ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

ফুটবলের কিছু ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এমন কিছু ম্যাচ আছে যেখানে মাঠে বল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে যুদ্ধের স্মৃতি, রাজনৈতিক ক্ষত, বিতর্ক, প্রতিশোধ আর কিংবদন্তির গল্প। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড সেই বিরল দ্বৈরথ, যেখানে প্রতিটি পাসের পেছনে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, প্রতিটি গোলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি প্রজন্মের আবেগ। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি দুই দল। ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এই পুনর্মিলন যেন পুরোনো ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন একটাই — এবার কি নতুন ইতিহাস লেখা হবে, নাকি ফিরে আসবে পুরোনো ইতিহাস? আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বৈরিতার শিকড় ফুটবলেরও আগে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (তৎকালীন মালভিনাস) যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ক্ষত তৈরি করে। মাত্র ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে শত শত মানুষের প্রাণহানি হয়। যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের মানুষের মনে ক্ষোভ রয়ে যায়। আরও পড়ুন ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধের ঘটনার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই’ দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনার সামরিক জান

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

ফুটবলের কিছু ম্যাচ শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এমন কিছু ম্যাচ আছে যেখানে মাঠে বল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জেগে ওঠে যুদ্ধের স্মৃতি, রাজনৈতিক ক্ষত, বিতর্ক, প্রতিশোধ আর কিংবদন্তির গল্প। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড সেই বিরল দ্বৈরথ, যেখানে প্রতিটি পাসের পেছনে লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, প্রতিটি গোলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একেকটি প্রজন্মের আবেগ।

২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি দুই দল। ২৪ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে এই পুনর্মিলন যেন পুরোনো ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। প্রশ্ন একটাই — এবার কি নতুন ইতিহাস লেখা হবে, নাকি ফিরে আসবে পুরোনো ইতিহাস?

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড বৈরিতার শিকড় ফুটবলেরও আগে। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড (তৎকালীন মালভিনাস) যুদ্ধ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর ক্ষত তৈরি করে। মাত্র ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে শত শত মানুষের প্রাণহানি হয়। যুদ্ধ শেষ হলেও দুই দেশের মানুষের মনে ক্ষোভ রয়ে যায়।

দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ফকল্যান্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা তাদের দেশের তীব্র অর্থনৈতিক সংকট থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতে এবং নিজেদের হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পেতে ২ এপ্রিল ফকল্যান্ড আক্রমণ করে। জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার দ্বীপটি পুনরুদ্ধারে নৌবাহিনী পাঠান।

৭৪ দিন ধরে চলমান যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে জয় পায় যুক্তরাজ্য। এর প্রায় ৩০ বছর পর ২০১৩ সালে ফকল্যান্ডে বসবাসকারীদের মধ্যে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ বাসিন্দা গণভোটে ব্রিটিশ ভূখণ্ড হিসেবে থাকার পক্ষে ভোট দেন। যদিও সেই ভোট নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে মাত্র ৩০০ মাইল দূরে, অন্যদিকে ব্রিটেন থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার মাইল। ঐতিহাসিক সূত্র ধরে আর্জেন্টিনা স্থানীয় নামের মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জকে তাদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে আসছে। অন্যদিকে, ১৮৩৩ সাল থেকে সেখানে স্থায়ীভাবে শাসন করে আসছিল ব্রিটেন। দ্বীপের বাসিন্দারাও ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত।

চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে যখন দুই দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়, সেটি আর শুধু ফুটবল ম্যাচ ছিল না। আর্জেন্টিনার অনেকের কাছে সেটি ছিল প্রতীকী প্রতিশোধের সুযোগ, আর ইংল্যান্ডের কাছে ছিল মর্যাদা রক্ষার লড়াই।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তের জন্ম দেন দিয়েগো ম্যারাডোনা। ইংল্যান্ড গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে হাত দিয়ে বল স্পর্শ করে জালে পাঠান তিনি। তিউনিসিয়ার রেফারি আলি বিন নাসের গোলটি বৈধ ঘোষণা করেন। পরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘গোলটি হয়েছিল অল্পটা ম্যারাডোনার মাথা, আর অল্পটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।’

ইংল্যান্ডের কাছে এটি ছিল প্রতারণা। আর্জেন্টিনার বহু সমর্থকের কাছে এটি ছিল যুদ্ধের প্রতীকী প্রতিশোধ। পরে ম্যারাডোনা নিজেও স্বীকার করেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সেই গোল তাঁর কাছে বিশেষ অর্থ বহন করেছিল। বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই পাঁচ মিনিটের মাথায় ম্যারাডোনা নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে পাঁচজন ইংলিশ ফুটবলারকে কাটিয়ে করেন অবিশ্বাস্য এক গোল।

ফিফা পরে সেটিকে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ ঘোষণা করে। একই ম্যাচে একই খেলোয়াড় — একদিকে ফুটবলের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল, অন্যদিকে সবচেয়ে নান্দনিক গোল। এমন বৈপরীত্যের গল্প ফুটবলে আর নেই। ম্যারাডোনা পরে বলেছিলেন, ‘এটি ছিল ম্যারাডোনার মাথা আর ঈশ্বরের হাতের একটু মিশ্রণ।’ আরেক সাক্ষাৎকারে এটিকে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘প্রতীকী প্রতিশোধ’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।

ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা সরাসরি স্বীকার করেছিলেন যে এই জয়টি শুধু ফুটবলের ছিল না, বরং এটি ছিল একটি দেশের বিরুদ্ধে জয় এবং যুদ্ধের এক ধরনের প্রতীকী প্রতিশোধ। তিনি বলেছিলেন, ‘যদিও আমরা ম্যাচের আগে বলেছিলাম যে এই খেলার সাথে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই, কিন্তু আমরা সবাই জানতাম যে সেখানে (ফকল্যান্ড যুদ্ধে) অনেক আর্জেন্টাইন তরুণ মারা গেছে, যাদের পাখির মতো গুলি করে মারা হয়েছিল। আর তাই এই জয়টি ছিল আমাদের এক ধরণের প্রতীকী প্রতিশোধ।’

ম্যারাডোনা বুঝিয়েছিলেন যে সাধারণ মানুষের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব কতটা আকাশচুম্বী ছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘এটি ছিল এমন একটা অনুভূতি, যেন আমরা শুধু একটি ফুটবল দলকে হারাইনি, বরং একটা পুরো দেশকে হারিয়েছি।’

পরবর্তীতে তার আত্মজীবনীতে সেই ম্যাচের আবহ নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের বুটের নিচে কোনো বন্দুক ছিল না, কিন্তু আমাদের মাথায় তীব্র ক্ষোভ ছিল। আমরা এমন একটা ম্যাচ খেলছিলাম যেখানে আমাদের দেশের সম্মান জড়িয়ে ছিল। আমরা সাধারণ মানুষের মুখে একটু হাসি ফোটাতে চেয়েছিলাম।’

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি দুই দল। ডিয়েগো সিমিওনের সঙ্গে সংঘর্ষে মাঠে শুয়ে থেকেই পা বাড়িয়ে দেন ডেভিড বেকহ্যাম। সিমিওনে পড়ে যান, আর লাল কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের তরুণ তারকা। ২-২ সমতায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে জিতে যায় আর্জেন্টিনা। দেশে ফিরে ভয়াবহ সমালোচনার মুখে পড়েন বেকহ্যাম। ইংলিশ সংবাদমাধ্যম তাকে জাতীয় খলনায়কে পরিণত করে। পরে সিমিওনে নিজেই স্বীকার করেন, তিনি ঘটনাটিকে আরও নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করেছিলেন যাতে রেফারি বেকহ্যামকে লাল কার্ড দেখান।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

চার বছর পর ২০০২ সালে জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে আবারও দেখা দুই দলের। এবার বেকহ্যাম পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জেতান। ১৯৯৮ সালের কান্না মুছে যায়। যাকে একসময় পরাজয়ের জন্য দায়ী করা হয়েছিল, তিনিই হয়ে ওঠেন প্রতিশোধের নায়ক।

ফকল্যান্ড যুদ্ধ থেকে মাঠের বৈরিতায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা

অনেকে ভাবেন এই বৈরিতা শুরু হয়েছিল ম্যারাডোনাকে ঘিরে। বাস্তবে এর সূচনা আরও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিন বিতর্কিত লাল কার্ড দেখেন। মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি, দর্শকদের সঙ্গে উত্তেজনা — সব মিলিয়ে সেই ম্যাচ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও তিক্ত করে তোলে। ইংল্যান্ড কোচ আলফ রামসে তখন আর্জেন্টাইনদের "জানোয়ার" বলে মন্তব্য করেছিলেন, যা ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

দীর্ঘ ২৪ বছর বিশ্বকাপে আর দেখা হয়নি দুই দলের। সেই অপেক্ষার অবসান ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। এবার মাঠে আছেন লিওনেল মেসি, অন্য প্রান্তে জুড বেলিংহ্যাম ও হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড। দুই দলের কোচই বলছেন, অতীত ভুলে এটি শুধু ফুটবল ম্যাচ। কিন্তু ইতিহাস কি এত সহজে ভোলা যায়? বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই বিতর্ক, নাটক, অশ্রু, প্রতিশোধ আর স্মরণীয় মুহূর্ত। ১৯৬৬, ১৯৮৬, ১৯৯৮, ২০০২। প্রতিটি অধ্যায়ই ফুটবল ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।

২০২৬ সালের এই সেমিফাইনালেও সেই ইতিহাসের ভার দুই দলের কাঁধে। তবে আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি এবং মেসি দুজনেই বলেছেন, তারা অতীত নয়, বর্তমান ম্যাচেই মনোযোগ দিতে চান। কিন্তু ইতিহাসের এমন ম্যাচে অতীতকে পুরোপুরি আলাদা করা কি আদৌ সম্ভব?

হয়তো না। কারণ আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড মানেই কেবল ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়। এটি স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের, ম্যারাডোনার সঙ্গে মেসির, প্রতিশোধের সঙ্গে নতুন স্বপ্নের আরেকটি বিশ্বকাপ অধ্যায়। ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ‘হাতের গোল’, ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’, বেকহ্যামের লাল কার্ড কিংবা প্রতিশোধের পেনাল্টি। সবকিছু মিলিয়ে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড আসলে এক জীবন্ত ইতিহাস।

এই দ্বৈরথে প্রতিপক্ষ শুধু ১১ জন ফুটবলার নয়। প্রতিপক্ষ ইতিহাসও।

টিটিটি/আইএন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow