ফুটবল ম্যাচ কেন মানুষের অহংকার ও আবেগের যুদ্ধে পরিণত হয়?

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলোর একটি। চার বছর পরপর এক মাসের জন্য যেন পৃথিবী এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, ভূগোল ও রাজনীতির বিভাজন অতিক্রম করে কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই খেলা দেখে, একই গোলে উল্লাস করে, একই পরাজয়ে হতাশ হয়। এই অসাধারণ সম্মিলিত আবেগই বিশ্বকাপকে অন্য সব ক্রীড়া আয়োজন থেকে আলাদা করেছে। কিন্তু মানুষের আবেগের এই বিস্ময়কর শক্তির একটি অন্ধকার দিকও আছে। উচ্ছ্বাস যখন সংযম হারায়, সমর্থন যখন অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন খেলার সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের জকিগঞ্জে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে দুই চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই তর্ক রূপ নেয় প্রাণঘাতী সংঘর্ষে। একজনের ছুরিকাঘাতে অন্যজনের মৃত্যু হয়। একটি ফুটবল ম্যাচ ঘিরে এমন পরিণতি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। এ

ফুটবল ম্যাচ কেন মানুষের অহংকার ও আবেগের যুদ্ধে পরিণত হয়?

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলোর একটি। চার বছর পরপর এক মাসের জন্য যেন পৃথিবী এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, ভূগোল ও রাজনীতির বিভাজন অতিক্রম করে কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একই খেলা দেখে, একই গোলে উল্লাস করে, একই পরাজয়ে হতাশ হয়। এই অসাধারণ সম্মিলিত আবেগই বিশ্বকাপকে অন্য সব ক্রীড়া আয়োজন থেকে আলাদা করেছে।

কিন্তু মানুষের আবেগের এই বিস্ময়কর শক্তির একটি অন্ধকার দিকও আছে। উচ্ছ্বাস যখন সংযম হারায়, সমর্থন যখন অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তখন খেলার সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের জকিগঞ্জে ঘটে যাওয়া একটি মর্মান্তিক ঘটনা সেই কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে দুই চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়। মুহূর্তের মধ্যে সেই তর্ক রূপ নেয় প্রাণঘাতী সংঘর্ষে। একজনের ছুরিকাঘাতে অন্যজনের মৃত্যু হয়। একটি ফুটবল ম্যাচ ঘিরে এমন পরিণতি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি আমাদের সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।

এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে, তা নয়। ফুটবলের ইতিহাসে সমর্থকদের উন্মাদনা বহুবার সহিংসতার রূপ নিয়েছে। ১৯৮৫ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের আগে গ্যালারিতে সংঘর্ষে ৩৯ জন নিহত হন। ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ‘ফুটবল হুলিগানিজম’ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছিল। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলেও ক্লাব সমর্থকদের সহিংস গোষ্ঠীগুলো বহু প্রাণহানির জন্য দায়ী। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ফুটবল কখনো মানুষকে এক করে, আবার কখনো মানুষের ভেতরের আগ্রাসনকেও উন্মুক্ত করে দেয়।

প্রশ্ন হলো, একটি খেলা মানুষকে এত গভীরভাবে স্পর্শ করে কেন?

এর উত্তর মনোবিজ্ঞানের ভেতরে লুকিয়ে আছে। ব্রিটিশ মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল এবং জন টার্নার প্রণীত সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব (Social Identity Theory) বলছে, মানুষ নিজের পরিচয় শুধু ব্যক্তি হিসেবে নয়, কোনো গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও নির্মাণ করে। সেই গোষ্ঠী হতে পারে একটি জাতি, একটি ধর্ম, একটি রাজনৈতিক দল কিংবা একটি ফুটবল দল। ফলে প্রিয় দলের বিজয়কে মানুষ নিজের বিজয় বলে মনে করে, আর পরাজয়কে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে অনুভব করে।

এই কারণেই ফুটবল মাঠের বাইরের সমর্থকের চোখে ম্যাচটি কেবল ২২ জন খেলোয়াড়ের প্রতিযোগিতা থাকে না; সেটি তার নিজের আত্মপরিচয়েরও লড়াই হয়ে ওঠে।

মার্কিন গবেষক রবার্ট সিয়ালদিনি দেখিয়েছেন, প্রিয় দল জিতলে সমর্থকেরা ‘আমরা জিতেছি’—এই ভাষা ব্যবহার করেন, কিন্তু দল হারলে বলেন, ‘ওরা হেরে গেছে’। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় Basking in Reflected Glory (BIRG)। অর্থাৎ, অন্যের সাফল্যের আলোয় নিজের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ার অনুভূতি। আবার দল ব্যর্থ হলে অনেকেই মানসিকভাবে সেই সম্পর্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন, যাকে বলা হয় Cutting Off Reflected Failure (CORF)। এই দুই প্রবণতাই প্রমাণ করে, খেলার সঙ্গে মানুষের আবেগের সম্পর্ক কেবল বিনোদনের নয়; এটি আত্মপরিচয়েরও বিষয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আবেগের একটি ভিন্ন মাত্রা রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে না। ফলে সমর্থকরা নিজেদের স্বপ্ন, রুচি এবং পরিচয় বিদেশি দলগুলোর মধ্যে খুঁজে নেন। কয়েক দশক ধরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে কেন্দ্র করে যে সাংস্কৃতিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক পরিবারে সন্তান জন্মের আগেই তার প্রিয় দল নির্ধারিত হয়ে যায়। খেলার সঙ্গে যুক্ত হয় পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক বন্ধন এবং ব্যক্তিগত অহংকার।

বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট দলের বিজয়ে নয়; বরং একটি গোলের আনন্দে পৃথিবীর কোটি মানুষের একসঙ্গে হাসিতে। ফুটবল মানুষকে বিভক্ত করার জন্য জন্মায়নি; বরং ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন জাতিকে একই আবেগে যুক্ত করার জন্যই এর এত জনপ্রিয়তা। সিলেটের সেই তরুণের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আবেগ যখন বিবেককে অতিক্রম করে, তখন খেলার মাঠের বাইরেও লাল কার্ড দেখাতে হয়। একটি গোলের উল্লাস যদি একটি পরিবারকে শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়, তবে সেখানে জয়ী কোনো দল থাকে না; পরাজিত হয় পুরো সমাজ।

এখানে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবও গভীর। আগে খেলা নিয়ে আলোচনা হতো পাড়ার চায়ের দোকানে। এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সেই বিতর্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অ্যালগরিদম এমন বিষয়কেই বেশি ছড়িয়ে দেয়, যা মানুষকে উত্তেজিত করে। ফলে বিদ্রূপ, কটাক্ষ, অপমান এবং ঘৃণার ভাষা স্বাভাবিক আলোচনার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। ভার্চুয়াল সংঘাত অনেক সময় বাস্তব সম্পর্ককেও বিষিয়ে তুলছে।

আরেকটি বিষয় আমাদের বিবেচনায় নেওয়া দরকার। বাংলাদেশে ক্রীড়া-সংস্কৃতির চর্চা যতটা হওয়া উচিত, বাস্তবে তা হয় না। দর্শক হিসেবে আমরা বিশ্বসেরা, কিন্তু অংশগ্রহণকারী হিসেবে নই। খেলাকে আমরা উদ্‌যাপন করি, কিন্তু খেলার মূল্যবোধ—পরাজয় মেনে নেওয়া, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা, নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতা করা—এসব শিক্ষা যথেষ্টভাবে চর্চা করি না। ফলে আবেগ থাকে, কিন্তু সেই আবেগ পরিচালনার সামাজিক দক্ষতা তৈরি হয় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক চাপ, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় মানুষের আচরণকে অস্বাভাবিকভাবে প্রভাবিত করে। খেলার মতো আবেগঘন পরিবেশে এই চাপ আরও তীব্র হতে পারে। অবশ্যই অধিকাংশ মানুষ সুস্থভাবে খেলা উপভোগ করেন। কিন্তু যাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য উসকানিও বড় সহিংসতার কারণ হতে পারে। তাই বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, সামাজিক মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

বিশ্বকাপের আরেকটি দিক আমাদের ভাবায়। আমরা যেসব বিদেশি দলের জন্য এত আবেগ প্রকাশ করি, সেই দলগুলোর খেলোয়াড়েরা ম্যাচ শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, জার্সি বিনিময় করেন এবং প্রতিপক্ষের প্রশংসা করেন। মাঠে তারা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু মাঠের বাইরে পেশাদার সহকর্মী। অথচ হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে থাকা সমর্থকরা অনেক সময় এমন আচরণ করেন, যেন প্রতিপক্ষ দলকে সমর্থন করা একটি অপরাধ।

এই বৈপরীত্য আমাদের শিক্ষা দেয় যে সমস্যা ফুটবলে নয়; সমস্যা আমাদের আবেগ ব্যবস্থাপনায়।

সমাধানের পথও তাই সমাজের ভেতরেই খুঁজতে হবে। পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে—খেলা মানে আনন্দ, শত্রুতা নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া শিক্ষার সঙ্গে স্পোর্টসম্যানশিপ, সহনশীলতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে হবে। গণমাধ্যমকে উত্তেজনা সৃষ্টির বদলে ইতিবাচক ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে খেলা ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ আবেগের অজুহাতে অপরাধকে বৈধ মনে না করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট দলের বিজয়ে নয়; বরং একটি গোলের আনন্দে পৃথিবীর কোটি মানুষের একসঙ্গে হাসিতে। ফুটবল মানুষকে বিভক্ত করার জন্য জন্মায়নি; বরং ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন জাতিকে একই আবেগে যুক্ত করার জন্যই এর এত জনপ্রিয়তা।

সিলেটের সেই তরুণের মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আবেগ যখন বিবেককে অতিক্রম করে, তখন খেলার মাঠের বাইরেও লাল কার্ড দেখাতে হয়। একটি গোলের উল্লাস যদি একটি পরিবারকে শোকের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়, তবে সেখানে জয়ী কোনো দল থাকে না; পরাজিত হয় পুরো সমাজ।

বিশ্বকাপ শেষ হবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসবে, নতুন নায়ক জন্ম নেবে। কিন্তু আমাদের সমাজে যদি সহনশীলতা, আত্মসংযম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে না ওঠে, তাহলে প্রতি চার বছর পরপর আমরা একই প্রশ্নের মুখোমুখি হব—আমরা কি ফুটবলকে ভালোবাসি, নাকি ফুটবলকে অজুহাত বানিয়ে নিজের অসহিষ্ণুতাকেই প্রকাশ করি?

খেলার প্রকৃত বিজয় তখনই হবে, যখন একটি গোলের পর উল্লাসে প্রতিবেশীকে আলিঙ্গন করা যাবে, ছুরি তোলা নয়; ভিন্ন দলের পতাকা দেখেও বন্ধুত্ব অটুট থাকবে; আর বিশ্বকাপ আমাদের শেখাবে, প্রতিযোগিতা মানুষকে শ্রেষ্ঠ করে, কিন্তু মানবিকতাই তাকে মহান করে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্টডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ
[email protected]

এইচআর/এমএফএ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow