প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমছে শিক্ষার্থী, বাড়ছে মাদরাসা-কিন্ডারগার্টেনে
মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনমুখী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা দরিদ্রতার কারণেও শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান শুধু ময়মনসিংহে নয়, অন্যান্য বিভাগেও একই চিত্র মে মাস পর্যন্ত নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু রায়হান। জুনের শুরুতেই হঠাৎ তার বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষকরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, অভাবের সংসারে পড়াশোনা ছেড়ে ঢাকায় একটি দর্জির দোকানে কাজ শিখতে পাঠানো হয়েছে তাকে। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হানের বাড়ি ভুগলী গ্রামে। তার বাবা আজহারুল ইসলাম দিনমজুর। মা রেখা আক্তার গৃহিণী। ৫ আগস্ট বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। আরও পড়ুন টিফিনের রুটিতে ব্লেড: তদন্তে যা পাওয়া গেল রেখা আক্তার বলেন, ‘ছেলেরে ঢাকায় দরজির কাজ শিখনের লাইগা দিছি। দুই বছর পেডে-ভাতে কাজ শিখব। ছেলেও পড়তে চায় না, সংসারেও অভাব।’ শুধু রায়হান নয়, পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই মাস বা তার বেশি সময় ধরে ক্লাসে অনুপস্থিত অন্তত ১০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারও রয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত স্কুলে
- মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনমুখী হচ্ছে শিক্ষার্থীরা
- দরিদ্রতার কারণেও শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ছে
- শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান
- শুধু ময়মনসিংহে নয়, অন্যান্য বিভাগেও একই চিত্র
মে মাস পর্যন্ত নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসত চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আবু রায়হান। জুনের শুরুতেই হঠাৎ তার বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ হয়ে যায়। শিক্ষকরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, অভাবের সংসারে পড়াশোনা ছেড়ে ঢাকায় একটি দর্জির দোকানে কাজ শিখতে পাঠানো হয়েছে তাকে।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হানের বাড়ি ভুগলী গ্রামে। তার বাবা আজহারুল ইসলাম দিনমজুর। মা রেখা আক্তার গৃহিণী। ৫ আগস্ট বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে কথা হয়।
রেখা আক্তার বলেন, ‘ছেলেরে ঢাকায় দরজির কাজ শিখনের লাইগা দিছি। দুই বছর পেডে-ভাতে কাজ শিখব। ছেলেও পড়তে চায় না, সংসারেও অভাব।’
শুধু রায়হান নয়, পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুই মাস বা তার বেশি সময় ধরে ক্লাসে অনুপস্থিত অন্তত ১০ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারও রয়েছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত স্কুলে গেলেও এরপর আর যায়নি সে।
‘২০২১ সালে ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে চার লাখ ২৭ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে হয় চার লাখ ৬৯ হাজার। ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জনে। কিন্তু ২০২৬ সালে আবার বড় ধরনের পতন হয়েছে’
সুমাইয়ার মা তাছলিমা আক্তার জানান, মেয়ে বড় হয়ে উঠছে। গ্রামের রাস্তাঘাট ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তাকে স্থানীয় একটি কওমি মাদরাসায় ভর্তি করেছেন।
কাগজে-কলমে পিঠাসূতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ১০৪ জন। অথচ ২০২২ সালে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী ছিল ১৫০ জন। এরপর প্রতিবছরই শিক্ষার্থী কমেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিনতী রানী কর বলেন, ‘শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ঠেকাতে নিয়মিত হোম ভিজিট করা হচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অসচেতনতা, কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসামুখী প্রবণতা এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাজের জন্য ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়া এবং মাদরাসামুখী প্রবণতা অন্যতম কারণ। আগের তুলনায় অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন’
শুধু একটি বিদ্যালয়ের চিত্র নয়, ময়মনসিংহ জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক চিত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে দুই হাজার ১৪০টি। ২০২৫ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২৫ হাজার ৮২২ জনে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে এক লাখ ১২ হাজার ৭৪৬ জন।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২১ সালে ময়মনসিংহে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল পাঁচ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে চার লাখ ২৭ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৩ সালে কিছুটা বেড়ে হয় চার লাখ ৬৯ হাজার। ২০২৪ সালে চার লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮ জনে। কিন্তু ২০২৬ সালে আবার বড় ধরনের পতন হয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাবে চলতি বছর জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ঝরে পড়ছে গফরগাঁওয়ে। সেখানে এই হার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারাকান্দা, যেখানে ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ।
‘অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানদের মাদরাসা, ইবতেদায়ি মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এ কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে। এর বাইরে অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণ আমাদের কাছে নেই। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগের। তবে অভিভাবকদেরও নিজস্ব পছন্দ ও অগ্রাধিকার রয়েছে’—জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা
গফরগাঁও উপজেলায় ২০২০ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩৫ হাজার ২৭ জনে।
বাতেনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ কমে যাওয়া, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের অল্প বয়সে কাজে যুক্ত হওয়া এবং মাদরাসামুখী প্রবণতা অন্যতম কারণ।’
তিনি আরও বলেন, আগের তুলনায় অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে মাদরাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
গফরগাঁও উপজেলার খায়রুল্লাহ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মো. নূরুজ্জামান বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষার্থী কমে গেলে এর প্রভাব মাধ্যমিক পর্যায়েও পড়বে। ঝরে পড়ার কারণ চিহ্নিত করে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, বিদ্যালয়ে আনন্দময় পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের তদারকি বাড়ানো জরুরি।’
ময়মনসিংহ সদর উপজেলার আনন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সানোয়ার হোসেন জানান, শিক্ষার্থী ঝরে পড়া ঠেকাতে তারা নিয়মিত হোম ভিজিট করছেন।
‘কেউ সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম, কিন্ডারগার্টেন কিংবা মাদরাসায় পড়াতে চাইলে সেটি অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। করোনার সময় সরকারি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও অনেক বেসরকারি বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনে পাঠদান চালু ছিল। তখন কিছু শিক্ষার্থী অন্য ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়’
শিক্ষার্থী কমার পাশাপাশি শিক্ষক সংকটও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ময়মনসিংহ জেলার দুই হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে এক হাজার ২৪২টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে।
জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১১ হাজার ৯০২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ হাজার ৪৯ জন। শূন্য রয়েছে ৮৫৩টি পদ।
সদর উপজেলার পয়েস্তিরচর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। ফলে একসঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান চালাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১১২ জন। ২০১৮ সালে ছিল ২২৩ জন।
মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে ১১২ শিক্ষার্থীর পাঠদান ও বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুবা আক্তার।
তিনি বলেন, করোনার সময় অনেক শিক্ষার্থী আশপাশের মাদরাসায় চলে যায়। তাদের অনেকে আর স্কুলে ফেরেনি। শিক্ষার্থী বাড়াতে সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল চালুর কথা বলেন তিনি।
গত ৩০ জুলাই ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ১১৯ নম্বর গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিদ্যালয় বন্ধ পাওয়া যায়। ওইদিন বিকেল সোয়া ৪টায় ছুটি হওয়ার কথা থাকলেও সোয়া ৩টার দিকেই বিদ্যালয়টি বন্ধ ছিল।
বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছয়টি। কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক বদলি হওয়ার পর নতুন কোনো প্রধান শিক্ষক সেখানে যোগ দেননি।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী জানান, বিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থী ১৫২ জন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ২০৪ জন। শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলা সদরে কোনো সভায় অংশ নিতে গেলে বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
একই দিন বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে কাছের বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোদ্দাছেরুল হক উপজেলা সদরে সভায় থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান শিক্ষকরা।
বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাতজন শিক্ষকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন চারজন। শিক্ষার্থী ১৩৩ জন।
ওই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক না থাকায় পাঠদানসহ বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়ছে।’
মুক্তাগাছা উপজেলার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল আমীন বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ছুটির বিষয়টি নজরে আসার পর প্রতিষ্ঠান দুটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় মূলত এ ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’
শিক্ষার্থী কমার পেছনে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যাও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহে এখনো ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ভবনের সংখ্যা ১৮৭টি।
সদর উপজেলার ঝাপারকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর একটি উদাহরণ। গত ৩০ জুলাই দুপুরে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে মাত্র ১০ শিক্ষার্থীকে ক্লাস করতে দেখা যায়।
সহকারী শিক্ষক সনি ফারজানা বলেন, ‘বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী উপস্থিতি দিন দিন কমছে। টিনের ঘরে প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে কষ্ট হয়। অনেকে বিদ্যালয়ে না এসে মাছ ধরা কিংবা কৃষিকাজে চলে যায়।’
নদীভাঙনে পুরোনো ভবন বিলীন হওয়ার পর ২০১৯ সালে নির্মিত টিনশেড ভবনে চলছে বিদ্যালয়টির পাঠদান। ২০১৭ সালে এখানে শিক্ষার্থী ছিল ২৪০ জন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে হয়েছে ১০৭ জন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের সবশেষ শুমারি অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। ২০২৩ সালে তা কমে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে এলেও ২০২৪ সালে আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেটে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলাতেই ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশের বেশি।
কথা হয় এক অভিভাবক মাহমুদা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার মেয়েকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে বাড়ির কাছের একটি মাদরাসায় ভর্তি করেছি। একদিকে মেয়ে সন্তান, অন্যদিকে যাতায়াতের সুবিধা—সবকিছু বিবেচনা করে আমার মনে হয়েছে, মেয়ের জন্য মাদরাসায় পড়াশোনা করানোই ভালো হবে।’
আরক অভিভাবক মশিউর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান ভালো। তবে আমার সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এজন্য তাকে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করেছি। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ানোর ইচ্ছা থেকেই মূলত প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তাকে সরিয়ে সেখানে ভর্তি করা হয়েছে।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভিভাবকদের একটি বড় অংশ সন্তানদের মাদরাসা, ইবতেদায়ি মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন কিংবা বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছেন। এ কারণে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে।’
তিনি বলেন, ‘এর বাইরে অন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণ আমাদের কাছে নেই। শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগের। তবে অভিভাবকদেরও নিজস্ব পছন্দ ও অগ্রাধিকার রয়েছে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘কেউ সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম, কিন্ডারগার্টেন কিংবা মাদরাসায় পড়াতে চাইলে সেটি অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত। তবে করোনা-পরবর্তী সময়ে এ প্রবণতা কিছুটা বেড়েছে। করোনার সময় সরকারি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও অনেক বেসরকারি বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেনে পাঠদান চালু ছিল। তখন কিছু শিক্ষার্থী অন্য ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যায়।’
তার মতে, শুধু ময়মনসিংহ নয়, দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এসআর/এএসএম
What's Your Reaction?







