‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার গেটে কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন বয়স্ক এক নারী শাবানা বেগম। কথা বললে জানান, ছেলেকে দেখতে এসেছেন। তার ছেলে স্যানেটারি মিস্ত্রির কাজ করলেও রিকশা থেকে এক পিস ইয়াবা বড়িসহ গ্রেফতার হয়েছেন।  শুধু শাবানা বেগম নন, মোহাম্মদপুর থানায় প্রতিদিনই নানা প্রয়োজনে ভিড় করছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। কেউ এসেছেন অভিযোগ জানাতে, কেউ আবার স্বজনের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। এরই মধ্যে থানায় আসামি আনা-নেওয়ার কার্যক্রম, অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের আনাগোনায় ছিল ব্যস্ততম পরিবেশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, গত ৭ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত তেজগাঁও জোনে মোট ২২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকেই ৭৯ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আরও পড়ুন যুবলীগের দেড় মিনিটের মিছিল, সীমানা নিয়ে দুই থানার ঠেলাঠেলি মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে বিশেষ অভিযান, মাদকসহ আটক ১৩ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে থানা ও এর সামনে বাড়তে থাকে লোকজনের আনা

‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার গেটে কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন বয়স্ক এক নারী শাবানা বেগম। কথা বললে জানান, ছেলেকে দেখতে এসেছেন। তার ছেলে স্যানেটারি মিস্ত্রির কাজ করলেও রিকশা থেকে এক পিস ইয়াবা বড়িসহ গ্রেফতার হয়েছেন। 

শুধু শাবানা বেগম নন, মোহাম্মদপুর থানায় প্রতিদিনই নানা প্রয়োজনে ভিড় করছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। কেউ এসেছেন অভিযোগ জানাতে, কেউ আবার স্বজনের খোঁজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। এরই মধ্যে থানায় আসামি আনা-নেওয়ার কার্যক্রম, অভিযোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের আনাগোনায় ছিল ব্যস্ততম পরিবেশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য বলছে, গত ৭ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত তেজগাঁও জোনে মোট ২২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকেই ৭৯ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে মোহাম্মদপুর থানায় গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে থানা ও এর সামনে বাড়তে থাকে লোকজনের আনাগোনা। একে একে থানায় আসতে থাকেন সেবাপ্রত্যাশীরা।

দুপুর দেড়টা নাগাদ থানায় প্রবেশ করে আসামিদের আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত পুলিশ ভ্যান। এরপর থানা থেকে একের পর এক আসামিকে তোলা হয় পুলিশ ভ্যানে। এরপর বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে আসামি নিয়ে থানা থেকে বেরিয়ে যায় পুলিশ ভ্যানটি।

‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’পুলিশ ভ্যানে আসামিরা। তাদের পাঠানো হবে আদালতে/ছবি: জাগো নিউজ 

এর কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই আরও তিন আসামিকে নিয়ে থানায় হাজির হন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। পরে তাদের থানা হাজতে রাখা হয়। এছাড়াও থানায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। 

দুপুর ১টা ৪০ মিনিট। থানার গেটে কারও অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন শাবানা বেগম। কথা বললে জাগো নিউজকে জানান, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান থেকে ছেলেকে দেখতে থানায় এসেছেন তিনি।

শাবানা বেগম বলেন, ‘আমার পোলা (ছেলে) স্যানেটারির কাজ করে। কাল (বুধবার) কাজ শেষ করে আমার পোলা রিকশায় বাসায় যাচ্ছিল। তখন নাকি ওর সাথে আরেকজন ছিল। ক্যাম্পের (জেনেভা ক্যাম্প) ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আমার পোলার সঙ্গে একজন লোকের কাছে নাকি বাবা (ইয়াবা) ছিল। সে নাকি পুলিশ দেখে রিকশা থেকে নেমে দৌড় দিছে। তখন পুলিশ এসে দেখে রিকশার ওপর একটা বাবা (ইয়াবা) পড়ে আছে। ওই লোকের কাছে যে বাবা ছিল আমার পোলা জানতো না। পরে ওই লোক তো দৌড়ে পালায়ছে। আর আমার ছেলেকে পুলিশ ধরে আনছে।’

পুলিশের সঙ্গে কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে শাবানা বেগম বলেন, “পুলিশ বলছে, ‘অপরাধ যেহেতু করেছে তাই একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে। শাস্তি না দিলে মনে থাকবে না।’ কিন্তু ওর নামে আগে কোনো মামলা না থাকায় পুলিশ বলেছে, ছোট একটি মামলা দিয়েছে, কোর্টে গেলে ছেড়ে দিবে।”

শাবানা বেগমের ছেলেকে পরে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। 

‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’আসামি ধরে থানায় ঢোকাচ্ছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ/ছবি: জাগো নিউজ

দুপুর ১টা ৫০ মিনিট। থানা থেকে বের হয়ে আল্লাহ করিম জামে মসজিদের দিকে যাচ্ছেন মো. চাঁন ও মো. সাঈদ নামের দুজন। জাগো নিউজের কথা হয় তাদের সঙ্গে। 

মো. সাঈদ বলেন, ‘আমার বাসা জেনেভা ক্যাম্পে। বাসায় চুরি হয়েছে। অভিযোগ দিতে থানায় এসেছিলাম। কিন্তু থানা থেকে বলেছে অভিযোগ বাইরে থেকে লিখে নিয়ে আসতে হবে। তাই আল্লাহ করিমের ওখানে প্রিন্টের দোকানে যাচ্ছি অভিযোগ লেখাতে।’

‘আমি ছিলাম ঢাকার বাইরে সৈয়দপুরে। সেখান থেকে এই মাত্র এসেছি। স্বর্ণ আর নগদ টাকাসহ দেড়-দুই লাখ টাকার মতো চুরি হয়েছে।’

এই যে চুরির ঘটনা ঘটেছে, বাসাবাড়িতে বা বাইরে নিরাপত্তায় পুলিশের সহযোগিতা পাচ্ছেন কতটা? এমন প্রশ্নে মো. চাঁন বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আগের থেকে অনেকটা উন্নত হয়েছে। এলাকায় ছিনতাই-চুরি আগে যেরকম হচ্ছিল বিশেষ করে আমাদের রোডে (মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে), বর্তমানে অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। এখন অভিযোগ দিলে পুলিশ অন্তত রেসপন্স করে।’

‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’মোহাম্মদপুর থানায় পুলিশের ব্যস্ততা/ছবি: জাগো নিউজ

রাজধানীর উত্তরা থেকে মোহাম্মদপুর থানায় এসেছেন শাহজাহান। ঢাকা উদ্যান এলাকায় বৈদ্যুতিক কাজের সময় শর্ট সার্কিটে তার এক স্বজন নিহতের ঘটনায় সমঝোতার জন্য তাকে ডাকা হয়েছে। 

শাহজাহান বলেন, ঢাকা উদ্যান শপিং কমপ্লেক্সে বৈদ্যুতিক কাজের ঠিকাদার ছিলেন তার আত্মীয় দেলোয়ার। গতকাল (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় ওই মার্কেটে বৈদ্যুতিক কাজ করতে গিয়ে দেলোয়ার ও একজন গার্ড শর্ট সার্কিটে মারা যান। লাশ মর্গে আছে। এখন মালিকপক্ষের সঙ্গে একটা কথাবার্তা হয়েছে। এটা তো দুর্ঘটনা, কারও দোষ দেওয়া যায় না। তাই মালিকপক্ষ মানবতার খাতিরে হোক আর যে জন্যই হোক দেলোয়ারের পরিবারকে ৩ লাখ টাকা দেবে। সেই জন্য থানায় ডেকেছে।

এদিকে ডিএমপির তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় সাধারণত মাদক, ছিনতাই ও কিশোর গ্যাং সংক্রান্ত অপরাধীর উপস্থিতি বেশি।  ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানসহ আসামি গ্রেফতার করা হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেশ হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

ডিএমপির তথ্য মতে, গত ৭ থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত তেজগাঁও জোনে মোট ২২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকেই ৭৯ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুলাই তেজগাঁও জোনে ৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। আগের দিন গত ৯ জুলাই তেজগাঁও জোনে ৫৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৮ জুলাই তেজগাঁও জোনে ৫১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়। ৭ জুলাই তেজগাঁও জোনে মোট ৫৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থানা এলাকা থেকে ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

‘পুলিশ বলছে, অপরাধ যেহেতু করেছে একটা শিক্ষা দেওয়া লাগবে’ডিএমপির মোহাম্মদপুর থানা/ছবি: জাগো নিউজ

মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি। আসামি গ্রেফতার করছি। অপরাধীরা জেলে যায়, কিন্তু জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধ করে।’

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মূলত এই এলাকাকেন্দ্রিক ভাসমান মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। এখানে আশপাশ এলাকায় অনেক বস্তি আছে। অপরাধীরা অপরাধ করে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে গাঢাকা দিতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় চলে যায়।’

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থানায় লোকবল বা যানবাহন সংকট আছে কি না জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘এটা চলমান একটা প্রক্রিয়া। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছি এলাকাকে ভালো রাখার জন্য। মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা ঘটে। আমরা সেগুলো অ্যাড্রেস করি এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসি। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ দিয়ে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

কেআর/এমএমএআর/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow