বসরা নগরীর গোড়াপত্তন করেন যে সাহাবি

ইরাকের দক্ষিণপ্রান্তে শাতুল আরব নদীর ধারে গড়ে ওঠা বসরা নগরী আজ মুসলিম ইতিহাস, জ্ঞানচর্চা ও বাণিজ্যের এক প্রাচীন স্মারক। এ নগরীর সূচনা কোনো রাজকীয় পরিকল্পনার অংশ নয়, বরং এটি ইসলামের প্রথম যুগের এক সাহসী সামরিক-সভ্যতা নির্মাণের অংশ। বসরা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি হজরত উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)। তার হাতে গড়ে ওঠে ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকের এ গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র। দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামল ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের দ্রুত বিস্তারের যুগ। পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয়ের ফলে নতুন ভূখণ্ড শাসন ও নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে হিজরি ১৪ সনে (খ্রিষ্টাব্দ আনুমানিক ৬৩৫) খলিফা ওমর (রা.) ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল, একদিকে পারস্যের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা, অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর জন্য একটি স্থায়ী ঘাঁটি ও বসতি গড়ে তোলা। এ গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় হজরত উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)-এর ওপর। উতবা (রা.) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর প্রথম যুগের সাহাবিদের একজন। তিনি ছিলেন জুহদ ও তাকওয়ার প্রতীক, অথচ একই সঙ্গে সাহ

বসরা নগরীর গোড়াপত্তন করেন যে সাহাবি

ইরাকের দক্ষিণপ্রান্তে শাতুল আরব নদীর ধারে গড়ে ওঠা বসরা নগরী আজ মুসলিম ইতিহাস, জ্ঞানচর্চা ও বাণিজ্যের এক প্রাচীন স্মারক। এ নগরীর সূচনা কোনো রাজকীয় পরিকল্পনার অংশ নয়, বরং এটি ইসলামের প্রথম যুগের এক সাহসী সামরিক-সভ্যতা নির্মাণের অংশ। বসরা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি হজরত উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)। তার হাতে গড়ে ওঠে ইসলামী ইতিহাসের প্রথম দিকের এ গুরুত্বপূর্ণ নগরকেন্দ্র।

দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামল ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের দ্রুত বিস্তারের যুগ। পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক বিজয়ের ফলে নতুন ভূখণ্ড শাসন ও নিরাপত্তার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ প্রেক্ষাপটে হিজরি ১৪ সনে (খ্রিষ্টাব্দ আনুমানিক ৬৩৫) খলিফা ওমর (রা.) ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। উদ্দেশ্য ছিল, একদিকে পারস্যের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করা, অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর জন্য একটি স্থায়ী ঘাঁটি ও বসতি গড়ে তোলা। এ গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয় হজরত উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.)-এর ওপর।

উতবা (রা.) ছিলেন নবীজি (সা.)-এর প্রথম যুগের সাহাবিদের একজন। তিনি ছিলেন জুহদ ও তাকওয়ার প্রতীক, অথচ একই সঙ্গে সাহসী সেনানায়ক। খলিফার নির্দেশ পেয়ে তিনি একটি ছোট বাহিনী নিয়ে ইরাকের দক্ষিণে অগ্রসর হন। যে স্থানটি তিনি নির্বাচন করেন, তা ছিল মূলত জলাভূমি, খেজুরবন ও অনাবাদি ভূমির সমষ্টিÑপারস্যদের দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন এক অঞ্চল। কিন্তু কৌশলগত দিক থেকে এটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: নদীপথে যোগাযোগ সহজ, খাদ্য সরবরাহ সম্ভব এবং শত্রুর জন্য প্রতিরক্ষা দুরূহ।

প্রথমে সেখানে কোনো নগরী ছিল না। উতবা (রা.) ও তার সঙ্গীরা খেজুরপাতা, কাদা ও বাঁশ দিয়ে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেন। তাঁবুনির্ভর এ সামরিক বসতিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় স্থায়ী জনপদে। তিনি সর্বপ্রথম একটি মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দেন। কারণ, ইসলামী নগর পরিকল্পনায় মসজিদই ছিল কেন্দ্র। সেই মসজিদ ঘিরেই গড়ে ওঠে বসরা নগরীর প্রাথমিক কাঠামো। মসজিদটি শুধু নামাজের স্থান ছিল না; এটি ছিল প্রশাসন, বিচার ও শিক্ষার কেন্দ্র।

হজরত উতবা (রা.) নগর নির্মাণে বিলাসিতা বা অহংকারের সুযোগ দেননি। তিনি চাইতেন, মুসলমানরা যেন জয়ের নেশায় আত্মভোলা না হয়ে পড়ে। তার এক বিখ্যাত খুতবায় তিনি বলেন, ‘তোমরা জানো, আমাদের দুনিয়ার জন্য পাঠানো হইনি; পাঠানো হয়েছে আখিরাতের জন্য। দুনিয়া আমাদের কাছে পরীক্ষা ছাড়া কিছু নয়।’ এ দৃষ্টিভঙ্গিই বসরার চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বসরা শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং বাণিজ্য, জ্ঞানচর্চা ও দাওয়াহর কেন্দ্র হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে এখানে জন্ম নেন হাসান বসরি (রহ.)-এর মতো মনীষীরা; গড়ে ওঠে আরবি ব্যাকরণ, তাফসির ও তাসাউফের গুরুত্বপূর্ণ ধারা।

দুঃখজনকভাবে, বসরা প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পরই হজরত উতবা ইবনে গাজওয়ান (রা.) ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই কাঁচা মাটির নগরীই পরবর্তীকালে রূপ নেয় ইসলামী সভ্যতার এক দীপ্তিমান কেন্দ্র হিসেবে। বসরা প্রমাণ করে, একটি নগরী শুধু ইট-পাথরে নয়, বরং নিয়ত, আদর্শ ও তাকওয়ার ওপর দাঁড়ালেই ইতিহাসে অমর হয়ে ওঠে।

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow