বনলতা সেন: ইতিহাস ও প্রেমের সম্মিলন

জান্নাতুল মাওয়া রিফাত জীবনানন্দ দাশের অনন্য কবিতা ‘বনলতা সেন’। যেখানে বনলতাকে ঘিরে কবির যত সুখ-শান্তির পরম জল্পনা-কল্পনা। কবিতার বনলতাকে নিয়ে পাঠকের বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও কবির বনলতা ক্লান্তির বেশে শান্তির আশ্রয়স্থল। কবি তাঁর সমগ্র জীবনের উত্থান-পতন, সংগ্রামকে দীর্ঘ সময়ের সাথে তুলনা করতে গিয়ে ‘হাজার বছর’ শব্দের ব্যবহার করেন। সময়ের পালাক্রমে ইতিহাস ভ্রমণ করে, শত-সহস্র পথ পাড়ি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তবুও তিনি সুখের সন্ধান পেতে ব্যর্থ হন। সেই একফালি সুখ তিনি খুঁজে পান বনলতার অস্তিত্বে, নীরবতায় আর শান্ত আবহাওয়ায়। কবিতাকে কেন্দ্র করে পাঠকের মনে বহুকাল ধরে জেগে আছে বহু প্রশ্ন। সেই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েছে বহু মতবাদ। তাদের মধ্যেই কেউ কেউ মনে করেন, বনলতা পুরুষও না, আবার নারীও না। বনলতা হলো আত্মা। কেননা কোনো মানুষের পক্ষে হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে থাকা সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ বনলতাকে পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেন। কেননা নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত কাজল কালো চোখ, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় মুখশ্রী কিংবা রঙিন শাড়িতে অন্নপূর্ণা সাজে এমন কোনো উক্তি কবি ব্যবহার করেননি। তিনি বনলতাকে পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করেছ

বনলতা সেন: ইতিহাস ও প্রেমের সম্মিলন

জান্নাতুল মাওয়া রিফাত

জীবনানন্দ দাশের অনন্য কবিতা ‘বনলতা সেন’। যেখানে বনলতাকে ঘিরে কবির যত সুখ-শান্তির পরম জল্পনা-কল্পনা। কবিতার বনলতাকে নিয়ে পাঠকের বিভিন্ন মতভেদ থাকলেও কবির বনলতা ক্লান্তির বেশে শান্তির আশ্রয়স্থল। কবি তাঁর সমগ্র জীবনের উত্থান-পতন, সংগ্রামকে দীর্ঘ সময়ের সাথে তুলনা করতে গিয়ে ‘হাজার বছর’ শব্দের ব্যবহার করেন। সময়ের পালাক্রমে ইতিহাস ভ্রমণ করে, শত-সহস্র পথ পাড়ি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তবুও তিনি সুখের সন্ধান পেতে ব্যর্থ হন। সেই একফালি সুখ তিনি খুঁজে পান বনলতার অস্তিত্বে, নীরবতায় আর শান্ত আবহাওয়ায়।

কবিতাকে কেন্দ্র করে পাঠকের মনে বহুকাল ধরে জেগে আছে বহু প্রশ্ন। সেই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েছে বহু মতবাদ। তাদের মধ্যেই কেউ কেউ মনে করেন, বনলতা পুরুষও না, আবার নারীও না। বনলতা হলো আত্মা। কেননা কোনো মানুষের পক্ষে হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে থাকা সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ বনলতাকে পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেন। কেননা নারীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত কাজল কালো চোখ, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় মুখশ্রী কিংবা রঙিন শাড়িতে অন্নপূর্ণা সাজে এমন কোনো উক্তি কবি ব্যবহার করেননি। তিনি বনলতাকে পুরুষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কেউ কেউ তো বলেন, কবি কখনো নাটোরেই যাননি। তাহলে নাটোরের বনলতার সাথে তার দেখা হবে কেমন করে? এটি নিছকই কবির কল্পনা।

এতশ মতবাদের মধ্যে কবিতার সেই বনলতাকে নারী চরিত্র হিসেবেই প্রতীয়মান হওয়া খুবই স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত। কেননা প্রেয়সীর অপেক্ষাতেই কেবল কোনো মানবের হাজার বছরের দীর্ঘ সময়ের, দীর্ঘ দূরত্ব বর্ণনা দেওয়া সম্ভব। এখানে হাজার বছর তো রূপক অর্থে ব্যবহৃত। পৃথিবীর ভোগ-বিলাস, গৌরবোজ্জ্বল অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ সবই বেমানান।

কেননা কবির কাছে একমাত্র সুখ উপলব্ধ হয়েছে তার প্রেয়সীর উপস্থিতিতে। কবিকে পৃথিবীর উল্লাস, ভ্রমণ আনন্দ কোনো কিছুই ছুঁতে পারেনি কেবল নিবেদিত হৃদয়ের নারীর দেওয়া সুখ ছাড়া। এ উদ্দীপনা কেবল কোনো নারীর উপস্থিতিতেই হওয়া সম্ভব। যুগ যুগ ধরে আসা গল্পে, ছন্দে, রন্ধ্রে শুধু নারীদের সৌন্দর্য বর্ণনায় উপমা ব্যবহার করা হয়েছে, কোনো পুরুষের নয়। যা বনলতা সেন কবিতায়ও যথার্থ। রইলো বাকি নাটোরের বনলতা। এখানে বনলতার সাথে দেখা হওয়া বাস্তব হলেও নাটোরের বাস্তবতা কাল্পনিক।

সংগ্রামী কিংবা অজস্র বেদনায় জর্জরিত অস্থির জীবন দীর্ঘ এক সময়েরই সমতুল্য। তাই কবি তার জীবনকে হাজার বছরের সাথে তুলনা করেন। কবি সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। তিনি বিম্বিসার ও আশোক এই দুই রাজার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী হলেও তার ক্লান্তিকর পথচলা সুখকর হয়নি। তিনি অতিবাহিত সময়কে দীর্ঘস্থায়ীই মনে করতেন। সংগ্রামী, দুঃখময় জীবনই কেবল দীর্ঘ মনে হয়, সুখ তো চোখের পলকে উল্টে যায়। কবি পথের দূরত্ব ও সময়ের ব্যপ্তির বর্ণনা করতে বিদর্ভ নগর ভ্রমণের কথাও উল্লেখ করেন।

ভ্রমণের উল্লাস, গৌরবময় ইতিহাস কোনো কিছুই তার মনে ব্যাকুলতা সৃষ্টি করতে পারেনি। কবির জীবনটা যেন ছিল অস্থির এক আলোড়নে বেষ্টিত। সেই উত্তাল, অস্থির জীবনে দু-দণ্ড শান্তি নিয়ে এসেছিল নাটরের বনলতা। যে ছিল কবির জীবনে শান্তির ছায়া।

আশ্রয় দাত্রী প্রশান্তময় বনলতার সৌন্দর্যকে কবি বিভিন্ন উপমায় আখ্যায়িত করেন। কবি তার চুলকে বিদিশা নগরের অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতের সাথে তুলনা করেন। কবি শ্রাবস্তীর নিখুঁত কারুকার্য বনলতার মুখাবয়বের উপমা হিসেবে ব্যবহার করেন। বনলতার এই বর্ণনা যেন সৌন্দর্যের নয়; বরং তা কবির হৃদয়ের প্রশান্ত সরল অনুভূতি ব্যক্ত করেছে।

বনলতার সঙ্গে কবির সাক্ষাত যেমন পথ হারিয়ে দিশেহারা নাবিক দ্বীপের সন্ধান খুঁজে পায় ঠিক তেমন। এ যেন অন্ধকার জগতে হঠাৎ আলোর দেখা পাওয়ার ন্যায়।

বনলতার চোখ যেন পাখির নীড়ের ন্যায়, যেখানে নিরাপদ আপন ঠিকানায় পাখিরা ফিরে আসে। ঠিক তেমনই এক ভরসাযোগ্য আঁখিজোড়া কবিকে প্রশ্ন করলো, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ যেন অধির আগ্রহে বনলতা তার অপেক্ষায় ছিল। বনলতার এ প্রশ্নে কবির প্রতি থাকা পরম স্নিগ্ধতা, ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

কবিতার শেষাংশ কবি দিনের শেষে নিস্তব্ধ আবহে প্রশান্তিময় শিশির নামে, ক্লান্ত পাখিরা শ্রান্ত হয় তখন। পৃথিবীর সব জাঁকজমক যখন অন্ধকারে মিলিয়ে আসে; তখনই গল্প লেখার আসর জমে ওঠে। সেই তালে মেতে ওঠে জোনাকিরা। পাখিরা নীড়ে ফেরে, নদীর গতি স্তব্ধতায় রূপ নেয়। জীবনের সব দেনা-পাওনা দিনের আলোয় মিটে যায়। ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’। সারাদিনের সব ক্লান্তি, সব কর্মব্যস্ততার সমাপ্তির ফলে একটু প্রশান্তি লাভ হয় যখন বনলতার মুখোমুখি হয়।

জীবনের প্রতিটা অংশ পরিশ্রমী, সংগ্রামী, ক্লান্তির হলেও সবাই নীড়ে ফেরে এক চিলতে শান্তির আকাঙ্ক্ষায়। সেই প্রশান্তিই কবি তার পাড়ি দেওয়া এক দীর্ঘ ভ্রমণে, গৌরবময় ইতিহাসে কোথাও খুঁজে পাননি। যা তিনি বনলতার কাছে খুঁজে পেয়েছেন। ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি সেই বনলতার কাছে পাওয়া তৃপ্ত সুখই পাঠকের মনে মুগ্ধতা ছড়িয়ে চলেছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow