প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে জাতীয় ঐক্যের সংসদীয় সংস্কৃতি

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বহু ভাষণ এসেছে, বহু বিতর্ক হয়েছে, বহু সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু কখনো কখনো ইতিহাসের গতিপথে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবলমাত্র একটি সাধারণ সংসদীয় বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যুগসূচনা, একটি ভিন্নতর আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ এবং জাতিকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের করে আনার এক ঐতিহাসিক আহ্বান। সংসদীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভাষণকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ তার বক্তব্য কেবলমাত্র সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সংসদকে কার্যকর করার; বিরোধী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার এবং দেশের মৌলিক সমস্যাগুলোকে সম্মিলিতভাবে সমাধানের এক ব্যতিক্রমধর্মী আহ্বান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সংসদ বহু সময়েই নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ মঞ্চ হওয়ার পরিবর্তে দলীয় সংঘাত, অতীতের হিসাব-নিকাশ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, রাজনৈতিক দোষারোপ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকার ও বিরো

প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে জাতীয় ঐক্যের সংসদীয় সংস্কৃতি

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে বহু ভাষণ এসেছে, বহু বিতর্ক হয়েছে, বহু সরকার ও বিরোধী দলের মুখোমুখি অবস্থান জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু কখনো কখনো ইতিহাসের গতিপথে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবলমাত্র একটি সাধারণ সংসদীয় বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির যুগসূচনা, একটি ভিন্নতর আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ এবং জাতিকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের করে আনার এক ঐতিহাসিক আহ্বান। সংসদীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভাষণকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কারণ তার বক্তব্য কেবলমাত্র সরকারপ্রধানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল না; এটি ছিল জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে সংসদকে কার্যকর করার; বিরোধী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার এবং দেশের মৌলিক সমস্যাগুলোকে সম্মিলিতভাবে সমাধানের এক ব্যতিক্রমধর্মী আহ্বান।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় সংসদ বহু সময়েই নীতিনির্ধারণের সর্বোচ্চ মঞ্চ হওয়ার পরিবর্তে দলীয় সংঘাত, অতীতের হিসাব-নিকাশ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, রাজনৈতিক দোষারোপ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল একে অপরকে আক্রমণ করেছে, অভিযোগের পাল্টা অভিযোগ তুলেছে, কখনো সংসদ অধিবেশন বর্জন করেছে, কখনো সংসদে থেকেও কার্যকর বিতর্কের পরিবর্তে সংঘাতমুখী অবস্থান নিয়েছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ ছিল এক ভিন্ন ধারার যুগসূচনা। তিনি প্রচলিত রীতির বিপরীতে গিয়ে প্রতিহিংসার ভাষা ব্যবহার করেননি; বিরোধী দলকে শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করেননি; অতীতের রাজনৈতিক বিরোধকে সামনে এনে জাতিকে আরও বিভক্ত করার চেষ্টা করেননি। বরং তিনি জাতীয় সংসদের প্রতিটি সদস্যকে জাতির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেছেন এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গণতন্ত্রে বিরোধী দল শুধুমাত্র সরকারের সমালোচক নয়; বিরোধী দল রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। একটি কার্যকর সংসদে সরকার নীতি প্রস্তাব করে, বিরোধী দল তা বিশ্লেষণ করে, প্রয়োজনীয় সংশোধন দাবি করে, জনগণের পক্ষে ভিন্নমত তুলে ধরে এবং সরকারকে দায়িত্বশীল রাখে। কিন্তু যখন সরকার বিরোধী দলকে রাষ্ট্রবিরোধী বা উন্নয়নবিরোধী হিসেবে চিত্রিত করে, তখন সংসদ তার প্রকৃত অর্থ হারায়। আবার বিরোধী দল যদি শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করে, তাহলে তারাও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়। তারেক রহমানের ভাষণে এই দুই ধারার বাইরে একটি মধ্যপন্থী, দায়িত্বশীল ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ ঘটেছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, জাতীয় সংসদ কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক মঞ্চ।

