ববি শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট বাড়লেও নেই সেবার ব্যবস্থা

* ছয় বছরে ৮ আত্মহত্যা, চেষ্টা ১৬ * নেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলিং ব্যবস্থা* মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর দাবি উচ্চশিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা। গত ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও অন্তত ১৬ জন শিক্ষার্থী। এসব ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানসিক অবসাদ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার প্রভাবে। তবে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পূর্ণাঙ্গ কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আরও পড়ুন যেভাবে চলছে পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসা স্

ববি শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট বাড়লেও নেই সেবার ব্যবস্থা

* ছয় বছরে ৮ আত্মহত্যা, চেষ্টা ১৬
* নেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলিং ব্যবস্থা
* মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর দাবি

উচ্চশিক্ষা শুধু জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও মানসিক বিকাশেরও গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা ও আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা।

গত ছয় বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন আরও অন্তত ১৬ জন শিক্ষার্থী। এসব ঘটনার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মানসিক অবসাদ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার প্রভাবে। তবে শিক্ষার্থীদের মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ীভাবে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পূর্ণাঙ্গ কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

স্থায়ী বিশেষজ্ঞের অভাবে সীমিত সেবা

২০২৪ সালে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি কাউন্সেলিং অ্যান্ড গাইডেন্স সেন্টার চালু করা হলেও সেখানে এখন পর্যন্ত স্থায়ী জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় ও নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মানসিক সংকটে পড়লে কোথায় যেতে হবে বা কার কাছ থেকে সহায়তা নেওয়া যাবে সে বিষয়ে অধিকাংশই অবগত নন। আবার অনেকে সামাজিক সংকোচ কিংবা পারিবারিক চাপে নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যক্তিগত সংকট, পারিবারিক অশান্তি, প্রেম-সম্পর্কের জটিলতা, অর্থনৈতিক চাপ, একাডেমিক অনিশ্চয়তা এবং চাকরি নিয়ে উদ্বেগ এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন। পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। 

সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী নগরীর একটি বাসা থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার হন। চার দিন নিখোঁজ থাকার পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক নানা সমস্যায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। 

এর আগে ২০২৪ সালের ৮ জানুয়ারি বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শুভ বৈরাগী আত্মহত্যা করেন। একই বছর পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অপর্ণা দাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী বৃষ্টি সরকার, স্নাতকোত্তরের দেবশ্রী রায় এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী শেফা নূর আত্মহত্যা করেন। 

২০২৩ সালের ১৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি ছাত্রীনিবাসে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিন নিগার বৃষ্টি উদ্ধার হন। একই বছরের ৯ আগস্ট নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া দাস। 

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আত্মহত্যার চেষ্টা করা শিক্ষার্থীদের অনেকের ক্ষেত্রেই পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিলতা, ব্যক্তিগত হতাশা ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপের বিষয়টি সামনে এসেছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ব্যক্তিগত বা মানসিক সংকটে পড়লেও অনেকেই কোথায় সহায়তা পাবেন, তা জানেন না। আবার সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিজের সমস্যার কথা প্রকাশ করতেও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক চাপ, সব মিলিয়ে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু এসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলার মতো নিরাপদ পরিবেশ খুব একটা নেই। কাউন্সেলিং সেবা আরও কার্যকর হলে অনেকেই উপকৃত হতেন। 

ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, অনেক সময় বন্ধুরাই বুঝতে পারে কেউ মানসিকভাবে ভালো নেই। কিন্তু কীভাবে তাকে সহযোগিতা করতে হবে, সে বিষয়ে আমাদেরও কোনো প্রশিক্ষণ বা ধারণা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি দরকার।

ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, কাউন্সেলিং সেন্টার চালু হয়েছে, তবে সেখানে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী সেবা নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ এখন সময়ের দাবি। 

সাংবাদিকতা বিভাগের মেহরাব হোসেন বলেন, মানসিক সংকটকে এখনো অনেকেই নেতিবাচক ভাবেন। কেউ কাউন্সেলিং নিতে চাইলে তাকে নানা ধরনের মন্তব্য শুনতে হয়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন জরুরি।

শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মশালা, সহজে কাউন্সেলিং পাওয়ার সুযোগ, জরুরি মানসিক সহায়তা সেবা এবং বিভাগভিত্তিক পরামর্শ কার্যক্রম চালু করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থা বাড়বে এবং সংকটের সময় তারা দ্রুত সহায়তা নিতে উৎসাহিত হবে।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ইউজিসিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা কমিয়ে আনতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, সমাজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোরও বিকল্প নেই। 

কাউন্সেলিং সেবা আরও কার্যকর করার দাবি

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনেকেই মনে করেন, বর্তমান কাউন্সেলিং সেন্টারকে আরও কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে। শুধু একটি সেন্টার চালু করলেই হবে না, সেখানে নিয়মিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর এবং সংকটকালীন সহায়তা (ক্রাইসিস রেসপন্স) নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, গোপনীয় কাউন্সেলিং ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো সহায়তা পেতে পারেন। 

এফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow