ফসল রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টায় সুনামগঞ্জের কৃষকরা
সুনামগঞ্জ জেলার চারটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত বোরো ফসলের ভাণ্ডার খ্যাত 'দেখার হাওর'। ৮ হাজার ৯১০ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে আবাদি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। যেখানে প্রতি বছর দেড় লাখ টন ফসল উৎপাদন হয়। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই হাওরের কৃষকরা এখন ধান কাটায় ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফসল ঘোলায় তোলার সময়ে ফসল রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। দেখার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া বাঁধ দিয়ে প্রবেশকৃত পানি বন্ধে এই 'জলযুদ্ধ' হাওর পাড়ের কৃষকদের। ফসল রক্ষার এই যুদ্ধের সূচনা গত ১২ই এপ্রিল থেকে। ওইদিন বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ফসল রক্ষায় স্থানীয় কৃষকদের চাপের মুখে উথারিয়া বাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হয় জেলা প্রশাসন ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে হাওরের অন্তত ২০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে যায়। তলিয়ে যাওয়া এসব জমির কৃষকদের কথা বিবেচনা করে সেদিন (১২ই এপ্রিল) জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়ার উপস্থিতিতে উথারিয়া বাঁধ কেটে দেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। এরপর টানা কয়েকদিন পানি নিষ্কাশনের ফলে তলিয়ে যাওয়া ফস
সুনামগঞ্জ জেলার চারটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত বোরো ফসলের ভাণ্ডার খ্যাত 'দেখার হাওর'। ৮ হাজার ৯১০ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে আবাদি জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টর। যেখানে প্রতি বছর দেড় লাখ টন ফসল উৎপাদন হয়। জেলার অন্যতম বৃহৎ এই হাওরের কৃষকরা এখন ধান কাটায় ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ফসল ঘোলায় তোলার সময়ে ফসল রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। দেখার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উথারিয়া বাঁধ দিয়ে প্রবেশকৃত পানি বন্ধে এই 'জলযুদ্ধ' হাওর পাড়ের কৃষকদের।
ফসল রক্ষার এই যুদ্ধের সূচনা গত ১২ই এপ্রিল থেকে। ওইদিন বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাওয়া ফসল রক্ষায় স্থানীয় কৃষকদের চাপের মুখে উথারিয়া বাঁধ কেটে দিতে বাধ্য হয় জেলা প্রশাসন ও জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাপনা না থাকায় বৃষ্টির পানিতে হাওরের অন্তত ২০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে যায়। তলিয়ে যাওয়া এসব জমির কৃষকদের কথা বিবেচনা করে সেদিন (১২ই এপ্রিল) জেলা প্রশাসক ড. ইলিয়াস মিয়ার উপস্থিতিতে উথারিয়া বাঁধ কেটে দেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। এরপর টানা কয়েকদিন পানি নিষ্কাশনের ফলে তলিয়ে যাওয়া ফসল রক্ষা পায়।
গত তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে কেটে দেওয়া বাঁধ দিয়ে ‘দেখার হাওরে’ পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। হাওরে পানি প্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় বাঁধ পুনর্নির্মাণ কাজে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, হাওরের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করেই অপরিকল্পিতভাবে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কারণে প্রতিবছর এমন সংকট তৈরি হয়। বৃষ্টির পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, ফসল তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে ঝুঁকি নিয়ে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশন করা হলেও নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে হাওরে পানি প্রবেশ করে। এতে ফসলহানির ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এই সংকট নিরসনে দেখার হাওরপাড়ের আসামপুর-আস্তমা গ্রামের দুই পাড় সংযুক্ত করে মহাসিং নদীতে রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে ফসলহানির কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
দেখার হাওরপাড়ের আস্তমা গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান ও জমিরুল হক বলেন, দেখার হাওরের ফসলের উপর আমাদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। এই হাওরের ফসল ঘরে তুলতে পারলেই তা দিয়ে আমাদের সংসার চলে। যদি কোনো কারণে হাওরের ফসল তলিয়ে যায় তাহলে আমাদের দুর্গতির শেষ থাকে না। সেজন্য আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা। সেজন্য রাবার ড্যামের বিকল্প নেই।
দেখার হাওর পাড়ের অন্য কৃষক সাজাদ মিয়া ও তারেক মিয়া বলেন, '২০১৭ সালে সুনামগঞ্জ জেলায় ফসলহানির পর থেকে প্রতিবছর দেখার হাওরের ফসল রক্ষায় কোটি কোটি ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এসব বাঁধ নির্মাণের সময় পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা থাকে না। ফলে বৃষ্টি হলে হাওরের ভেতরেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসর তলিয়ে যায়। আবার জলাবদ্ধতা নিরসনে বাধ্য হয়ে বাঁধ কেটে দিলে পরবর্তীতে নদীর পানি হাওরে প্রবেশ করে। এতে পুরো হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া ফসল রক্ষার জন্য বাধ্য হয়ে বাঁধ কেটে দিলে কৃষকদের ওপর প্রশাসনিকভাবে মামলা দেওয়া হয়। এই উভয় সংকট থেকে রক্ষা পেতে হলে অপরিকল্পিত ফসলরক্ষা বাঁধ না দিয়ে স্থায়ী সমাধান খোঁজা দরকার। এক্ষেত্রে দেখার হাওরের প্রবেশমুখে রাবার ড্যাম স্থাপনের কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে দেখার হাওরের চলমান সংকট নিরসন ও স্থায়ী সমাধান পেতে গত ২২ এপ্রিল উথারিয়া ক্লোজার পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাসহ জেলা ও উপজেলার হাওর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এসময় হাওরপাড়ের কৃষক, স্থানীয় রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যমকর্মীসহ সচেতন নাগরিকদের সাথে কথা বলেন তারা। হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী সমাধানে তাদের মতামত গ্রহণ করেন। এসময় সবাই ‘দেখার হাওরের’ প্রবেশমুখে রাবার ড্যাম নির্মাণের পক্ষে মতামত দেন।
হাওর পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, 'আমরা দেখার হাওরে পানি প্রবেশের খবর পেয়ে উথারিয়া বাঁধ পরিদর্শনে এসেছি। এখানে তৃণমূল পর্যায় থেকে সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। স্থানীয় কৃষকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, এখানে একটি রাবার ড্যাম স্থাপন করা গেলে হয়ত এই সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান সম্ভব। আমরা তাদের দাবি আমলে নিয়ে জরিপ করছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে সমীক্ষা যাচাইয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমীক্ষা যাচাইয়ের মাধ্যমে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় এমপি যোগাযোগ করেছেন। শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধানে কাজ শুরু করতে হবে। কৃষকরা নির্বিঘ্নে তাদের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কয়ছর এম আহমদ বলেন,‘দেখার হাওরের ফসলের মাধ্যমে সুনামগঞ্জের চারটি উপজেলার লক্ষাধিক কৃষক সরাসরি জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। ফলে এই হাওরের ফসল রক্ষায় স্থায়ী সমাধান জরুরি। চলতি বছরের মতো প্রতি বছরই পুরো জেলায় শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে ফসল রক্ষার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতেও ফসলহানির শঙ্কা কাটে না। কৃষকদের কথা বিবেচনা করে ইতোমধ্যে আমি জাতীয় সংসদে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেছি। এই সংকট নিরসনে কৃষকদের মতামতের ভিত্তিতে শীঘ্রই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
What's Your Reaction?