প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো– এতে প্রতিহিংসার কোনো ভাষা ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রতিপক্ষকে আঘাত করা, অতীতের ঘটনার দায় চাপানো, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়া এবং বিজয়ী পক্ষের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রবণতা নতুন নয়। অতীতের বহু অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তন অনেক সময় গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের সুযোগ না হয়ে প্রতিশোধের নতুন অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে সেই প্রবণতা অনুপস্থিত ছিল। তার ভাষণে ছিল না কোনো বিজয়োন্মাদনা; ছিল না বিরোধী পক্ষকে অপমান করার চেষ্টা; ছিল না অতীতের শত্রুতা পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ। বরং তিনি রাষ্ট্রের সামনে থাকা সমস্যাগুলোকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সেগুলো সমাধানে জাতীয় ঐকমত্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।
এখানেই তাঁর বক্তব্য গতানুগতিক সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে গিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দেয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার অহংকার গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। প্রকৃত গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি ব্যবহার করে সংখ্যালঘু মতকে চাপা দেয় না; বরং সেই শক্তিকে ব্যবহার করে বৃহত্তর ঐকমত্য গড়ে তোলে। তারেক রহমানের বক্তব্যে এই উপলব্ধি স্পষ্ট হয়েছে যে, নির্বাচনী বিজয় রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতা দেয়, কিন্তু জাতীয় ঐক্য রাষ্ট্র পরিচালনাকে স্থায়িত্ব দেয়। কেবলমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা যথেষ্ট নয়; ক্ষমতাকে গ্রহণযোগ্য, জবাবদিহিমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা আরও বেশি জরুরি।

বাংলাদেশ আজ এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন রাষ্ট্রের সামনে বহুধরনের চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজন, আইনশৃঙ্খলার ভারসাম্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক সম্পর্কের জটিলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের দাবি– এসবই এককভাবে কোনো দলের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। এগুলো জাতীয় সমস্যা, এবং জাতীয় সমস্যার সমাধানও হতে হবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ এই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। তিনি বুঝিয়েছেন যে, দেশের সমস্যাগুলো দলীয় নয়; জনগণের দুর্ভোগও দলীয় নয়; তাই সমাধানের পথও সংকীর্ণ দলীয় চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে তার জাতীয় ঐক্যের ডাক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় ঐক্য বলতে এখানে কোনো কৃত্রিম রাজনৈতিক সমঝোতা বোঝানো হয়নি। এটি কোনো ক্ষমতা ভাগাভাগির আহ্বানও নয়। বরং এটি একটি নৈতিক ও সাংবিধানিক আহ্বান– যেখানে সরকার, বিরোধী দল, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, প্রশাসন এবং সাধারণ জনগণ সবাই রাষ্ট্রের মৌলিক স্বার্থে একমত হতে পারে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে, বিতর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে; কিন্তু রাষ্ট্রের অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, জনগণের অধিকার এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্নে একটি মৌলিক ঐকমত্য থাকা প্রয়োজন। তারেক রহমানের ভাষণে সেই মৌলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সমস্যার অংশ নয়, বরং সমাধানের অংশ হিসেবে দেখেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় ক্ষমতাসীনরা মনে করেন, বিরোধী দল মানেই বাধা; বিরোধী দল মানেই ষড়যন্ত্র; বিরোধী দল মানেই অস্থিরতা। এই মনোভাব গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। কারণ বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সংসদ কার্যকর হতে পারে না। বিরোধী দলকে উপেক্ষা করে জাতীয় ঐক্য গড়া যায় না। বিরোধী দলের বক্তব্য, আপত্তি, সংশোধনী প্রস্তাব, জনদাবি এবং সমালোচনা সংসদীয় প্রক্রিয়ার অপরিহার্য অংশ। তারেক রহমান তাঁর ভাষণে বিরোধী দলকে সেই মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন, বিরোধী দল সরকারবিরোধী হতে পারে, কিন্তু তারা রাষ্ট্রবিরোধী নয়; তারা ক্ষমতার বাইরে থাকতে পারে, কিন্তু জনগণের প্রতিনিধিত্বের বাইরে নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি বিরোধী দলকে শুধু কথার মাধ্যমে মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানাননি; বরং সংসদীয় কাঠামোর ভেতরেও তাদের বাস্তব অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের আহ্বানটি পুনরায় ব্যক্ত করেছেন। এটি ছিল নিছক একটি প্রথাগত প্রস্তাব নয়; বরং জাতীয় সংসদকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং কার্যকর করার একটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। ডেপুটি স্পিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় পদে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চিন্তা প্রমাণ করে যে, তিনি বিরোধী দলকে কেবল সমালোচক হিসেবে নয়, বরং সংসদ পরিচালনার একটি প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে দেখতে চান।

এই আহ্বান বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ বিরোধী দলকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়া শুধু রাজনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংসদে যদি বিরোধী দলের ভূমিকা কেবল বক্তব্য প্রদান বা সরকারের সমালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্র পূর্ণতা পায় না। কিন্তু যদি বিরোধী দল সংসদের নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্যেও অংশীদারিত্ব পায়, তাহলে সংসদ আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের পুনরায় আহ্বান তাই তারেক রহমানের বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের দর্শনেরই বাস্তব প্রতিফলন– যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই প্রস্তাব একই সঙ্গে সংসদীয় সংস্কৃতিতে আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দল অনেক সময় সংসদীয় প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতা, অবিশ্বাস বা প্রান্তিকতার অনুভূতি বহন করেছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের মতো উদ্যোগ সংসদের ভেতরে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং কার্যকর অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এতে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক সংঘাতনির্ভর না হয়ে দায়িত্বনির্ভর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আহ্বান তাই কেবল একটি পদবিন্যাসের প্রস্তাব নয়; এটি একটি নতুন সংসদীয় সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি, যেখানে বিরোধী দলকে রাষ্ট্র পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং জাতীয় সমস্যার সমাধানে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে প্রয়োজনীয় বলে বিবেচনা করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের সংসদীয় সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে পারে। কারণ একটি কার্যকর সংসদের জন্য প্রয়োজন শুধু সরকারি দলের উপস্থিতি নয়; প্রয়োজন প্রাণবন্ত বিরোধী দল, নীতিনির্ভর বিতর্ক, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, কমিটি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং আইন প্রণয়নে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া। যদি সংসদ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। কিন্তু যদি সংসদ হয়ে ওঠে জাতীয় সমস্যার যৌথ সমাধানের কেন্দ্র, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদকে সেই দ্বিতীয় পথে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তার ভাষণের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি সংঘাতের বদলে সংলাপের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। রাজনীতিতে মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু মতপার্থক্যকে শত্রুতায় রূপ দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধ মানেই বৈরিতা নয়; সমালোচনা মানেই ষড়যন্ত্র নয়; প্রশ্ন তোলা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়। সংসদীয় সংস্কৃতির মূল সৌন্দর্যই হলো—ভিন্নমতের মধ্য দিয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কিন্তু যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে, তখন সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়। তারেক রহমানের ভাষণ এই সংকীর্ণতা ভাঙার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন বারবার এসেছে, কিন্তু তা প্রায়ই দলীয় স্বার্থের কাছে পরাজিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে রাষ্ট্রগঠনের নানা পর্যায়ে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও রাজনৈতিক বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আদর্শিক সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস সেই ঐক্যকে দুর্বল করেছে। ফলে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হতে পারেনি। সংসদ, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক দল—সব ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল সংস্কার প্রয়োজন ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে যে ঐক্যের আহ্বান এসেছে, তা যদি বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ পায়, তাহলে এটি শুধু সংসদের কার্যকারিতা বাড়াবে না; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের পথও সুগম করতে পারে।

তবে এই আহ্বানের বাস্তব মূল্য নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর। রাজনৈতিক ভাষণ যতই সুন্দর হোক, তা তখনই ইতিহাসে স্থান পায় যখন তার প্রতিফলন নীতিতে, আচরণে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় দেখা যায়। তাই জাতীয় ঐক্যের ডাককে কার্যকর করতে হলে সরকারকে বিরোধী দলের বক্তব্য শোনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের আগে বিরোধী দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। বিরোধী দলের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে তাদের বক্তব্যের সময়, প্রশ্ন করার সুযোগ, সংশোধনী প্রস্তাব উপস্থাপনের অধিকার এবং জনগণের সমস্যা তুলে ধরার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রস্তাবকে বাস্তবে রূপ দিলে সংসদীয় ভারসাম্য আরও দৃশ্যমান হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐক্যের আহ্বান কেবল ভাষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা বাস্তব গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে রূপ নেবে।

এই প্রবন্ধের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো, তার ভাষণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নৈতিক বাঁকবদলের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, শক্তিশালী নেতৃত্ব মানে শুধু কঠোর ভাষা নয়; শক্তিশালী নেতৃত্ব মানে সংযম, সহনশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক মনোভাব এবং জাতির বৃহত্তর স্বার্থে নিজের রাজনৈতিক সুবিধাকেও সীমিত রাখার ক্ষমতা। তিনি যদি চাইতেন, সংসদীয় ভাষণকে অতীতের শাসনব্যবস্থার সমালোচনায় ভরিয়ে তুলতে পারতেন। তিনি চাইলে বিরোধী দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার ভাষা ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই সংযমই তাঁর বক্তব্যকে ব্যতিক্রমধর্মী করেছে।
এখানে নেতৃত্বের একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। একজন রাষ্ট্রনায়কের ভাষা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়; তা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আবহ তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রী যখন প্রতিহিংসার ভাষা ব্যবহার করেন, তখন প্রশাসন, দলীয় কর্মী, রাজনৈতিক মঞ্চ এবং জনপরিসরেও প্রতিহিংসার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আবার প্রধানমন্ত্রী যখন ঐক্যের ভাষা ব্যবহার করেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজও সংলাপ এবং সহযোগিতার দিকে উৎসাহিত হয়। তাই তারেক রহমানের ভাষণকে শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

তিনি যে কথা বলেছেন—সংসদকে কার্যকর করতে হবে—এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বক্তব্য নয়; এটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মূল শর্ত। সংসদ কার্যকর না হলে গণতন্ত্র কাগজে থাকে, বাস্তবে নয়। সংসদ কার্যকর না হলে আইন প্রণয়ন হয়, কিন্তু জনগণের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। সংসদ কার্যকর না হলে সরকার ক্ষমতাশালী হয়, কিন্তু জবাবদিহি দুর্বল হয়। সংসদ কার্যকর না হলে বিরোধী দল প্রান্তিক হয়, আর জনগণের ভিন্নমতও প্রান্তিক হয়ে পড়ে। তাই সংসদকে কার্যকর করার আহ্বান মানে গণতন্ত্রকে কার্যকর করার আহ্বান।

বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি সংসদ প্রত্যাশা করেছে যেখানে তাদের জীবনযাত্রার বাস্তব সমস্যা আলোচিত হবে; যেখানে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, নিরাপত্তা, দুর্নীতি, সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিয়ে তথ্যভিত্তিক বিতর্ক হবে; যেখানে আইন প্রণয়ন হবে জনগণের স্বার্থে; যেখানে ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল পরস্পরকে ধ্বংস করার বদলে রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ সেই প্রত্যাশাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তিনি সংসদকে সংঘাতের অঙ্গন নয়, রাষ্ট্রগঠনের কর্মশালা হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই আহ্বান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন শুধু দলীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; তা সমাজের ভেতরেও প্রভাব ফেলেছে। পরিবার, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাঙ্গন, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, এমনকি সামাজিক সম্পর্কেও রাজনৈতিক বিভাজনের ছাপ পড়েছে। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী যদি বিভাজনের ভাষা ব্যবহার করতেন, তাহলে তা জাতিকে আরও দূরে ঠেলে দিত। কিন্তু তিনি ঐক্যের ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জাতীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব হলো ক্ষতকে গভীর করা নয়; বরং ক্ষত সারানোর পথ তৈরি করা।

তবে ঐক্য মানে অতীত ভুলে যাওয়া নয়; ঐক্য মানে ন্যায়বিচারকে উপেক্ষা করা নয়; ঐক্য মানে সমালোচনা বন্ধ করা নয়। বরং প্রকৃত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় সত্য, ন্যায়, জবাবদিহি ও সংলাপের ভিত্তিতে। যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তার ন্যায়সঙ্গত বিচার হতে হবে। যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে থাকে, তা সংস্কার করতে হবে। যদি জনগণ বঞ্চিত হয়ে থাকে, তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এসব কাজ প্রতিহিংসার ভাষায় নয়; আইনের শাসন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে করতে হবে। তারেক রহমানের ভাষণে সেই দায়িত্বশীলতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

বিরোধী দলের সমস্যাগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতি তার ভাষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কেবল রাজনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার প্রকাশ। বিরোধী দলের যদি সংসদে কথা বলার সুযোগ না থাকে, যদি তাদের প্রস্তাব গুরুত্ব না পায়, যদি তাদের নির্বাচনী এলাকার সমস্যা উপেক্ষিত হয়, যদি সংসদীয় প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণকে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে। প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধী দলের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন, তখন তিনি আসলে সংসদের সামগ্রিক মর্যাদাকেই শক্তিশালী করেন।

এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক নজির হতে পারে। কারণ গণতন্ত্রে সরকার স্থায়ী নয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান স্থায়ী। আজ যারা সরকারে, কাল তারা বিরোধী দলে থাকতে পারে; আজ যারা বিরোধী দলে, কাল তারা সরকারে আসতে পারে। তাই সংসদীয় অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক ভারসাম্য কোনো দলের জন্য নয়; এগুলো পুরো রাষ্ট্রের জন্য। তারেক রহমান যদি এই নীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘাত থেকে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক স্থিতিশীলতার দিকে এগোতে পারে।

তার ভাষণে যে জাতীয় ঐক্যের ধারণা উঠে এসেছে, তা শুধু সংসদের ভেতরের বিষয় নয়; এর প্রভাব সংসদের বাইরে সমাজেও পড়তে পারে। যদি সরকার ও বিরোধী দল সংসদে গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরি করে, তাহলে রাজনৈতিক সহিংসতা কমতে পারে, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বাড়তে পারে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়তে পারে, তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিকে নতুনভাবে দেখতে পারে এবং নাগরিকরা রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ফিরে পেতে পারে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত। জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া বড় অর্থনৈতিক সংস্কার, শিক্ষা সংস্কার, বিচার বিভাগীয় সংস্কার বা প্রশাসনিক সংস্কার স্থায়ী হয় না। তাই তারেক রহমানের ঐক্যের ডাক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিশেষভাবে এমন একটি রাজনীতি চায় যা প্রতিহিংসা নয়, সম্ভাবনার কথা বলে; বিভাজন নয়, অংশগ্রহণের কথা বলে; ক্ষমতার দম্ভ নয়, জবাবদিহির কথা বলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্লান্তি, সংঘাত, অবিশ্বাস ও হতাশার পর তরুণরা এমন নেতৃত্ব দেখতে চায় যারা অতীতের বন্দিত্ব থেকে বের হয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র নির্মাণে মনোযোগ দেবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ সেই তরুণ প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে পারে, যদি তা বাস্তব সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে প্রতিফলিত হয়।

এই ভাষণ তাই একদিকে রাজনৈতিক, অন্যদিকে নৈতিক। রাজনৈতিক, কারণ এটি সংসদের কার্যকারিতা, সরকার-বিরোধী সম্পর্ক এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নে একটি নতুন অবস্থান তুলে ধরে। নৈতিক, কারণ এটি ক্ষমতার ব্যবহারকে প্রতিহিংসার বদলে দায়িত্বের জায়গায় স্থাপন করে। ক্ষমতা মানুষের চরিত্রের পরীক্ষা নেয়। কেউ ক্ষমতা পেয়ে প্রতিশোধ নেয়, কেউ ক্ষমতা পেয়ে আত্মম্ভরী হয়, কেউ ক্ষমতা পেয়ে বিরোধী কণ্ঠ দমন করতে চায়। কিন্তু প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ভাঙা সমাজকে জোড়া লাগাতে, বিভক্ত জাতিকে একত্র করতে এবং ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীল ভিত্তি গড়তে।

তারেক রহমানের ভাষণের ব্যতিক্রমধর্মিতা এখানেই যে, তিনি বিজয়ী দলের নেতা হিসেবে কথা বলেননি শুধু; তিনি সংসদীয় নেতা হিসেবে, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এবং জাতীয় ঐক্যের আহ্বায়ক হিসেবে কথা বলেছেন। এই তিনটি ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। দলীয় নেতা হলে দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে; সরকারপ্রধান হলে প্রশাসনিক অগ্রাধিকার বড় হয়ে ওঠে; সংসদীয় নেতা হলে সাংবিধানিক ভারসাম্য বড় হয়ে ওঠে। তার ভাষণে এই ভারসাম্যের চেষ্টা দেখা যায়। তিনি দলীয় বিজয়ের ভাষা নয়, জাতীয় দায়িত্বের ভাষা ব্যবহার করেছেন।

অতীতের সংসদীয় সংস্কৃতিতে সরকার ও বিরোধী দলের তর্ক অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ, অতীতের দোষারোপ এবং দলীয় স্লোগানে সীমাবদ্ধ থেকেছে। এতে জনস্বার্থের মূল বিষয়গুলো আড়ালে পড়ে গেছে। জনগণ সংসদের দিকে তাকিয়ে প্রত্যাশা করেছে সমাধান, কিন্তু দেখেছে সংঘাত। প্রত্যাশা করেছে নীতিনির্ভর বিতর্ক, কিন্তু পেয়েছে দলীয় কোলাহল। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বক্তব্য সংসদকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দেয়। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন—সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না; কারণ সংসদ ব্যর্থ হলে গণতন্ত্র ব্যর্থ হয়, আর গণতন্ত্র ব্যর্থ হলে জনগণের আশা ব্যর্থ হয়।

এই আহ্বানের মধ্যে একটি গভীর রাষ্ট্রদর্শন আছে। রাষ্ট্র কোনো একক দলের নয়; রাষ্ট্র জনগণের। সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসে, কিন্তু রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছেই থাকে। বিরোধী দলও সেই জনগণের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই বিরোধী দলকে অবজ্ঞা করা মানে জনগণের একটি অংশকে অবজ্ঞা করা। তারেক রহমানের ভাষণে এই মৌলিক গণতান্ত্রিক সত্যের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। তিনি বিরোধী দলকে দূরে ঠেলে না দিয়ে সংসদীয় প্রক্রিয়ার অংশীদার করতে চেয়েছেন।

এটি যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। সরকার ও বিরোধী দল যদি জাতীয় স্বার্থে কিছু মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে—যেমন নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের সংস্কার, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক নীতির ধারাবাহিকতা—তাহলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে এগোতে পারবে। জাতীয় ঐক্য মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়; বরং মৌলিক প্রশ্নে রাষ্ট্রের স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ তাই এক ধরনের রাজনৈতিক সাহসও প্রদর্শন করে। কারণ প্রতিহিংসার ভাষা অনেক সময় সহজ, জনপ্রিয় এবং তাৎক্ষণিক আবেগ তৈরি করে। কিন্তু ঐক্যের ভাষা কঠিন। কারণ ঐক্যের ভাষা সংযম চায়, ধৈর্য চায়, উদারতা চায় এবং প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়ার মানসিকতা চায়। যে নেতা প্রতিপক্ষকে অপমান করে করতালি পেতে চান, তিনি হয়তো মুহূর্তের জনপ্রিয়তা পান; কিন্তু যে নেতা প্রতিপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্র গড়ার কথা বলেন, তিনি ইতিহাসের দীর্ঘতর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি করেন।

এই প্রবন্ধের আলোচ্য ভাষণ সেই দীর্ঘতর ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এখন শুধু সরকার পরিবর্তনের পর্যায়ে নেই; বাংলাদেশ রাষ্ট্র পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় ঐক্যের নতুন ভিত্তি নির্মাণের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব আবার পুরোনো প্রতিহিংসার পথে হাঁটে, তাহলে জাতি নতুন করে হতাশ হবে। কিন্তু যদি নেতৃত্ব সংলাপ, জবাবদিহি, অন্তর্ভুক্তি এবং ঐকমত্যের পথে হাঁটে, তাহলে বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোতে পারে।

তারেক রহমানের ভাষণকে তাই একটি সূচনা হিসেবে দেখা উচিত, সমাপ্তি হিসেবে নয়। এটি একটি প্রতিশ্রুতি, যার বাস্তব পরীক্ষা সামনে। সংসদ কতটা কার্যকর হবে, বিরোধী দল কতটা মর্যাদা পাবে, আইন প্রণয়ন কতটা অংশগ্রহণমূলক হবে, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকবে, জাতীয় সমস্যার সমাধানে কতটা ঐকমত্য গড়ে উঠবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে এই ভাষণের ঐতিহাসিক মূল্য। তবে সূচনাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন সবসময় ভাষা থেকেই শুরু হয়। রাষ্ট্রনায়কের ভাষা যদি বদলায়, তাহলে রাষ্ট্রচিন্তার দিকও বদলাতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতীয় ঐক্যের আহ্বান বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা হিসেবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তিনি প্রচলিত সংঘাতমুখী সংসদীয় ভাষার বাইরে গিয়ে ঐক্য, সংলাপ, বিরোধী দলের মর্যাদা এবং কার্যকর সংসদের কথা বলেছেন। তার ভাষণে প্রতিহিংসা ছিল না; ছিল দায়িত্ববোধ। দোষারোপ ছিল না; ছিল সমাধানের আহ্বান। বিভাজন ছিল না; ছিল জাতিকে একত্র করার চেষ্টা। বিরোধী দলকে দুর্বল করার মনোভাব ছিল না; ছিল তাদের সংসদীয় ভূমিকার স্বীকৃতি। ক্ষমতার অহংকার ছিল না; ছিল রাষ্ট্রগঠনের অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের রাজনীতি যদি সত্যিই নতুন পথে এগোতে চায়, তাহলে এই ভাষণের মর্মার্থকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সংসদকে কার্যকর করতে হবে। বিরোধী দলকে সম্মান দিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগের আহ্বানকে সংসদীয় অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জাতীয় সমস্যায় জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। অতীতের ক্ষতকে প্রতিহিংসায় নয়, ন্যায়বিচার ও সংলাপে মোকাবিলা করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শত্রুতায় নয়, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় রূপ দিতে হবে। তাহলেই এই ভাষণ কেবল একটি সংসদীয় বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

জাতীয় ঐক্যের রাজনীতি দুর্বলতার রাজনীতি নয়; এটি পরিপক্বতার রাজনীতি। বিরোধী দলকে সম্মান করা আপস নয়; এটি গণতন্ত্রের শক্তি। সংসদকে কার্যকর করা আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের বাস্তবায়ন। আর রাষ্ট্রকে দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে দেখা কোনো কৌশল নয়; এটি প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণ সেই নেতৃত্বের সম্ভাবনাকেই সামনে এনেছে—একটি বাংলাদেশ, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও রাষ্ট্রের প্রশ্নে সহযাত্রী; যেখানে সংসদ কোলাহলের নয়, সমাধানের মঞ্চ; যেখানে বিরোধী দল শুধু সমালোচক নয়, সংসদীয় নেতৃত্ব কাঠামোর অংশীদার; যেখানে রাজনীতি প্রতিহিংসার নয়, জনগণের কল্যাণের পথ; এবং যেখানে জাতীয় ঐক্য কেবল স্লোগান নয়, রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি।


লেখক : ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. একেএম শামছুল ইসলাম
পিএসসি, জি (অব.), প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow