পরের ধনে পোদ্দারি করেই শত কোটি ডলারের মালিক
ব্যবসায় সফল হতে হলে কি সব সময় নতুন কোনো আইডিয়া বা প্রোডাক্ট তৈরি করতে হয়? নিজের একটি ব্র্যান্ড বা লোগো থাকা কি শত কোটি ডলারের মালিক হওয়ার একমাত্র উপায়? ব্যবসা জগতের এই চেনা ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন এক মার্কিন ব্যবসায়ী। তিনি নিজে কোনো নতুন রেস্তোরাঁ খোলেননি, তৈরি করেননি নিজস্ব কোনো খাবারের রেসিপি। অথচ বিশ্ববিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের আউটলেট পরিচালনা করেই তিনি আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন। তিনি হলেন গ্রেগ ফ্লিন, বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি বিলিয়নিয়ার’। পিৎজা হাট, ট্যাকো বেল কিংবা ওয়েন্ডিসের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি (ব্যবসা করার স্বত্ব) কিনে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। তিনি বুঝতে পারেন, আবাসন ব্যবসায় যেখানে অনেক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থাকে, সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো ব্র্যান্ডের আউটলেট চালানো অনেক বেশি নিরাপদ। ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা কী? সহজ কথায়, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা হলো এমন একটি মডেল যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম, লোগো, পণ্য ও ব্যবসায়িক পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে অন্য কেউ ব্যবসা পরিচালনা করে। আরও পড়ুন>>এনভিডিয়া যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি
ব্যবসায় সফল হতে হলে কি সব সময় নতুন কোনো আইডিয়া বা প্রোডাক্ট তৈরি করতে হয়? নিজের একটি ব্র্যান্ড বা লোগো থাকা কি শত কোটি ডলারের মালিক হওয়ার একমাত্র উপায়? ব্যবসা জগতের এই চেনা ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন এক মার্কিন ব্যবসায়ী। তিনি নিজে কোনো নতুন রেস্তোরাঁ খোলেননি, তৈরি করেননি নিজস্ব কোনো খাবারের রেসিপি। অথচ বিশ্ববিখ্যাত সব ব্র্যান্ডের আউটলেট পরিচালনা করেই তিনি আজ ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন।
তিনি হলেন গ্রেগ ফ্লিন, বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি বিলিয়নিয়ার’। পিৎজা হাট, ট্যাকো বেল কিংবা ওয়েন্ডিসের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি (ব্যবসা করার স্বত্ব) কিনে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।
তিনি বুঝতে পারেন, আবাসন ব্যবসায় যেখানে অনেক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থাকে, সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো ব্র্যান্ডের আউটলেট চালানো অনেক বেশি নিরাপদ।
ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা কী?
সহজ কথায়, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসা হলো এমন একটি মডেল যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির নাম, লোগো, পণ্য ও ব্যবসায়িক পদ্ধতি ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে অন্য কেউ ব্যবসা পরিচালনা করে।
আরও পড়ুন>>
এনভিডিয়া যেভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানি হলো
লুই ভুটন থেকে টিফানি/ যেভাবে লাক্সারি সাম্রাজ্যের রাজা হলেন বার্নার্ড আর্নল্ট
টিকটক দিয়ে বিশ্ব মাত, ৩৮ বছরেই শীর্ষ ধনীর কাতারে
উদাহরণস্বরূপ—পিৎজা হাট বা ট্যাকো বেল কোনো নতুন দেশে বা এলাকায় নিজে সরাসরি দোকান না খুলে, অন্য একজন ব্যবসায়ীকে তাদের ব্র্যান্ডের নামে দোকান খোলার লাইসেন্স দেয়।

ফ্লিনের মালিকানাধীন ‘অ্যাপলবিস’-এর একটি রেস্তোরাঁ/ ছবি: ফ্লিন গ্রুপ
যে মূল কোম্পানি ব্র্যান্ডের লাইসেন্স দেয় তাকে বলা হয় ‘ফ্র্যাঞ্চাইজ’ (যেমন: পিৎজা হাট) এবং যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান টাকা দিয়ে সেই লাইসেন্স কিনে দোকান চালায় তাকে বলা হয় ‘ফ্র্যাঞ্চাইজি’ (যেমন: গ্রেগ ফ্লিন)।
ব্যবসা শুরু করার জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিকে মূল কোম্পানির কাছে একটি নির্দিষ্ট অংকের এককালীন লাইসেন্স ফি দিতে হয়। দোকান চালু হওয়ার পর প্রতি মাসের মোট বিক্রির একটি নির্দিষ্ট শতাংশ মূল কোম্পানিকে দিতে হয় রয়্যালটি বা ফি হিসেবে।
খাবারের রেসিপি, দোকানের ডিজাইন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীবাহিনীর প্রশিক্ষণ—সবকিছু মূল কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী হতে হয়, যাতে সব আউটলেটের মান একই থাকে।
রিয়েল এস্টেট থেকে রেস্তোরাঁ ব্যবসায় পদার্পণ
ফ্রাঞ্চাইজি ব্যবসায় গ্রেগ ফ্লিনের এই বিশাল সাম্রাজ্যের শুরুটা কিন্তু হুট করে হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা ব্রাউন, ইয়েল এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে গ্রেগ ফ্লিন প্রথমে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ফ্লিন প্রপার্টিজ’।
তবে নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তার চিন্তাভাবনায় বড় পরিবর্তন আসে। গ্রেগের বাবা দুটি ‘বার্জার কিং’ আউটলেট চালাতেন। সেই দোকানগুলো থেকে প্রতি মাসে কেমন লাভ হতো, তা খুব কাছ থেকে দেখেন গ্রেগ। তিনি বুঝতে পারেন, আবাসন ব্যবসায় যেখানে অনেক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা থাকে, সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত কোনো ব্র্যান্ডের আউটলেট চালানো অনেক বেশি নিরাপদ।
আরও পড়ুন>>
শ্রমিক থেকে পানি ব্যবসায়ী, আজ চীনের শীর্ষ ধনী
অনলাইনে বইবিক্রেতা থেকে শত কোটির মালিক
বাবার ক্যানসারে ভার্সিটি ছেড়েছিলেন, আজ সুইজারল্যান্ডের শীর্ষ ধনী
এই ভাবনা থেকেই ১৯৯৯ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে আটটি ‘অ্যাপলবিস’ রেস্তোরাঁ কেনার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তার ফ্র্যাঞ্চাইজি যাত্রা শুরু হয়।

ফ্লিনের মালিকানাধীন ‘পিৎজা হাট’-এর একটি রেস্তোরাঁ/ ছবি: ফ্লিন গ্রুপ
যেভাবে গড়ে উঠলো গ্রেগ ফ্লিনের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য
প্রথম ১০ বছর গ্রেগ ফ্লিন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শুধু অ্যাপলবিস ব্র্যান্ডের আউটলেট বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দেন। এরপর ২০১১ সাল থেকে তিনি তার ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনার সিদ্ধান্ত নেন। কিনতে শুরু করেন একের পর এক বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি।
২০১৩ সালে তিনি একবারে ৭৬টি ট্যাকো বেল আউটলেট কিনে নেন। ২০১৮ সালে কেনেন ৩৬৮টি আরবিস আউটলেট। ২০২১ সালে করোনা মহামারির সময়ে যখন অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি একচেটিয়াভাবে ৯৩৭টি পিৎজা হাট এবং ওয়েন্ডিস আউটলেট কিনে পুরো বিশ্বে শোরগোল ফেলে দেন।
বর্তমানে তার মূল প্রতিষ্ঠান ফ্লিন গ্রুপের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে মোট তিন হাজারেরও বেশি আউটলেট রয়েছে। এসব আউটলেটে কাজ করছেন ৭৮ হাজারের বেশি কর্মী।
ইতিহাসের পাতায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসার প্রথম বিলিয়নিয়ার
অন্যের ব্র্যান্ডের ফ্র্যাঞ্চাইজি চালিয়েও যে বিলিয়নিয়ার হওয়া সম্ভব, তা গ্রেগ ফ্লিন বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ব্যবসা সাময়িকীগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গ্রেগ ফ্লিনের বর্তমান ব্যক্তিগত মোট সম্পদের পরিমাণ এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তার প্রতিষ্ঠিত ফ্লিন গ্রুপ প্রতি বছর গড়ে পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য বিক্রি করে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি জগতের ইতিহাসে সাধারণত ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসির মতো বড় ব্র্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠাতাদেরই সবচেয়ে বড় আইকন মনে করা হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে ইন্টারন্যাশনাল ফ্র্যাঞ্চাইজি অ্যাসোসিয়েশন (আইএফএ) গ্রেগ ফ্লিনকে তাদের মর্যাদাপূর্ণ ‘হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। তিনিই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি, যিনি কোনো মূল ব্র্যান্ডের মালিক না হয়েও কেবল একজন ফ্র্যাঞ্চাইজি অপারেটর হিসেবে এই গৌরব অর্জন করলেন।
রেস্তোরাঁ পেরিয়ে ফিটনেস ব্যবসায়
গ্রেগ ফ্লিন কেবল খাবারের ব্যবসায় আটকে থাকেননি। নিজের ব্যবসাকে আরও নিরাপদ করতে তিনি বিশ্বখ্যাত ফিটনেস চেইন ‘প্ল্যানেট ফিটনেস’-এর ফ্র্যাঞ্চাইজি নেওয়া শুরু করেছেন। পাশাপাশি তার মূল প্রতিষ্ঠান ‘ফ্লিন প্রপার্টিজ’-এর অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তে বিলাসবহুল হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবনের বড় ব্যবসা রয়েছে।

ফ্লিনের মালিকায় ‘ওয়েন্ডিস’-এর একটি রেস্তোরাঁ উদ্বোধন/ ছবি: ফ্লিন গ্রুপ
গ্রেগ ফ্লিনের তিনটি সফল ব্যবসায়িক কৌশল
ফ্লিনের এই আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে রয়েছে অত্যন্ত চমৎকার তিনটি ব্যবসায়িক কৌশল, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় একটি গাইডলাইন:
১. লোকসানি আউটলেট কিনে লাভজনক করা
ফ্লিন কখনো চকচকে, নতুন কোনো দোকানে বড় বিনিয়োগ করতে পছন্দ করেন না। তার মূল কৌশল হলো—ভুল ব্যবস্থাপনা বা ঋণের কারণে যেসব আউটলেট লোকসানে আছে বা বন্ধ হওয়ার পথে, সেগুলো অত্যন্ত কম দামে কিনে নেওয়া। এরপর তিনি তার নিজস্ব দক্ষ ম্যানেজমেন্ট দল দিয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলোকে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করেন।
২. পরিচালকদের স্বাধীনতা দেওয়া
তিন হাজারের বেশি রেস্তোরাঁ একা দেখাশোনা করা অসম্ভব। তাই ফ্লিন তার পুরো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যকে বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে দক্ষ আঞ্চলিক পরিচালকদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তারা এসব আউটলেট পরিচালনায় সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে থাকেন। এই পরিচালকদের কেবল বেতন দেওয়া হয় না, বরং আউটলেটের লভ্যাংশ বা শেয়ারও দেওয়া হয়। ফলে প্রত্যেকে এটিকে নিজের ব্যবসা মনে করে মন দিয়ে কাজ করেন।
৩. কেন্দ্রীয় প্রযুক্তির ব্যবহার
আউটলেটগুলো স্থানীয়ভাবে স্বাধীন পদ্ধতিতে চললেও তাদের মূল চালিকাশক্তি যেমন—উন্নত সফটওয়্যার বা প্রযুক্তি, হিসাব-নিকাশ, আইনি সহায়তা এবং মানবসম্পদ বিভাগটি নিয়ন্ত্রিত হয় কেন্দ্রীয় সদরদপ্তর থেকে। এর ফলে সব আউটলেটের খরচ অনেক কমে যায় এবং কাজের মান ঠিক থাকে।
নতুন কৌশলে সাফল্যের বার্তা
গ্রেগ ফ্লিন প্রমাণ করেছেন, সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছাতে সবসময় নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে না। অন্যের সুপ্রতিষ্ঠিত মডেল ও ব্র্যান্ডের ওপর ভর করেও যে শতকোটি ডলারের অনন্য সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব—তার জীবন্ত উদাহরণ তিনি। দূরদর্শিতা, নিখুঁত ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ব্যবসা জগতের প্রচলিত নিয়ম ও চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন ইতিহাসের এই প্রথম ফ্র্যাঞ্চাইজি বিলিয়নিয়ার।
সূত্র: ফ্লিন গ্রুপ, আইএফএ, ফোর্বস, দ্য ইকোনমিস্ট, লেক্সপ্রেস ফ্রাঞ্চাইজ
কেএএ/
What's Your Reaction?