পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র: প্রকৃতি ও মানুষের সমীপে
দীপন কুমার রায় ‘পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র’ বইটির নাম প্রথমে আমাকে থমকে দিয়েছে। পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র প্রকাশ হওয়ার পর আর কিছু কি থাকে? পাঠক মনে এমন প্রশ্নের সঞ্চার হতেই পারে। চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপত্র হওয়ার পরেও অনেক কিছু বাকি থেকে যায়। সেটা হলো রায় কার্যকর। কবি খুব সাবলীল ও মার্জিত ভাষায় বাস্তবতার নিরিখে সাজিয়ে-গুছিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করেছেন। আমরা কীভাবে প্রকৃতির যত্ন নেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকি। বইয়ের প্রথম কবিতা দন্ডপত্র: ০১ ‘কবরঘুড়ির গল্প’ থেকে পাই— ‘কোন গল্প আর শুনতে চাই না কান্নার শকুন পাঁজর খেয়েছে, মাংস খুঁড়ে খেয়ে গেছে আমাদের, এখানের জ্ঞানী সব বৃক্ষদের।’ কবি প্রকৃতির মৌলিকসহ বিভিন্ন উপাদানের অনেক বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন দন্ডপত্র: ০৪ ‘ছায়ার কবরের গল্প’ শিরোনামের কবিতায়—‘মানুষেরা ভুলে গেছে﹏ মানুষেরা সবাই বৃক্ষের ছায়া জলের ছায়া মাটির আর বাতাসের আর পৃথিবীর ছায়া এসব না থাকলে তারা থাকবে না।’ আমরা পৃথিবীকে কীভাবে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছি, পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি, তার প্রতিবাদ করতেও কবি লিখেছেন দণ্ডপত্র: ০৯ ‘জামচারা হত্যার গল্প’ নামক কবিতার
দীপন কুমার রায়
‘পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র’ বইটির নাম প্রথমে আমাকে থমকে দিয়েছে। পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র প্রকাশ হওয়ার পর আর কিছু কি থাকে? পাঠক মনে এমন প্রশ্নের সঞ্চার হতেই পারে। চূড়ান্ত মৃত্যুদণ্ডপত্র হওয়ার পরেও অনেক কিছু বাকি থেকে যায়। সেটা হলো রায় কার্যকর। কবি খুব সাবলীল ও মার্জিত ভাষায় বাস্তবতার নিরিখে সাজিয়ে-গুছিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করেছেন।
আমরা কীভাবে প্রকৃতির যত্ন নেওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকি। বইয়ের প্রথম কবিতা দন্ডপত্র: ০১ ‘কবরঘুড়ির গল্প’ থেকে পাই—
‘কোন গল্প আর শুনতে চাই না
কান্নার শকুন পাঁজর খেয়েছে, মাংস খুঁড়ে খেয়ে গেছে আমাদের, এখানের জ্ঞানী সব বৃক্ষদের।’
কবি প্রকৃতির মৌলিকসহ বিভিন্ন উপাদানের অনেক বিষয়বস্তু সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন দন্ডপত্র: ০৪ ‘ছায়ার কবরের গল্প’ শিরোনামের কবিতায়—
‘মানুষেরা ভুলে গেছে﹏ মানুষেরা সবাই বৃক্ষের ছায়া জলের ছায়া মাটির আর বাতাসের আর পৃথিবীর ছায়া এসব না থাকলে তারা থাকবে না।’
আমরা পৃথিবীকে কীভাবে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছি, পরিবেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি, তার প্রতিবাদ করতেও কবি লিখেছেন দণ্ডপত্র: ০৯ ‘জামচারা হত্যার গল্প’ নামক কবিতার কিছু লাইন—
‘...গাছের শুকনো পাতা প্রজাপতির ছেঁড়া ডানা...... মুমূর্ষু পাখির আকাশে ভেসে থাকার কাহিনী আর রাম ছাড়া কিভাবে মারা গেল তার উপাখ্যান।’
কবির কবিতায় অপার সৌন্দর্যের প্রকৃতিকন্যা মহানন্দা নদী, জেলেদের জাল, প্রজাপতি ও বৃক্ষপ্রেম ঠাঁই পেয়েছে। তার কবিতায় জীবনানন্দ দাশের প্রকৃতির বর্ণনার মতো বেদনাময় বর্ণালিচ্ছটা পাওয়া যায়। পৃথিবীর পুরোপুরি মৃত্যু হয়নি এখনো। সেটি তার আরও একটি দণ্ডপত্র: ২৪ ‘বাতাস বৃক্ষে নেই শ্বাসপাতা’। সেখানে লিখেছেন—
‘পৃথিবী একটু ভালো আছে কারণ জীবনানন্দ দাশ বেঁচে আছেন আর রবীন্দ্রনাথের সুর বাতাসের আরও একটি উপাদান হয়েছে। লালন হাসন। মুকুন্দরাম। পৃথিবীবৃক্ষে সবুজ পাতা।’
কখনো কখনো লেখনিতে মনোমুগ্ধকর দার্শনিক পরশ লেগেছে। দণ্ডপত্র: ২৮ ‘হত্যা নদীর গল্প’ কবিতার লাইনগুলো এ রকম—
‘আত্মারও একটা আত্মা আছে সে কথা ভাবিনি, নিজের আত্মার কথায় ভেবেছি বারবার। মরুক বা মরে যাক আত্মার আত্মা এমন বোধে।
আমরা যাকে বালিহাঁস বলি, বালিহাঁসেরা কাকে বলে বালিহাঁস........ সবকিছুরই একটা সবকিছু আছে। মৃত্যুর একটা মৃত্যু আছে একথা বিশ্বাস করি না বলে মৃত্যু হয় আমাদের।’
এ ছাড়াও কবি তার জন্মভূমির প্রতি প্রেম, নিজগ্রাম ও গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরেছেন সাদা কাগজের সাথে কলমের দুরন্ত সংঘর্ষে। শান্তির আস্তানা। ‘কপালমধুর গল্প’ নামক কবিতায় লিখেছেন—
‘একটা কলম যতক্ষণ পছন্দের কথা লিখতে পারে ততক্ষণ লিখে কলমের অপছন্দের কথা লিখতে গেলে হয় কালি শেষ হয় নয় নিব্ ভেঙে পড়ে থাকে একা একা।’
আবার আরও একটি চমকপ্রদ কবিতার লাইন হলো ‘পৃথিবী মাথায় নিয়ে হেঁটে যাবার গল্প’ কবিতায়। সেখানে এভাবে বর্ণনা করেছেন কবি—
‘মুক্ত হবার কথা ভাবতে গেলেই এই পৃথিবী দাঁড়িয়ে পড়ে পথের উপর নির্বিকার বাধার মতো..... পৃথিবীকে মাথায় নিয়ে বহু পথ হেঁটে চলে যাব...’
কবির ভাবনার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে আমরা একাই হয়তো পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করতে পারবো না। সবাই মিলে যদি নিজেদের অবস্থান থেকে পৃথিবীকে একটু একটু করে মাথায় নিই, হয়তোবা খুঁজে পাওয়া যাবে অনেক সুন্দর সমাধান।
বইয়ের নাম: পৃথিবীর মৃত্যুদণ্ডপত্র
কবির নাম: আনিফ রুবেদ
প্রচ্ছদ: দেওয়ান আতিকুর রহমান
প্রকাশক: অনন্যা
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১১
মূল্য: ১০০ টাকা।
এসইউ
What's Your Reaction?