং অর্থনৈতিক দক্ষতার ক্ষেত্রে। উন্নত দেশের কর ব্যবস্থায় উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থা মূলত অগ্রিম কর হিসেবে ধারণা করা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম করের সীমা ছাড়িয়ে ন্যূনতম বা চূড়ান্ত করের চরিত্র ধারণ করেছে। ন্যূনতম করের মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো করদাতা যাতে সম্পূর্ণভাবে করের আওতার বাইরে থাকতে না পারে তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লোকসান দেখালেও বা খুব কম লাভ প্রদর্শন করলেও, নির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর তাকে একটি ন্যূনতম কর প্রদান করতে হয়। এটি কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং রাজস্ব সুরক্ষার একটি উপায়। বাংলাদেশে এই ন্যূনতম কর প্রধানত দুভাবে কার্যকর হয়। প্রথমত, টার্নওভার-ভিত্তিক কর, যেখানে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে মোট প্রা
বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থায় উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর অধীনে এই ব্যবস্থার সঙ্গে টার্নওভার-ভিত্তিক ন্যূনতম করের সমন্বিত প্রয়োগ সরকারকে একটি স্থিতিশীল রাজস্ব প্রবাহ নিশ্চিত করতে সহায়তা করলেও, এর ফলে ব্যবসা খাতে সৃষ্ট হচ্ছে একাধিক কাঠামোগত সমস্যা, বিশেষ করে নগদ প্রবাহ, কর-সমতা এবং অর্থনৈতিক দক্ষতার ক্ষেত্রে। উন্নত দেশের কর ব্যবস্থায় উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থা মূলত অগ্রিম কর হিসেবে ধারণা করা হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় তা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম করের সীমা ছাড়িয়ে ন্যূনতম বা চূড়ান্ত করের চরিত্র ধারণ করেছে।
ন্যূনতম করের মূল উদ্দেশ্য হলো, কোনো করদাতা যাতে সম্পূর্ণভাবে করের আওতার বাইরে থাকতে না পারে তা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লোকসান দেখালেও বা খুব কম লাভ প্রদর্শন করলেও, নির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর তাকে একটি ন্যূনতম কর প্রদান করতে হয়। এটি কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং রাজস্ব সুরক্ষার একটি উপায়। বাংলাদেশে এই ন্যূনতম কর প্রধানত দুভাবে কার্যকর হয়।
প্রথমত, টার্নওভার-ভিত্তিক কর, যেখানে লাভ-লোকসান নির্বিশেষে মোট প্রাপ্তির ওপর কর আরোপ করা হয়। বর্তমানে নির্দিষ্ট সীমার (যেমন— কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৪ কোটি টাকা গ্রস প্রাপ্তি) অধিক হলে করদাতাদের টার্নওভার-ভিত্তিক ন্যূনতম কর দিতে হয়। খাতভেদে এই হার ০.১% থেকে ৩% পর্যন্ত হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, তামাক ও মিষ্টি পানীয় প্রস্তুতকারকদের জন্য ৩%, মোবাইল অপারেটরদের জন্য ১.৫% এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সাধারণত ১% হার প্রযোজ্য।
দ্বিতীয়ত, উৎসে কর্তিত কর অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম করের মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করে। আইনগতভাবে এই করকে সাধারণত অগ্রিম কর হিসেবে বিবেচনা করা এবং পরবর্তীতে চূড়ান্ত কর নির্ধারণের সময় সমন্বয়যোগ্য হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তব প্রয়োগে দেখা যায়, এই উৎসে কর্তিত কর অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম কর হিসেবে বিবেচিত হয়। এভাবে এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে করদাতার আর্থিক অবস্থা অনুকূল না হলেও সরকার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ১৬৩ অনুযায়ী ধারা ৮৮ থেকে ১৩৯ পর্যন্ত মোট ৩৮টি ধারার অধীনে যে কর উৎসে কেটে রাখা বা সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোর একটি বড় অংশ বাস্তবে সংশ্লিষ্ট আয়ের ওপর ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ, পরবর্তীতে হিসাব অনুযায়ী করের পরিমাণ কম হলেও, পূর্বে কর্তিত বা সংগৃহীত এই করের পরিমাণই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে, যা কর কাঠামোর মধ্যে একটি বাস্তবিক অসামঞ্জস্যতা সৃষ্টি করে।
উৎসে সংগৃহীত করের একটি বড় অংশ বাস্তবে চূড়ান্ত বা ন্যূনতম করের বৈশিষ্ট্য ধারণ করছে, যা কর কাঠামোকে জটিল ও অসম করে তুলছে। এই দ্বৈত করব্যবস্থার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর করহার (effective tax rate) প্রকৃত আয়ের ওপর নির্ধারিত করহারের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হয়ে যায়—অনেক ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যবসার মূলধন ও নগদ প্রবাহে। বিশেষ করে ঋণনির্ভর ব্যবসাগুলো অতিরিক্ত করভার বহনে হিমশিম খায়; ফলে সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়ে। এটি কেবল পৃথক ব্যবসার সমস্যা নয়; বরং সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি। দীর্ঘমেয়াদে এটি প্রতিষ্ঠানের মূলধন কাঠামোকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে এবং নতুন বিনিয়োগ, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন কর কাঠামো প্রত্যাশা করেন, যেখানে করের হিসাব লাভ-লোকসানের সঙ্গে যৌক্তিক সম্পর্ক বজায় রাখে, কর-সমন্বয় ও রিফান্ড ব্যবস্থা কার্যকর থাকে এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা কম থাকে।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী কর আরোপের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত আয় বা মুনাফা। কিন্তু ন্যূনতম কর আরোপ করা হয় মোট প্রাপ্তির ওপর, যেখানে কোনো ব্যয় কর্তনের সুযোগ থাকে না, এমনকি লোকসানের ক্ষেত্রেও। এটি আয়কর ব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া করদাতার পরিশোধ সক্ষমতার নীতিও এখানে উপেক্ষিত হয়। ন্যূনতম কর লাভজনকতা বিবেচনা না করে আরোপ করা হয়, যা অর্থনৈতিকভাবে শাস্তিমূলক চরিত্র ধারণ করে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি দ্বৈত করের ঝুঁকি তৈরি করে—কারণ লোকসানকালে প্রদত্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যৎ লাভের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য নয়।
উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে উৎসে কর সাধারণত অগ্রিম কর হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে এবং তা চূড়ান্ত করের সঙ্গে সমন্বয়যোগ্য। প্রতিবেশী ভারতেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যেখানে উৎসে কর পরবর্তীতে করদাতার চূড়ান্ত কর দায়ের সঙ্গে সমন্নয় করা যায়, ফলে করদাতার ওপর “ডাবল মিনিমাম” চাপ তুলনামূলক কম পড়ে। বাংলাদেশে এই দুই ব্যবস্থার আংশিক একীভূত প্রয়োগ কর কাঠামোকে জটিল করেছে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর ব্যবস্থাকে অধিকতর যুক্তিসঙ্গত, ন্যায্য এবং ব্যবসাবান্ধব করতে আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থ বাজেটে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে—
• আয়কর আইনের ধারা ১৬৩-এর অধীনে ন্যূনতম করের বিধানটি অর্থনৈতিকভাবে শাস্তিমূলক এবং আয়করের নীতির সাথে আইনগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিধায় কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও অখণ্ডতা পুনরুদ্ধারের জন্য এই স্বেচ্ছাচারী বিধানটি অবিলম্বে বাতিল করা উচিত।
• উৎসে কর্তিত করকে স্পষ্টভাবে অগ্রিম কর হিসেবে ঘোষণা করা এবং তা চূড়ান্ত করের সঙ্গে সম্পূর্ণ সমন্বয়যোগ্য করা।
• উৎসে করের হার অর্থনীতির সকল ধরনের ঝুঁকি বিবেচনা করে শিল্প প্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক এবং অন্যান্য সরবরাহকারীদের জন্য ২% নির্ধারণ করা; তবে বিজ্ঞাপনী সংস্থা, মিডিয়া হাউজ ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য তা ১% নির্ধারণের বিধান প্রণয়ন করা।
• টার্নওভার-ভিত্তিক ন্যূনতম করহার হ্রাস করে সর্বজনীনভাবে ০.৫%-এ নির্ধারণ করা।
• লোকসানকালীন সময়ে প্রদত্ত ন্যূনতম কর ভবিষ্যৎ লাভের সঙ্গে জের টানার (carry forward) ব্যবস্থা চালু করে সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়া।
• একই আয়ের ওপর একাধিকবার কর আরোপের ঝুঁকি দূর করতে কর কাঠামোর সরলীকরণ।
• ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ন্যূনতম কর থেকে আংশিক বা শর্তসাপেক্ষ অব্যাহতি।
• প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত বা লোকসানি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে সাময়িক অবকাশ, রেয়াত বা বিশেষ ব্যবস্থার সুযোগ রাখা যেতে পারে, যাতে কর নীতি রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সহায়ক হিসেবে কাজ করবে।
রাজস্ব আহরণ নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করাও সমান জরুরি। বর্তমান ন্যূনতম কর ও উৎসে করের কাঠামো, যেখানে একই সঙ্গে অগ্রিম, ন্যূনতম এবং আংশিক চূড়ান্ত করের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, তা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে। আগামী বাজেটে এই বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ন্যায্য এবং বিনিয়োগবান্ধব করব্যবস্থা প্রবর্তন করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : ফয়সাল ইসলাম এফিসিএ, আর্থিক খাতের বিশ্লেষক।
ই-মেইল : [email protected]
What's Your Reaction?