প্রতিটি দিন মাসের মতো মনে হচ্ছে, ইরানি নাগরিকের ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা

বিস্ফোরণ, ধ্বংসযজ্ঞ, সব মিলিয়ে যা ঘটছে- এটা অবিশ্বাস্য। এভাবেই যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন ইরানি নাগরিক সালার। দেশটির রাজধানী তেহরানে গত (২৮ ফেব্রুয়ারি) শনিবার থেকে ব্যাপক হামলা চলছে। দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল। যদিও এই হামলার ফলে অন্যান্য এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় শিশুসহ ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাটি তদন্ত করার কথা জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ। গত বছর ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাতের কথা উল্লেখ করে বিবিসি ফার্সিকে তেহরানে বসবাসকারী এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আমরা যা অনুভব করেছি এবার তার চেয়েও অনেক বেশি। কিছু ইরানি এটাও বলছেন যে, চলমান হামলার কারণে নিজেদের পরিবারের জন্য তারা শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন। অনেকে আবার শাসকগোষ্ঠীকেও ভয়ঙ্কর হিসেবে চিহ্নিত করছেন এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশার কথা বলছেন। হামলার প্রথম ধাপেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কিন্তু তারপরও বিমান

প্রতিটি দিন মাসের মতো মনে হচ্ছে, ইরানি নাগরিকের ভাষায় যুদ্ধের ভয়াবহতা

বিস্ফোরণ, ধ্বংসযজ্ঞ, সব মিলিয়ে যা ঘটছে- এটা অবিশ্বাস্য। এভাবেই যুদ্ধ পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন ইরানি নাগরিক সালার। দেশটির রাজধানী তেহরানে গত (২৮ ফেব্রুয়ারি) শনিবার থেকে ব্যাপক হামলা চলছে। দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল।

যদিও এই হামলার ফলে অন্যান্য এলাকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার মিনাব শহরে একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় শিশুসহ ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এই ঘটনাটি তদন্ত করার কথা জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

গত বছর ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার সংঘাতের কথা উল্লেখ করে বিবিসি ফার্সিকে তেহরানে বসবাসকারী এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আমরা যা অনুভব করেছি এবার তার চেয়েও অনেক বেশি।

কিছু ইরানি এটাও বলছেন যে, চলমান হামলার কারণে নিজেদের পরিবারের জন্য তারা শঙ্কিত হয়ে উঠেছেন। অনেকে আবার শাসকগোষ্ঠীকেও ভয়ঙ্কর হিসেবে চিহ্নিত করছেন এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশার কথা বলছেন।

হামলার প্রথম ধাপেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কিন্তু তারপরও বিমান হামলা কমার কোনো লক্ষণ নেই।

ইরানের বাসিন্দা সালার (ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে) বলেন, আক্রমণের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, প্রতিটা দিন যেন এক মাসের মতো মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি এক বিমান হামলায় তার পুরো ঘর কেঁপে উঠেছিল এবং কাঁচ যেন ভেঙে না পড়ে সেজন্য জানালা খোলা রেখে কাজ করতে হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোকে প্রবেশের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই অস্বীকৃতি জানায় ইরান। ফলে দেশটির অভ্যন্তরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ বেশ সীমিত। এছাড়া ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

বেশিরভাগ মানুষ ঘরের ভেতরেই অবস্থান করছেন, কেবল অতি প্রয়োজনীয় সরবরাহের (খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ) জন্য বাইরে বের হচ্ছেন।

এছাড়া দেশটির সরকার রাস্তায় নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে বলেও মনে হচ্ছে। যা দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর প্রকাশিত ভিন্নমতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই দেখছেন ইরানিরা।

তেহরানের ২৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, সব জায়গায় চেকপয়েন্ট রয়েছে। তারা নিজেদের ছায়া দেখেও ভীত। তিনি বলেন, আমরা সেই মহান মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছি, শেষ মুহূর্তের জন্য, যখন আমরা সবাই বেরিয়ে যাব এবং আমরা বিজয়ী হবো।

ডিম এবং আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। এছাড়া পেট্রোল এবং রুটির জন্য লাইন দিতে হচ্ছে যা ‌‘অবিশ্বাস্য’।

রাজধানীর আরেক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, শহরের বেশিরভাগ দোকান এবং টাকা তোলার ক্যাশ মেশিন বন্ধ রয়েছে, যদিও সুপারমার্কেট এবং বেকারি খোলা রয়েছে।

তিনি বলেন, তেহরান ‘খালি খালি’ মনে হচ্ছে। আর ‘জরুরি কারণ’ ছাড়া কেউই বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। প্রথম দিন, মানুষ স্লোগান দিচ্ছিল এবং সবাইকে খুশি মনে হচ্ছিল। কিন্তু এখন চারপাশে পুলিশ বাহিনী রয়েছে।

