বাংলাদেশে ঈদ মানেই ঘরমুখো মানুষের আনন্দযাত্রা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতি ঈদেই সেই আনন্দযাত্রা রূপ নেয় মৃত্যু মিছিলে। মহাসড়কে লাশ, আহত মানুষের আর্তনাদ, স্বজনহারা পরিবারের কান্না-এসব যেন এখন ঈদের অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা। প্রতি বছর একই ধরনের রোডক্র্যাশ ঘটলেও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন ও তার বাস্তব প্রয়োগের অভাবে পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না।
ফলে প্রশ্ন উঠছে- আর কত প্রাণ ঝরলে আমরা সত্যিকারের সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব?
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ঈদুল ফিতরের ছুটির আট দিনে সারা দেশে ১১০টি রোডক্র্যাশ ঘটেছে। এসব রোডক্র্যাশে আহত হয়েছেন ২০৮ জন। গত বছরের জুনে ঈদুল আজহার সময় ১৩ দিনে সারা দেশে সড়কে নিহত হন ২৩০ জন ও আহত হন ৩০১ জন। ওই সময় রোডক্র্যাশ ঘটে ২৩৫টি। অন্যদিকে গত বছরের এপ্রিল মাসে ঈদুল ফিতরের সময় ১৭ দিনে সারা দেশে ২৮৬টি রোডক্র্যাশে ৩২০ জন নিহত হন ও আহত হন ৪৬২ জন। বিআরটিএ বলছে, রোডক্র্যাশে ২০২৫ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি ভবিষ্যৎ। অথচ প্রতি বছর একই ধরনের রোডক্র্যাশ ঘটলেও আমরা যেন কিছুদিন শোক প্রকাশ করে আবার সব ভুলে যাই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে রোডক্র্যাশে ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। সংস্থাটি বলছে, রোডক্র্যাশ ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ডাব্লিউএইচও আরও জোর দিয়ে বলেছে- কার্যকর আইন প্রয়োগ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে অধিকাংশ রোডক্র্যাশ প্রতিরোধ সম্ভব।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঈদকেন্দ্রিক রোডক্র্যাশের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। প্রথমত, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। ঈদের আগে কয়েক দিনের মধ্যে কোটি মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে চালকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং তারা দীর্ঘসময় বিশ্রাম ছাড়া গাড়ি চালান।
দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালক। অনেক গাড়ি নিয়মিত পরীক্ষা ছাড়াই সড়কে চলাচল করে। তৃতীয়ত, বেপরোয়া গতি ও প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে বাস ও মোটরসাইকেল ক্র্যাশের ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল ক্র্যাশে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এ ছাড়া মহাসড়কে অবৈধ থ্রি-হুইলার, উল্টো পথে যান চলাচল, রাস্তার পাশে অবৈধ পার্কিং এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও রোডক্র্যাশের অন্যতম কারণ। ঈদের সময় অনেক চালক অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালান। যাত্রীদেরও অসচেতনতা কম নয়।
বাসের ছাদে ভ্রমণ, যানবাহনের অতিরিক্ত গতি, চলন্ত গাড়িতে মোবাইল ব্যবহার, মাদক সেবন করে গাড়ি চালানো এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো-এসব আচরণ মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু বর্তমানে দেশে এমন কোনো আইন নেই, যা সামগ্রিকভাবে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
রোডক্র্যাশে নিহতদের অধিকাংশই পথচারী, সাইকেল ও মোটরসাইকেল আরোহী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, পৃথিবীতে রোডক্র্যাশ বেশী ঘটে ১৮৩টি দেশে। এর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। তাই সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও আইনের সঠিক প্রয়োগ প্রয়োজন। অন্যথায় দেশে রোডক্র্যাশ ও রোডক্র্যাশে হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনা অসম্ভব।
রোডক্র্যাশের একটি অন্যতম কারণ হলো যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত গতি। সড়ক ও পরিবহনের ধরন অনুযায়ী গতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী উভয়েরই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ সংক্রান্ত এনফোর্সমেন্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এবং এর বিধিমালা মূলত সড়ক পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এসব আইন যথেষ্ট না। সড়ক অবকাঠামো ও যানবাহনের নিরাপত্তা, সড়ক ব্যবহারকরীর নিরাপত্তা, রোডক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সড়ক পরিবহন আইনে যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। তাই সড়কে সব ধরনের সুরক্ষা সম্পর্কিত সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে প্রয়োজন পৃথক ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়ন করা।
বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ এখনও দুর্বল। আইন লঙ্ঘনের পরও অনেক ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না। ফলে চালকদের মধ্যে আইনের ভয় তৈরি হয় না। উন্নত দেশগুলোতে কঠোর আইন, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের কারণে রোডক্র্যাশ তুলনামূলক কম। আমাদের দেশেও যদি স্পিড ক্যামেরা, সড়কে ডোপ টেস্টের ব্যবস্থা, ডিজিটাল মনিটরিং, চালকদের বাধ্যতামূলক বিশ্রাম, ফিটনেস পরীক্ষার কঠোরতা এবং লাইসেন্স ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে রোডক্র্যাশ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
গত বছরের জানুয়ারিতে ‘রোড সেফটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর লক্ষ্য জাতিসংঘ অনুমোদিত সেফ সিস্টেমের পাঁচটি স্থম্ভ-নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং রোডক্র্যাশের পর কার্যকর সাড়া গ্রহণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা। প্রস্তাবিত আইনটি এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে। বিদ্যমান ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন (আরটিএ) কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমাধান করতে ব্যর্থ হওয়ায় অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী পৃথক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুধু সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর দায় চাপিয়ে দিলেই হবে না; জনসচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক যাত্রীকে নিরাপদ ভ্রমণের বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মোটরসাইকেলে অবশ্যই মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত গতি বা ঝুঁকিপূর্ণ চালনা দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে। পরিবারকেও সচেতন হতে হবে যেন অপ্রাপ্তবয়স্ক কেউ যানবাহন চালাতে না পারে।
ঈদ আনন্দের উৎসব, শোকের নয়। কিন্তু নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত না হলে প্রতি ঈদেই নতুন করে অসংখ্য পরিবারকে কান্না বয়ে বেড়াতে হবে। তাই এখনই সময় কঠোর ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়নের। আইন প্রয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, দক্ষ চালক তৈরি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এই ৪টি বিষয়কে সমন্বিতভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর ঈদ এলেই আমরা আবার শুনব ‘প্রত্যেক ঈদে ঝরছে প্রাণ।’
লেখক : অ্যাডভোকেসি অফিসার (কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন।