পর্দার আড়ালে গোপন ছক কষেন আর্জেন্টিনার দুই ‘মাস্টারমাইন্ড’
এবারের বিশ্বকাপে সম্ভবত পুরো ফুটবল বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শিরোপার অন্যতম দাবিদার তারা আগেই ছিল, কিন্তু যেভাবে ফাইনালে পৌঁছেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় চমক। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই প্রায় খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে লিওনেল মেসির দল। এতদিন যেসব জায়গাকে আর্জেন্টিনার দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতো, এবার ঠিক সেখানেই তারা দেখিয়েছে সবচেয়ে বড় শক্তি। স্নায়ুচাপ সামলানো, সেটপিস থেকে গোল আদায় কিংবা প্রতিপক্ষের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল প্রায় নিখুঁত। আর্জেন্টিনার সাফল্যে হেড কোচ লিওনেল স্কালোনিই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন। কিন্তু তিনিই শুধু নন, আলবিসিলেস্তেদের অজেয় হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে পর্দার আড়ালে আছেন আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ কারিগর-সহকারী কোচ ওয়াল্টার স্যামুয়েল এবং কম্পিউটার অ্যানালিস্ট মাতিয়াস মান্না। মান্না নিজে কখনো পেশাদার ফুটবল খেলেননি, তবে ভক্ত ছিলেন বটে! স্পেনের মিডফিল্ডার ও বর্তমানে বিখ্যাত কোচ পেপ গার্দিওলাকে অনুসরণ করতেন। রোজারিও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে যোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক শেষ করে গার্দিওলার প্রতি মুগ্ধতা থেকে একটি ব্লগ
এবারের বিশ্বকাপে সম্ভবত পুরো ফুটবল বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। শিরোপার অন্যতম দাবিদার তারা আগেই ছিল, কিন্তু যেভাবে ফাইনালে পৌঁছেছে, সেটাই সবচেয়ে বড় চমক। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচেই প্রায় খাদের কিনারা থেকে ফিরে এসে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে লিওনেল মেসির দল।
এতদিন যেসব জায়গাকে আর্জেন্টিনার দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতো, এবার ঠিক সেখানেই তারা দেখিয়েছে সবচেয়ে বড় শক্তি। স্নায়ুচাপ সামলানো, সেটপিস থেকে গোল আদায় কিংবা প্রতিপক্ষের দুর্ভেদ্য রক্ষণ ভাঙা-প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল প্রায় নিখুঁত। আর্জেন্টিনার সাফল্যে হেড কোচ লিওনেল স্কালোনিই আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন। কিন্তু তিনিই শুধু নন, আলবিসিলেস্তেদের অজেয় হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে পর্দার আড়ালে আছেন আরও দুই গুরুত্বপূর্ণ কারিগর-সহকারী কোচ ওয়াল্টার স্যামুয়েল এবং কম্পিউটার অ্যানালিস্ট মাতিয়াস মান্না।
মান্না নিজে কখনো পেশাদার ফুটবল খেলেননি, তবে ভক্ত ছিলেন বটে! স্পেনের মিডফিল্ডার ও বর্তমানে বিখ্যাত কোচ পেপ গার্দিওলাকে অনুসরণ করতেন। রোজারিও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে যোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক শেষ করে গার্দিওলার প্রতি মুগ্ধতা থেকে একটি ব্লগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ব্লগটির নাম দেন ‘প্যারাডিগমা গার্দিওলা’। ব্লগ যে খুব জনপ্রিয় ছিল তাও না। তবে এই ব্লগ থেকে একটি বই বের করতেই সেটি হুড়হুড় করে চলতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ফুটবল বিশ্বে।
শৈশবে মাদ্রিদ সফরে গিয়েই গার্দিওলার প্রতি মান্নার মুগ্ধতার শুরু। সে সময় তাকে গার্দিওলার নাম লেখা একটি বার্সেলোনা জার্সি উপহার দেওয়া হয়েছিল। ততদিনে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিংয়ের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন গার্দিওলা। তার কোচিং বিশ্লেষণ করতে থাকেন মান্না, সেই ব্লগও জনপ্রিয় হওয়া শুরু করে। এর আগেই অবশ্য অনেক খোঁজাখুঁজির পর গার্দিওলার ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন মান্না এবং ২০০৬ সালে দুজনেই যখন বুয়েনস আইরেসে ছিলেন, তখন তাকে সাক্ষাতের জন্য রাজি করাতে সক্ষম হন। এক কাপ কফি খাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হওয়া গার্দিওলা মান্নার সঙ্গে সেখানে কাটিয়েছিলেন ৩ ঘণ্টার বেশি! পরে প্ল্যানেট ফুটবলকে মান্না বলেন, ‘সেই সাক্ষাতের পর গার্দিওলা আমাকে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন-আমি এইমাত্র এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করে এলাম, যিনি ফুটবল সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানেন।’
২০০৭ সালে এক বন্ধুর মাধ্যমে মান্নার পরিচয় হয় বিখ্যাত আর্জেন্টাইন ফুটবল কোচ মার্সেলো বিয়েলসার সঙ্গে। মাত্র ২৩ বছর বয়সী মান্নার ফুটবল বিশ্লেষণে মুগ্ধ হয়ে বিয়েলসা তাকে বিশ্লেষক (অ্যানালিস্ট) হিসেবে কাজের প্রস্তাব দেন। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবল জগতে তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। এরপর আসে ২০১০ বিশ্বকাপ। ২০১১ সালে বিয়েলসা চিলির দায়িত্ব ছাড়ার পর মান্না আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের অধীনে কোচিং লাইসেন্স সম্পন্ন করেন। পরে আর্জেন্টাইন প্রিমেরা ডিভিশনের ক্লাব উনিয়ন দে সান্তা ফে এবং সান মার্টিন দে সান হুয়ানে ফাকুন্দো সাভার অধীনে কোচ ও বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করেন।
২০১২ সালে চিলি জাতীয় দলের নতুন কোচ হোর্হে সাম্পাওলির কোচিং প্যানেলে যোগ দেন মান্না। ২০১৫ সালে চিলির ঐতিহাসিক কোপা আমেরিকা জয়ে ভূমিকা রাখেন। পরে ২০১৬ সালে সাম্পাওলি যখন স্পেনের ক্লাব সেভিয়ার দায়িত্ব নেন, তখন মান্নাও তার সঙ্গে সেখানে যোগ দেন। বিয়েলসার প্রভাবে গড়ে ওঠা সরাসরি ও দ্রুতগতির আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে ধীরে ধীরে বলের দখলনির্ভর, নিয়ন্ত্রিত ফুটবলে ঝুঁকতে শুরু করেন সাম্পাওলি-যা গার্দিওলার দর্শনের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাম্পাওলি একসময় দৌড়ানোর সময়ও নিয়মিত বিয়েলসার সংবাদ সম্মেলনের রেকর্ডিং শুনতেন। এ কারণে মান্নার সঙ্গেও তার সবদিকেই মিলে যায়।
এরপর ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টার সিটিতে কাজ করার জন্য মান্নাকে ডেকেছিলেন গার্দিওলা। তবে মান্না যাননি, কারণ তার লক্ষ্য ছিল আর্জেন্টিনার হয়ে কাজ করা। ২০১৭ সালে মান্না ও সাম্পাওলি দুজনই আর্জেন্টিনা দলে যোগ দেন। কৌশলগত বিশ্লেষণ এবং খেলোয়াড়দের পর্যবেক্ষণের অংশ হিসেবে ‘স্যান্ডবল’ নামে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম তৈরিতে ভূমিকা রাখেন মান্না। তার মনে হয়েছিল, বোর্ডে আকাবুকি করে খেলোয়াড়দের বোঝানো কঠিন, তারাও অনেক সময় মনোযোগ ধরে মেসিসহ দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় তখন জয়স্টিক দিয়ে ফিফা ভিডিও গেমটা খেলতে ভীষণ ভালোবাসতেন। মান্না সহজ সমাধান বের করে দিলেন। তার নেতৃত্বে তৈরি হলো ফিফার মতোই একটি সিম্যুলেটর গেম ‘স্যান্ডবল’। এটাও জয়স্টিক দিয়ে খেলা যায়। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এখন ম্যাচের আগে স্ট্র্যাটেজিক ব্রিফ পান এই স্যান্ডবল দিয়েই।
‘লা নাসিওন’ কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মান্না বলেন, ‘আমি দেখেছি, কিলমেসে ফাকুন্দো সাভার টিম টকে ছয় থেকে আট মিনিটের পর অনেক খেলোয়াড়ই মনোযোগ হারিয়ে ফেলত। কিন্তু যখন আমরা তাদের একমাত্র কম্পিউটারের সামনে বসাতাম, তারা কিবোর্ড ব্যবহার করে খেলতে শুরু করত। তখন দেখা যেত, তারা পুরোপুরি আগ্রহ নিয়ে বিষয়টি অনুসরণ করছে।’
২০১৮ বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর সাম্পাওলির কোচিং প্যানেল বরখাস্ত হয়। তবে টিকে যান মান্না, মাত্র ৩৪ বছর বয়সেই মান্না এমন সাফল্য অর্জন করেছেন, যা অনেক কোচ পুরো ক্যারিয়ারেও করতে পারেন না। তার ‘প্যারাডিগমা গার্দিওলা’ ব্লগে এখনও নিয়মিত ম্যানচেস্টার সিটিতে পেপ গার্দিওলার কাজ ও ফুটবল দর্শনের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়।
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সাফল্যের আরেক কান্ডারি সহকারী কোচ মাঠে একসময় ‘দ্য ওয়াল’ নামে আর্জেন্টিনার সাবেক সেন্টারব্যাক স্যামুয়েল ওয়াল্টার। এখন আর্জেন্টিনার সেটপিস কৌশলের প্রধান কারিগর তিনিই। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে লিওনেল মেসির নেওয়া কর্নার থেকে একই জায়গায় উঠে এসে হেডে গোল করেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে থাকা স্যামুয়েলের উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছিল-এটি কাকতালীয় নয়, পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন।
ম্যাচ শেষে স্কালোনিও কৃতিত্ব দেন তার সহকারীকে। তিনি জানান, স্যামুয়েল দীর্ঘদিন ধরে এই নির্দিষ্ট কর্নার রুটিন নিয়ে কাজ করেছেন। বারবার চেয়েছেন মেসি যেন বলটি নিয়ার পোস্টের সেই নির্দিষ্ট জায়গায় পাঠান। আগের ম্যাচেও কয়েকবার চেষ্টা হয়েছিল, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে সেটিই এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত ফল।
স্কালোনির ভাষায়, ‘শুধু সেটপিস নয়, ওয়াল্টার প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে অবিশ্বাস্য পরিশ্রম করে। অনেকে ভাবে সেটপিস মানেই লম্বা খেলোয়াড় দরকার। কিন্তু অ্যালেক্সিস খুব লম্বা না হলেও হেডে অসাধারণ। আমরা জানি কার শক্তি কোথায়, আর সেই অনুযায়ী বলও পৌঁছে দেওয়া হয়।’
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা কর্নার থেকেই করেছে তিনটি গোল, যা ইংল্যান্ড ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ। কেপ ভার্দের বিপক্ষে কর্নার থেকে গোল করেছিলেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, আর ক্রিস্তিয়ান ‘কুটি’ রোমেরোর হেড থেকেই এসেছিল আত্মঘাতী গোল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জর্ডানের বিপক্ষে জিওভানি লো সেলসো ও মেসির সরাসরি ফ্রি-কিকের গোল। অর্থাৎ সেটপিস থেকে আর্জেন্টিনার গোল এখন পাঁচটি-১৯৬৬ সালের পর কোনো বিশ্বকাপে তাদের সর্বোচ্চ।
আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো, বিশ্বকাপের সবচেয়ে খাটো গড় উচ্চতার স্কোয়াডগুলোর একটি নিয়েই এই সাফল্য পেয়েছে আর্জেন্টিনা। স্যামুয়েলের নিজের ক্যারিয়ারও ছিল একই রকম দৃঢ়তার প্রতীক। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ, বোকা জুনিয়র্স, রোমা, রিয়াল মাদ্রিদ, ইন্টার মিলান ও বাসেলের হয়ে খেলা এই ডিফেন্ডার আর্জেন্টিনার জার্সিতে খেলেছেন ৫৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। খেলোয়াড়ি জীবনে ‘দ্য ওয়াল’ নামে পরিচিত স্যামুয়েল ২০১৭-১৮ সালে সুইস ক্লাব লুগানোর সহকারী কোচ ছিলেন। পরে স্কালোনির সঙ্গে যোগ দেন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে।
২০২৫ সালে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যামুয়েল বলেছিলেন, ‘তোমরা যা অর্জন করেছ, অন্য কাউকে সেটা অর্জন করতে দিও না। যে ট্রফি তোমাদের জেতার সুযোগ আছে, সেটা যেন অন্য কেউ না জেতে।’
মনে হচ্ছে খেলোয়াড়রা সেই কথাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলছেন। কারণ, শিরোপা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলা আর্জেন্টিনা এখন আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালের দুয়ারে পৌঁছে গেছে।
আর পর্দার সামনে মেসির জাদু যতটা আলো কাড়ছে, পর্দার আড়ালে মান্না ও স্যামুয়েলের মস্তিষ্কও ততটাই এগিয়ে দিচ্ছে আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপ ধরে রাখার স্বপ্নের পেছনে তাই কেবল তারকাদের নয়, এই দুই নীরব কারিগরের অবদানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এসকেডি/এমএমআর
What's Your Reaction?