দেশের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘হুমকির’ কথা উল্লেখ করেন ইরানি নাগরিক সালার। প্রতিদিন মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হয়, যেখানে সতর্ক করা হয় যে আমরা যদি বাইরে যাই, তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ করবে।

তিনি বলেন, একটি বার্তা এসেছে যে তোমাদের মধ্যে কেউ যদি বাইরে গিয়ে প্রতিবাদ করে, তাহলে আমরা তোমাদেরকে ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করবো।

কাভেহ নামে (ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে) আরও একজনের সঙ্গেও কথা বলেছে বিবিসি ফার্সি, যিনি তেহরানের প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত জাঞ্জান শহরের বাসিন্দা। ওই এলাকাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, প্রথম তিন দিনে আমাদের শহরে প্রচণ্ড বোমাবর্ষণ করা হয়েছিল। আমরা এমন একটি এলাকায় বাস করি যেখানে যুদ্ধবিমানগুলো ক্রমাগত মাথার ওপর দিয়ে যাতায়াত করে।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিমান হামলার স্থানগুলো থেকে আসা ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে আকাশ ক্রমাগত মেঘলা ছিল- এমন একটি ছবিকে তিনি ‘একযোগে সুন্দর এবং ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

সালার বলেন, তিনি তার বাবা-মাকে শহরের উত্তর দিকে পাঠিয়েছিলেন। যদিও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে কোন শহরগুলো নিরাপদ থাকতে পারে।

তেহরানের যে এলাকায় তার বাড়ি, সেখানেও অনেক সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে জানান সালার। তিনি বলেন, আমার মা খুব খারাপ অবস্থায় ছিলেন- তিনি খুব ভীত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেন, বর্তমান হামলাগুলো ১৯৮০-এর দশকে আট বছর ধরে চলা ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়কার অভিজ্ঞতার চেয়েও খারাপ।

তিনি আরও বলেন, দিন যত যাচ্ছে, ততই আরও বেশি লোক তেহরান ছেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু এটি সবার জন্য একটি বিকল্প হতে পারে না। আমার বন্ধুর দাদী অসুস্থ এবং তারা তাকে সরাতে পারছে না।

ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ইরানিদের তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কাভেহ বলেন, বেঁচে থাকার পাশাপাশি, তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে কিছু যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করা এবং নির্ভরযোগ্য খবর পাওয়া।

তিনি জানান, হামলার প্রথম দিন দুপুরের দিকে তার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং দুই দিন ধরে তিনি আর অনলাইনে ফিরতে পারেননি।

কাভেহ এবং সালার উভয়ই ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করছেন। যার মাধ্যমে সরকারিভাবে বন্ধ রাখা ইন্টারনেট সাইটগুলোতেও প্রবেশ করতে পারেন তারা, যদিও এটি মোটেই সহজ নয়।

অনলাইনে আসলে কাভেহ তার ইরানের বাইরে থাকা বন্ধুদের আপডেট পেতে বা বার্তা পাঠাতে পারছেন। ইরানের কঠোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুতে সামগ্রিকভাবে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কেউ কেউ উদযাপন করতে রাস্তায় নেমেছিলেন, আবার কেউ কেউ শোক প্রকাশের সরকারি আয়োজনে অংশ নিয়েছিলেন। খামেনি হত্যার খবর শুরুতে বিশ্বাস করা কাভেহের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, আমি সবসময় কল্পনা যেমনটা মনে করেছিলাম তেমন কিছু হয়নি।

সালার বলেন, আমার জীবনের প্রায় পুরোটা সময় এবং আমার মতো লাখ লাখ মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে এবং হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি আশা করেননি যে সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর খবরে রাস্তায় এত আনন্দ-উৎসব হবে। তবুও তাকে এক মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তিনি রাগান্বিত হয়েছেন।

তিনি বলেন, হামলার পর থেকেই শহরের পরিবেশ কঠোর নিরাপত্তায় ঢাকা ছিল। এখনো তাই আছে। তাদের কেউই জানে না যে যুদ্ধ তাদের পরিবার এবং দেশের জন্য কী অর্থ বহন করবে।

সালার বলেন, আমার সন্দেহ আছে যে আমাদের মধ্যে কেউই আর কখনো আগের মতো হতে পারব কি না। যারা বিদেশে আছেন, বিশেষ করে রাজতন্ত্রপন্থি, ইরানের সাবেক রাজপরিবারের সমর্থকদের কথা উল্লেখ করেন তিনি যারা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন, তারা ‌‌সত্যিই জানেন না যে, আমরা কী অনুভব করছি। কাভেহ বলেন, আমরা যত তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ হবে বলে ভেবেছিলাম তত তাড়াতাড়ি শেষ হবে না।

টিটিএন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow