ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য

ইউরোপের মাটিতে ইউরোপেরই কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক জয়—বাংলাদেশ ফুটবল দলের জন্য এটি কেবলই একটি ম্যাচ নয়, ছিল রূপকথার বিনির্মাণ। গত ৫ জুন সান ম্যারিনো স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ডিফেন্ডার তপু বর্মণের জোড়া গোলে নতুন মার্কিন কোচ থমাস ডুলির অধীনে মধুর এক অধ্যায়ের সূচনা করল বাংলাদেশ। কিন্তু এই ম্যাচের পর ফুটবলপ্রেমীদের মনে কৌতূহল জেগেছে সান ম্যারিনোকে নিয়ে। কোথায় এই দেশ? কেনই বা তাদের ফুটবল ইতিহাস এত অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর? চলুন ঘুরে আসি ইতালির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর এক পরম বিস্ময়কর দেশ থেকে। মানচিত্রের এক বিন্দু: যেখানে চারপাশেই ইতালি ভৌগোলিক দিক থেকে সান ম্যারিনোকে বলা হয় ‘এনক্লেভ’ বা সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। অর্থাৎ, এই দেশের চারপাশ জুড়েই রয়েছে অন্য আরেকটি দেশ—ইতালি। ইতালির উত্তর-পূর্ব দিকে রিমিনি শহরের কাছে এপেনাইন পর্বতমালার তিতানো পর্বতের চূড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে চাইলে আপনি মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই হেঁটে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারবেন। প্রাকৃতি

ফুটবলে ‘সবচেয়ে দুর্বল’ দেশ: সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য

ইউরোপের মাটিতে ইউরোপেরই কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক জয়—বাংলাদেশ ফুটবল দলের জন্য এটি কেবলই একটি ম্যাচ নয়, ছিল রূপকথার বিনির্মাণ। গত ৫ জুন সান ম্যারিনো স্টেডিয়ামে স্বাগতিকদের ২-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। ডিফেন্ডার তপু বর্মণের জোড়া গোলে নতুন মার্কিন কোচ থমাস ডুলির অধীনে মধুর এক অধ্যায়ের সূচনা করল বাংলাদেশ।

কিন্তু এই ম্যাচের পর ফুটবলপ্রেমীদের মনে কৌতূহল জেগেছে সান ম্যারিনোকে নিয়ে। কোথায় এই দেশ? কেনই বা তাদের ফুটবল ইতিহাস এত অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর? চলুন ঘুরে আসি ইতালির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর এক পরম বিস্ময়কর দেশ থেকে।

মানচিত্রের এক বিন্দু: যেখানে চারপাশেই ইতালি

ভৌগোলিক দিক থেকে সান ম্যারিনোকে বলা হয় ‘এনক্লেভ’ বা সম্পূর্ণ স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র। অর্থাৎ, এই দেশের চারপাশ জুড়েই রয়েছে অন্য আরেকটি দেশ—ইতালি। ইতালির উত্তর-পূর্ব দিকে রিমিনি শহরের কাছে এপেনাইন পর্বতমালার তিতানো পর্বতের চূড়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। মাত্র ৬১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে চাইলে আপনি মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই হেঁটে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যেতে পারবেন।

san marino
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর সান ম্যারিনো/ ছবি: ভিজিট সান ম্যারিনো

যেখানে সবাই সবাইকে চেনে!

সান ম্যারিনোর জনসংখ্যা মাত্র ৩৩ হাজারের কাছাকাছি। মানুষজন এতই কম যে, এখানকার অধিবাসীরা রসিকতা করে বলেন, ‘আমাদের দেশে কেউ কারও অচেনা নয়।’ এই ছোট্ট জনসংখ্যাই দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম শান্ত ও অপরাধমুক্ত অঞ্চলে পরিণত করেছে। এখানকার মানুষের গড় আয়ুও বেশ দীর্ঘ, যা প্রায় ৮৫ বছর।

আরও পড়ুন>>
সান মারিনোর বিপক্ষে ঐতিহাসিক ম্যাচটি জয়ে রাঙালো বাংলাদেশ
ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে মানুষের আগ্রহ এবার এত কম কেন?
বিশ্বের ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন দেশ’ থেকে কী শিখতে পারে বাংলাদেশ?

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন প্রজাতন্ত্র

সান ম্যারিনোর ইতিহাস কোনো মহাকাব্যের চেয়ে কম নয়। ৩০১ খ্রিষ্টাব্দে মারিনুস নামে এক খ্রিষ্টান পাথরকাটা শ্রমিক রোমান সম্রাটের ধর্মীয় নিপীড়ন থেকে বাঁচতে তিতানো পর্বতে আশ্রয় নেন এবং এই জনপদ গড়ে তোলেন। তার নামানুসারেই দেশের নাম হয় সান ম্যারিনো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই দেশ নিজের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখেছে। এমনকি ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন পুরো ইউরোপ জয় করছিলেন, তখনো তিনি সান ম্যারিনোর প্রাচীন স্বাধীনতায় মুগ্ধ হয়ে দেশটিকে অক্ষত রেখেছিলেন এবং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটিই বর্তমানে টিকে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন প্রজাতন্ত্র।

সান ম্যারিনো
সান ম্যারিনোয় বড়দিনের উৎসব/ ছবি: ভিজিট সান ম্যারিনো

অর্থনীতি: সমৃদ্ধির এক অনন্য প্রতীক

ক্ষুদ্র দেশ হলে কী হবে, অর্থনৈতিক দিক থেকে সান ম্যারিনো অত্যন্ত ধনী। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ। মজার বিষয় হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক সদস্য না হয়েও তারা মুদ্রা হিসেবে ‘ইউরো’ ব্যবহার করে। দেশটির অর্থনীতির বড় একটি অংশ আসে পর্যটন, ব্যাংকিং এবং ঐতিহ্যবাহী সুভ্যেনির ও ডাকটিকিট বিক্রি থেকে। সান ম্যারিনোর নিজস্ব ডাকটিকিট ও কয়েন বিশ্বজুড়ে সংগ্রাহকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।

ফুটবলে‘সবচেয়ে দুর্বল দলের’ হার না মানা গল্প

ফুটবলবিশ্বে সান ম্যারিনো এক পরম ভালোবাসার নাম। ফিফা র‍্যাংকিয়ের একদম তলানিতে (২১১ নম্বর) থাকা এই দলটিকে অনেকেই কৌতুক করে ‘বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল দল’ বলে থাকেন। ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর থেকে তারা প্রায় দুই শতাধিক ম্যাচ খেলেছে, যার মধ্যে হেরেছে ১৯০টিরও বেশি ম্যাচে।

San Marino
সান ম্যারিনো ফুটবল দল/ ছবি: বাফুফে

তাদের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি হলো, পুরো ইতিহাসে তারা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জিতেছে মাত্র দুইবার—এবং দুটি জয়ই এসেছে লিচেনস্টাইনের বিপক্ষে ২০২৪ সালে!

কিন্তু এই দলটির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তাদের ফুটবলারদের মধ্যে। সান ম্যারিনো দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই অপেশাদার। কেউ ব্যাংকার, কেউ গাড়ি মেকানিক, কেউ শিক্ষক তো কেউবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সারাদিন অফিস বা কাজ শেষ করে তারা সন্ধ্যায় অনুশীলনে নামেন। আর সপ্তাহান্তে তারা মাঠে লড়াই করেন হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপে কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের মতো বিশ্বসেরা পেশাদার ফুটবলারদের বিরুদ্ধে! তারা গোল খেলে মন খারাপ করে না, বরং প্রতিপক্ষের জালে একটি গোল দিতে পারলেই পুরো দেশে জাতীয় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।

সান ম্যারিনো সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য

দুইজন প্রেসিডেন্ট: সান ম্যারিনোতে একজন নয়, একসঙ্গে দুজন রাষ্ট্রপ্রধান থাকেন, যাদের বলা হয় ‘ক্যাপ্টেনস রিজেন্ট’। প্রতি ছয় মাস পর পর তারা পরিবর্তিত হন। প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রের ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই নিয়ম।

সান ম্যারিনো
উৎসবের রঙে রঙিন সান ম্যারিনো/ ছবিধ: ভিজিট সান ম্যারিনো

মানুষের চেয়ে গাড়ি বেশি: সান ম্যারিনো পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে মানুষের চেয়ে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা বেশি!

আব্রাহাম লিংকনের নাগরিকত্ব: যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে সান ম্যারিনো তাদের দেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়েছিল। লিংকনও এই ক্ষুদ্র দেশের প্রাচীন শাসনব্যবস্থার দারুণ প্রশংসা করেছিলেন।

কোনো সীমান্ত চৌকি নেই: ইতালির ভেতর থেকে যখন কেউ সান ম্যারিনোতে প্রবেশ করে, তখন কোনো পাসপোর্ট চেকিং বা সীমান্ত পারাপারের ঝামেলা পোহাতে হয় না। কেবল একটি বড় সাইন বোর্ডে লেখা থাকে—‘ওয়েলকাম টু দ্য রিপাবলিক অব সান ম্যারিনো।’

বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটিতে সান ম্যারিনো হয়তো ২-১ গোলে হেরেছে, কিন্তু তাদের লড়াকু ফুটবল মন কেড়েছে ক্রীড়াপ্রেমীদের। ইউরোপের এই ক্ষুদ্র পাহাড়িয়া দেশটির ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ফুটবলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা প্রমাণ করে যে, আকার বা জনসংখ্যায় ছোট হলেও ঐতিহ্যের দিক থেকে তারা কতটা মহিয়ান।

সূত্র: এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, সান ম্যারিনো ট্যুরিজম, ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow