প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি ‘জামুই’ প্রজাপতি

প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টির অন্যতম নাম প্রজাপতি। এদের উপস্থিতিতে প্রকৃতি ও পরিবেশ রঙিন হয়ে ওঠে। এদের কারুকার্যময় ডানার নানা রঙের অপূর্ব বিন্যাস, কোমল ডানার নৃত্য আর প্রকৃতিতে ফোটা ফুলের সঙ্গে এদের নিবিড় সম্পর্ক প্রকৃতিকে করে তোলে আরও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত।  ফুলে ফুলে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো রঙিন এই ক্ষুদ্র প্রাণী শুধু প্রকৃতির শোভাই বাড়ায় না, মানুষের মনেও ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি ও মুগ্ধতা। শিশু থেকে প্রবীণ, সব বয়সী মানুষের কাছেই প্রজাপতি এক অন্যরকম আকর্ষণের নাম। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও প্রজাপতির ভূমিকা অপরিসীম।  প্রকৃতির তেমনই এক অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি কয়েকটি জামুই প্রজাপতি গোমতী নদীর কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া অংশের বেড়িবাঁধের ধারের ল্যান্টানা ক্যামেরা গাছজুড়ে ওড়াউড়ি ও একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করতে দেখা যায়। এদের চোখজুড়ানো সৌন্দর্য আর চোখধাঁধানো ওড়াউড়ি ও ল্যান্টানা ফুল ঘিরে এদের নৃত্যের মোহনীয় দৃশ্য যেন স্বর্গীয় এক আবহের সৃষ্টি হয়েছিল। মনোমুগ্ধকর এ সুন্দর যেন প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। জানা গেছে, জামুই বা ধনুক প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম হাইপোলিম্নাস বোলিনা। এর ইংরেজি নাম

প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি ‘জামুই’ প্রজাপতি

প্রকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টির অন্যতম নাম প্রজাপতি। এদের উপস্থিতিতে প্রকৃতি ও পরিবেশ রঙিন হয়ে ওঠে। এদের কারুকার্যময় ডানার নানা রঙের অপূর্ব বিন্যাস, কোমল ডানার নৃত্য আর প্রকৃতিতে ফোটা ফুলের সঙ্গে এদের নিবিড় সম্পর্ক প্রকৃতিকে করে তোলে আরও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। 

ফুলে ফুলে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো রঙিন এই ক্ষুদ্র প্রাণী শুধু প্রকৃতির শোভাই বাড়ায় না, মানুষের মনেও ছড়িয়ে দেয় প্রশান্তি ও মুগ্ধতা। শিশু থেকে প্রবীণ, সব বয়সী মানুষের কাছেই প্রজাপতি এক অন্যরকম আকর্ষণের নাম। পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও প্রজাপতির ভূমিকা অপরিসীম। 

প্রকৃতির তেমনই এক অনিন্দ্যসুন্দর সৃষ্টি কয়েকটি জামুই প্রজাপতি গোমতী নদীর কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া অংশের বেড়িবাঁধের ধারের ল্যান্টানা ক্যামেরা গাছজুড়ে ওড়াউড়ি ও একে অপরের সঙ্গে খুনসুটি করতে দেখা যায়। এদের চোখজুড়ানো সৌন্দর্য আর চোখধাঁধানো ওড়াউড়ি ও ল্যান্টানা ফুল ঘিরে এদের নৃত্যের মোহনীয় দৃশ্য যেন স্বর্গীয় এক আবহের সৃষ্টি হয়েছিল। মনোমুগ্ধকর এ সুন্দর যেন প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।

জানা গেছে, জামুই বা ধনুক প্রজাতির বৈজ্ঞানিক নাম হাইপোলিম্নাস বোলিনা। এর ইংরেজি নাম গ্রেট এগফ্লাই। এরা নিম্ফ্যালিডি পরিবারের ও লেপিডোপ্টেরা বর্গের একটি মাঝারি থেকে বড় আকারের অত্যন্ত পরিচিত চমকপ্রদ প্রজাপতি। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতির ডানার বিস্তার সাধারণত ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে।

জামুই প্রজাপতির পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পুরুষ প্রজাপতির ওপরের ডানা কালো বা কালচে রঙের, যার মাঝখানে ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল সাদা ছোপ এবং চারপাশে নীলচে বেগুনি আভা দেখা যায়। অন্যদিকে স্ত্রী প্রজাপতি তুলনামূলক বড় আকারের হয়। তাদের ডানা গাঢ় বাদামি বা কালচে এবং সাদা, কমলা কিংবা হলদে দাগ ও রেখায় অলংকৃত থাকে। ডানার নিচের অংশ বাদামি রঙের, যেখানে সাদা ব্যান্ড ও দাগ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। 

জামুই প্রজাপতি বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই কমবেশি দেখা যায়। স্যাঁতসেঁতে ঝোপঝাড়, পাতাঝরা বন, বনের পাশে, সড়কের পাশে, বিভিন্ন ফুলের বাগান এদের প্রিয় আবাসস্থল। তবে খোলামেলা জায়গা, ছোট ছোট ঘাসবন বা চিরসবুজ বনে এদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

জামুই প্রজাপতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো পুরুষ প্রজাপতির এলাকা রক্ষার প্রবণতা। এরা নিজেদের নির্ধারিত এলাকায় অন্য কোনো প্রজাপতি প্রবেশ করলে এরা দ্রুত উড়ে গিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং পরে আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে। এ কারণে অনেক গবেষক এদের স্বভাবকে বেশ ‘দ্বন্দ্বপ্রিয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।

পূর্ণবয়স্ক জামুই প্রজাপতি লম্বা শুঁড়ের সাহায্যে ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে আহার করে থাকে। ল্যান্টানা, জবা, নয়নতারা, বাগানবিলাস, রক্তচিতাসহ বিভিন্ন ফুলের মধু এদের প্রধান খাদ্য। এছাড়া অতিরিক্ত পাকা বা পচা ফলের রসও খাবার হিসেবে পছন্দ। পুরুষ প্রজাপতিকে অনেক সময় ভেজা মাটি, কাদা কিংবা বালু থেকে প্রয়োজনীয় খনিজ ও লবণ সংগ্রহ করতেও দেখা যায়।

প্রজননের ক্ষেত্রেও জামুই প্রজাপতি ব্যতিক্রমী আচরণ প্রদর্শন করে। স্ত্রী প্রজাপতি পাতার নিচের অংশে সাধারণত একসঙ্গে তিন থেকে ছয়টি ডিম পাড়ে। কাচের মতো স্বচ্ছ সবুজ রঙের এসব ডিম দেখতে ছোট গম্বুজের মতো। ডিম ফুটতে প্রায় চার দিন সময় লাগে। প্রকৃতিতে খুব কম প্রজাতির প্রজাপতির মধ্যেই মাতৃত্বের এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়। স্ত্রী জামুই ডিম পাড়ার পর দীর্ঘ সময় সেই পাতার আশপাশে অবস্থান করে ডিম ও সদ্য জন্ম নেওয়া শূককীটকে পাহারা দেয়, যাতে পিঁপড়া বা অন্যান্য শিকারির আক্রমণ থেকে তারা নিরাপদ থাকে। 

শূককীটের দেহ কালো, মাথা কমলা এবং সারা শরীর কাঁটায় আবৃত থাকে। কয়েক দফা খোলস পরিবর্তনের পর তা মূককীটে পরিণত হয়। পরে সেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন প্রজাপতি। পূর্ণাঙ্গ জামুই প্রজাপতি সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

নূরে আলম নামে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের উপস্থিতি সুস্থ পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। তবে এদের যোগ্য আবাসস্থলের অভাবে প্রকৃতিতে এদের উপস্থিতি তুলনামূলক কমে যাচ্ছে। আমাদের সকলকেই জীববৈচিত্র রক্ষায় এগিয়ে আসা জরুরি।

ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আবদুল মতিন কালবেলাকে বলেন, জামুই বা ধনুক একটি দৃষ্টিনন্দন প্রজাপতি। এদের ডানার নকশা দেখতে বেশ সুন্দর, সহজেই নজর কাড়ে। আমাদের দেশের প্রকৃতিতে এ প্রজাপতির উপস্থিতি বেশ লক্ষণীয়।

কৃষি কর্মকর্তা বলেন, প্রজাপতি বিভিন্ন ফুলে পরাগায়েনে সহায়তা করে, যা কৃষি ও জীববৈচিত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাসযোগ্য প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করলে প্রজাপতিসহ উপকারী পতঙ্গের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। 

তিনি আরও বলেন, জামুই প্রজাপতির মতো রঙিন এসব প্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব চর্চা, ফুলের বাগান সৃষ্টি, বৃক্ষরোপণ এবং অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই। তাহলেই আগামী প্রজন্মও প্রকৃতির এসব রঙিন দূতের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে। 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow