প্রতিদিনের বইমেলা, আনন্দ, বেদনার খেলা

অমর একুশে গ্রন্থমেলা—শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই হৃদয়ের ভেতর এক অন্যরকম উষ্ণতা জন্ম নেয় । এ যেন কেবল একটি মেলা নয়, বাঙালির চেতনা, আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সমাবেশ । সেই প্রাণের মেলাকে ঘিরেই কিছু লিখব বলে শেষমেশ কলম হাতে নিলাম । জানি না অনুভূতির গভীরতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারব কিনা, তবু দায়বোধ থেকেই এই লেখা । আমরা জানি, অমর একুশে গ্রন্থমেলা লেখক–প্রকাশক–পাঠকের এক মহামিলনক্ষেত্র । বাংলার হাজার বছরের সাহিত্য–সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এই আয়োজন । কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এবারের বইমেলাকে সেভাবে প্রাণের মেলা বলা যাচ্ছে না । কোথাও যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। পাঠকের পদচারণা নেই, লেখকের উপস্থিতি নেই । প্রকাশকদের মুখে ক্লান্তির ছাপ, বিক্রয়কর্মীদের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া । সব মিলিয়ে প্রশ্ন জাগে—এ কি সেই চিরচেনা বইমেলা? এবার নিজের কথায় আসি — আমার অফিস কাঁটাবনে হওয়ায় প্রতিদিনের মতো এবারও কাজ শেষে হাঁটতে হাঁটতে মেলায় যাই । অভ্যাসবশত বিভিন্ন স্টলে ঘুরি । নিজের বই যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে—আহমদ পাবলিশিং—সেখানেও কিছুক্ষণ বসি । কিন্তু প্রতিদিনই একই দৃশ্য—ফাঁকা

প্রতিদিনের বইমেলা, আনন্দ, বেদনার খেলা
অমর একুশে গ্রন্থমেলা—শব্দ দুটি উচ্চারণ করলেই হৃদয়ের ভেতর এক অন্যরকম উষ্ণতা জন্ম নেয় । এ যেন কেবল একটি মেলা নয়, বাঙালির চেতনা, আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সমাবেশ । সেই প্রাণের মেলাকে ঘিরেই কিছু লিখব বলে শেষমেশ কলম হাতে নিলাম । জানি না অনুভূতির গভীরতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারব কিনা, তবু দায়বোধ থেকেই এই লেখা । আমরা জানি, অমর একুশে গ্রন্থমেলা লেখক–প্রকাশক–পাঠকের এক মহামিলনক্ষেত্র । বাংলার হাজার বছরের সাহিত্য–সংস্কৃতির ধারক ও বাহক এই আয়োজন । কিন্তু অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এবারের বইমেলাকে সেভাবে প্রাণের মেলা বলা যাচ্ছে না । কোথাও যেন এক অদৃশ্য শূন্যতা প্রকাশ পাচ্ছে। পাঠকের পদচারণা নেই, লেখকের উপস্থিতি নেই । প্রকাশকদের মুখে ক্লান্তির ছাপ, বিক্রয়কর্মীদের চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া । সব মিলিয়ে প্রশ্ন জাগে—এ কি সেই চিরচেনা বইমেলা? এবার নিজের কথায় আসি — আমার অফিস কাঁটাবনে হওয়ায় প্রতিদিনের মতো এবারও কাজ শেষে হাঁটতে হাঁটতে মেলায় যাই । অভ্যাসবশত বিভিন্ন স্টলে ঘুরি । নিজের বই যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরিয়েছে—আহমদ পাবলিশিং—সেখানেও কিছুক্ষণ বসি । কিন্তু প্রতিদিনই একই দৃশ্য—ফাঁকা স্টল, নিরুৎসাহ পরিবেশ। লেখক নেই, পাঠক নেই, বই হাতে উচ্ছ্বসিত তরুণ তরুণী নেই । এমন পরিস্থিতি হৃদয় ভারাক্রান্ত করে । একসময় ফেব্রুয়ারি এলেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে লেখকেরা ছুটে আসতেন বইমেলায় । লিটলম্যাগ চত্বরে জমত প্রাণবন্ত আড্ডা, নতুন বইয়ের উন্মোচনে থাকত উৎসবের আবহ । এবারে সেই চিত্র পুরোপুরি অনুপস্থিত । অনেক স্টলেই পত্রিকা নেই, নতুন প্রকাশনার ঝলক নেই । উদ্যোক্তাদের কথায় বসে থেকে—“কী লাভ? পাঠকই যদি না আসে!” কথাগুলো সারাক্ষণই আমার কানে বাজে ।   সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে শিশু চত্বরের অনুপস্থিতি । প্রতি বছর শিশুদের জন্য আলাদা স্থান, আলাদা আয়োজন থাকে, এমনকি নির্ধারিত ‘শিশুপ্রহর’ থাকত । এবারে সেই চেনা দৃশ্য চোখে পড়েনি । শিশুদের কোলাহলহীন বইমেলা যেন প্রাণহীন দেহ । তাহলে কি আমাদের শিশুরা সাহিত্য–সংস্কৃতির প্রথম পাঠ থেকে বঞ্চিত হবে? তারা কি আর পড়বে না রঙিন ছড়ার বই, ভূতের গল্প, ঘুমপাড়ানি গল্প? স্কুল–কলেজ পড়ুয়ারা কি থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন, গল্প–উপন্যাসে ডুব দেবে না? গবেষণামনস্ক পাঠকেরা কি আর খুঁজবে না ইতিহাস–ঐতিহ্যের দুর্লভ গ্রন্থ? প্রশ্নগুলো প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খায় । এই প্রশ্নগুলোই রেখে যেতে চাই সংশ্লিষ্ট সবার কাছে—বিশেষ করে আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি-র নিকট । এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে— মেলার সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পেছনের যুক্তি কী? কেন এমন নিস্তেজ আয়োজন? এর দায় কে নেবে? বাংলা একাডেমি নেবে? তবুও হতাশ হয়ে বসে থাকলে চলবে না । বইমেলা কেবল ব্যবসায়িক আয়োজন নয়—এ আমাদের সংস্কৃতির প্রাণরস । প্রকাশনা শিল্প আজ ঝুঁকিতে, তবু আমরা যদি পাঠক হিসেবে, লেখক হিসেবে, সংস্কৃতিপ্রেমী নাগরিক হিসেবে এগিয়ে আসি, তবে এই মেলায় আবারও প্রাণ ফিরে আসবে । আসুন, আমরা বইকে ভালোবাসি, বইমেলাকে বাঁচাই । প্রাণের মেলায় আবার প্রাণ সঞ্চার করি । নইলে ইতিহাসের কাছে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের দায় এড়ানো কঠিন হবে ।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow