বাংলাদেশ তুমি কার

এই প্রশ্নটি কোনো আবেগী উচ্চারণ নয়। এটি একটি নৈতিক জিজ্ঞাসা। এটি ক্ষমতার প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন। এটি রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, প্রশাসন, ভাষা, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিকে একসঙ্গে দাঁড় করায় জবাবদিহির কাঠগড়ায়। বাংলাদেশ কার? চাঁদাবাজদের? কোনো পরিবারের? কোনো স্বৈরশাসকের? ক্ষমতাসীনদের? দলীয় কাঠামোর? কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের? প্রশাসনিক সুবিধাভোগীদের? নাকি সেই জনগণের, যারা রক্ত দিয়ে এই রাষ্ট্র তৈরি করেছে? উত্তরটি সরল। বাংলাদেশ জনগণের। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এই সরল সত্য কথাগুলো আজ সবচেয়ে বেশি বিকৃত। সাম্প্রতিক নির্বাচনকে আমি কেবল সরকার পরিবর্তন হিসেবে দেখি না। এটি ছিল বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এটি ছিল নীরব অপমানের বিরুদ্ধে জবাব। এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি, ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান। এই নির্বাচন ছিল একটি গণরায়। বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণরায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণরায়। একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণরায়। পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণরায়। দলীয় দখলদারির বিরুদ্ধে গণরায়। অদৃশ্য সুবিধাভোগী চক্রের বিরুদ্ধে গণরায়। ছাত্ররা কোটা-বিরোধ

বাংলাদেশ তুমি কার

এই প্রশ্নটি কোনো আবেগী উচ্চারণ নয়। এটি একটি নৈতিক জিজ্ঞাসা। এটি ক্ষমতার প্রতি ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন। এটি রাষ্ট্র, সরকার, সংবিধান, প্রশাসন, ভাষা, অর্থনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিকে একসঙ্গে দাঁড় করায় জবাবদিহির কাঠগড়ায়।
বাংলাদেশ কার?
চাঁদাবাজদের?
কোনো পরিবারের?
কোনো স্বৈরশাসকের?
ক্ষমতাসীনদের?
দলীয় কাঠামোর?
কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের?
প্রশাসনিক সুবিধাভোগীদের?
নাকি সেই জনগণের, যারা রক্ত দিয়ে এই রাষ্ট্র তৈরি করেছে?
উত্তরটি সরল।
বাংলাদেশ জনগণের।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে এই সরল সত্য কথাগুলো আজ সবচেয়ে বেশি বিকৃত।
সাম্প্রতিক নির্বাচনকে আমি কেবল সরকার পরিবর্তন হিসেবে দেখি না। এটি ছিল বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এটি ছিল নীরব অপমানের বিরুদ্ধে জবাব। এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি, ক্ষমতার এককেন্দ্রিকতা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট অবস্থান।
এই নির্বাচন ছিল একটি গণরায়।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে গণরায়।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণরায়।
একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণরায়।
পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণরায়।
দলীয় দখলদারির বিরুদ্ধে গণরায়।
অদৃশ্য সুবিধাভোগী চক্রের বিরুদ্ধে গণরায়।
ছাত্ররা কোটা-বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছে। তারা শুধু চাকরির কোটা নিয়ে কথা বলেনি, তারা রাষ্ট্রের ন্যায়বোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা সুদ, ঘুষ, চাঁদাবাজি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা বলেছে, রাষ্ট্র সবার, কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সেই সামাজিক চাপ, সেই নৈতিক উত্তাপ, সেই অবদমিত ক্ষোভের ভেতরেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জনগণ বিপুল ভোটে জুলাই সনদকে সমর্থন দিয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব দিয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটির ব্যবধানে জুলাই সনদ জয়ী হয়েছে, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। পরিষ্কার ম্যান্ডেট।
এটি শুধু সংখ্যা নয়।
এটি রাজনৈতিক সংকেত।
এটি নৈতিক ঘোষণা।
এটি পরিবর্তনের দাবি।
আমি স্পষ্ট করে বলি, জনগণ শুধু সরকার বদলায়নি। জনগণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর নির্দেশ দিয়েছে।
এই নির্দেশ মানা হবে, নাকি ব্যবস্থার ভেতরে গিলে ফেলা হবে, সেখানেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ সত্যিই জনগণের কি না।
গণভোট পেয়েও সন্দেহ কেন
এত বড় গণরায় পাওয়ার পরও যদি নেতৃত্বকে ভেতর থেকে ঠেকানোর চেষ্টা হয়, যদি প্রশাসনের অন্দরে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে, যদি অদৃশ্য করিডরে ফিসফাস শুরু হয়, যদি জোটের অংশীদাররা হিসাব কষতে বসে কে কত পেল, কে কত হারাল, কার প্রভাব বাড়ল, কার কমল, তাহলে আমাকে স্বীকার করতেই হয়, পুরোনো সংস্কৃতি এখনও মরেনি।
ক্ষমতা বদলালেই সংস্কৃতি বদলায় না। চেয়ার বদলালেই মানসিকতা বদলায় না।
ব্যবস্থা নিজের স্বার্থ রক্ষায় নীরবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
আমি সংবিধানের বিরুদ্ধে নই।
কিন্তু সংবিধান জনগণের উপরে নয়।
সংবিধান কোনো পবিত্র মূর্তি নয়, যা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে।
সংবিধান জনগণের ইচ্ছার লিখিত দলিল। জনগণই উৎস। জনগণই চূড়ান্ত বৈধতার ভিত্তি। জনগণই ক্ষমতার মালিক।
যদি আজ বলা হয় জনগণের চাওয়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, কারণ সংবিধান বাধা, তাহলে আমি সরাসরি প্রশ্ন করি:
নির্বাচন হলো কীভাবে?
ক্ষমতা হস্তান্তর হলো কীভাবে?
দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নির্বাচনে ভোট দিলো কেন?
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নন কেন?
যদি সংবিধানকে সর্বশেষ এবং অপরিবর্তনীয় ধরা হয়, কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর বা প্রযোজ্য না থাকে, তাহলে এই পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হলো?
সংবিধানকে ঢাল বানিয়ে স্থিতাবস্থা রক্ষা করা এখন বিপজ্জনক। কারণ তখন আইনের ভাষা ব্যবহার করে অন্যায়ের কাঠামো বাঁচিয়ে রাখা হবে।
আবার জনআবেগের নামে সংবিধান ভেঙে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করাও বিপজ্জনক। কারণ তখন নৈতিকতার নামে স্বেচ্ছাচার জন্ম নেবে।
আমি দুটোই প্রত্যাখ্যান করি।
কিন্তু সর্বোপরি আমার প্রশ্ন, এই সংবিধান-তত্ত্ব এখন হঠাৎ এত জোরে কেন উচ্চারিত হচ্ছে?
গণরায়ের পরেই কেন এই সতর্কতা?
জনগণের স্পষ্ট নির্দেশ আসার পরেই কেন সীমারেখার ব্যাখ্যা?
এখানেই সন্দেহ জন্মায়।
এখানেই মানুষ ভাবে, পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছিল?
আমি ভারসাম্য চাই।
আমি ন্যায় চাই।
আমি সাংবিধানিক পথেই পরিবর্তন চাই।
কিন্তু আমি অজুহাত চাই না।
প্রতীক বদল, নাকি কাঠামো অক্ষত
প্রচারণায় বলা হয়েছিল প্লট নেওয়া হবে না। ফ্ল্যাট নেওয়া হবে না। ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি নেওয়া হবে না। গাড়ির বহর কমানো হবে। রাস্তা বন্ধ করা হবে না।
আমি এসব প্রতিশ্রুতিকে হালকা করে দেখি না। এগুলো রাজনৈতিক ভোগবাদ কমানোর প্রতীক। এগুলো দেখায় ক্ষমতার বাহ্যিক চাকচিক্য কমানোর ইচ্ছা। কিন্তু রাষ্ট্রের সংকট বাহ্যিক নয়, ভেতরের। প্রশ্ন হলো, প্রতীক বদলালেই কি কাঠামো বদলায়?
দুর্নীতির নেটওয়ার্ক কি ভেঙেছে?
প্রশাসনিক স্বার্থগোষ্ঠী কি দুর্বল হয়েছে?
আইন প্রয়োগে বৈষম্য কি কমেছে?
চাঁদাবাজির রুট কি বন্ধ হয়েছে?
প্রতীক বদলানো সহজ।
কাঠামো ভাঙা কঠিন।
আর ঠিক এখানেই আমার উদ্বেগ শুরু হয়।
যখন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমন মন্তব্য করেন, যা পরিবহন খাতে সংগৃহীত অর্থকে বোঝাপড়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করার ইঙ্গিত দেয়, তখন বিষয়টি আর কেবল শব্দচয়ন থাকে না। তখন সেটি হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংকেত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এই মন্তব্যকে গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে চিহ্নিত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, কারণ এমন ভাষা দুর্নীতির সংস্কৃতিকে বৈধতা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। একইভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এটিকে অনৈতিক ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে সমালোচনা করেছে।
আমি এখানে ব্যক্তি আক্রমণ করছি না। আমি রাজনৈতিক ভাষার দায় নিয়ে কথা বলছি। কারণ ক্ষমতাসীনদের প্রতিটি শব্দ প্রশাসনের ভেতরে বার্তা পাঠায়। যদি অপরাধকে নরম ভাষায় বর্ণনা করা হয়, যদি চাঁদাবাজিকে বোঝাপড়ার অংশ হিসেবে দেখানো হয়, তাহলে মাঠপর্যায়ে সেটি নৈতিক লাইসেন্সে পরিণত হয়।
জনগণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। জনগণ চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে। সেখানে চাঁদাবাজিকে ভাষাগতভাবে হালাল করার ইঙ্গিত জনগণের ম্যান্ডেটের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
এটি হয়তো সরাসরি বেইমানি নয়।
কিন্তু এটি বেইমানির দরজা খুলে দেয়।
আমি প্রতীকী পরিবর্তন চাই না। আমি কাঠামোগত পরিবর্তন চাই।
আমি ভোগবাদ কমানো চাই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা।
কথার ভেতরে যদি আপস থাকে, তাহলে ব্যবস্থার ভেতরে প্রতিরোধ জন্ম নেয়।
আর আমি সেই প্রতিরোধকে বৈধতা দিতে রাজি নই।
প্রশাসনিক রদবদল ও সামরিক নেতৃত্ব: পুনর্গঠন, নাকি পুনর্বিন্যাস
নতুন সরকার গঠনের পরপরই সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে। চিফ অব জেনারেল স্টাফ, প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের নেতৃত্বে রদবদল হয়েছে। পুরোনো কর্মকর্তাদের কেউ কেউ কূটনৈতিক দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে।
সরকারের এখতিয়ার আছে। সংবিধান সরকারকে এই ক্ষমতা দিয়েছে। প্রশাসনিক রদবদল অস্বাভাবিক নয়। নতুন সরকার নিজের অগ্রাধিকার অনুযায়ী টিম সাজাবে, সেটাই স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন থামে না।
সময়কাল গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবর্তনের পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ।
গতি গুরুত্বপূর্ণ।
যখন শীর্ষ পর্যায়ে একসঙ্গে দ্রুত ও ব্যাপক রদবদল ঘটে, তখন জনগণের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে। এটি কি নীতিগত পুনর্গঠন, নাকি আনুগত্যভিত্তিক পুনর্বিন্যাস?
এটি কি পেশাগত দক্ষতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত?
নাকি রাজনৈতিক আস্থার ভিত্তিতে অবস্থান বিন্যাস?
আমি সন্দেহ ছড়াতে চাই না। কিন্তু প্রশ্নকে দমনও করতে চাই না। কারণ সামরিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান কোনো দলের নয়। এগুলো রাষ্ট্রের। এগুলো জনগণের করের টাকায় পরিচালিত কাঠামো।
যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত থাকে। কারণ একবার যদি আনুগত্য প্রতিষ্ঠানগত নীতির জায়গা দখল করে নেয়, তখন পেশাদারিত্ব ক্ষয় হতে শুরু করে। আর পেশাদারিত্ব ক্ষয় মানেই গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হওয়া।
প্রতিষ্ঠানের শক্তি নির্ভর করে তার নিরপেক্ষতার উপর।
দল বদলালে যদি আনুগত্যের মানদণ্ড বদলায়, তাহলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়।
আমি চাই না প্রশাসন হোক ক্ষমতার হাতিয়ার।
আমি চাই না সেনাবাহিনী হোক রাজনৈতিক আস্থার তালিকাভুক্ত কাঠামো।
আমি চাই প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হোক, ব্যক্তি নয়।
নীতি প্রাধান্য পাক, আনুগত্য নয়।
নচেৎ গণতন্ত্রের বাহ্যিক কাঠামো অক্ষত থাকলেও, ভেতরের মেরুদণ্ড ধীরে ধীরে নরম হয়ে যাবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- কোন ভিত্তিতে নির্বাচন হলো এবং কোন ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচন বৈধ হলো আর কোন ভিত্তিতে গণভোট অবৈধ ঘোষণা করা হলো বিএনপির পক্ষ থেকে?
হঠাৎ কেন এমন কথা, ভাষা: ১৯৫২-এর চেতনা বিকৃত করা যাবে না?
২১ ফেব্রুয়ারি ছিল রাষ্ট্রভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
এটি ভাষার বৈচিত্র্য নিষিদ্ধ করার আন্দোলন ছিল না।
বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা। আমাদের গর্ব। আমাদের আত্মপরিচয়।
কিন্তু বাংলাদেশ বহুভাষিক বাস্তবতায় বাঁচে।
আরবি কোরআনের ভাষা।
সংস্কৃত হিন্দু আচার-অনুষ্ঠানের ভাষা।
পালি বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ভাষা।
উর্দু ও ফার্সি ধর্মীয় ঐতিহ্যে আছে।
ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা।
প্রবাসে থাকা কোটি মানুষের জীবনে বহু ভাষা স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।
আমি স্পষ্ট করে বলি, বাংলা প্রতিষ্ঠা মানে অন্য ভাষাকে সন্দেহের চোখে দেখা নয়।
ভাষাকে যদি রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাইয়ের অস্ত্র বানানো হয়, তাহলে তা ৫২-এর চেতনার বিকৃতি।
ভারতের প্রভাবের প্রশ্ন এবং বৃহৎ শক্তির ভূমিকা
সার্বভৌম সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মানদণ্ড
আমি আবেগ দিয়ে ভারতবিরোধিতা করি না।
কিন্তু অন্ধ আনুগত্যও মেনে নিই না।
ভারত তার স্বার্থ দেখবে।
যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশল দেখবে।
চীন তার প্রভাব বাড়াতে চাইবে।
প্রশ্ন একটাই।
বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থকে প্রথমে রাখছে?
বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের স্বার্থ নতুন কিছু নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতা, দীর্ঘ সীমান্ত, অভিন্ন নদী ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক সংযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা, নিরাপত্তা সমন্বয়, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক সংযোগ-সবকিছুতেই ভারতের কৌশলগত আগ্রহ থাকবে। এটি অস্বাভাবিক নয়, বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম।
বাংলাদেশ ভারতের জন্য শুধু প্রতিবেশী নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগোলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্য রুট এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা-এসব কারণে বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাই দিল্লি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা নীতি এবং অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনায় আগ্রহী হবে, এটাই বাস্তবতা।
কিন্তু বাস্তবতা মানেই অধীনতা নয়।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে একটি বড় ভূরাজনৈতিক শক্তি। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, চীনের প্রভাব মোকাবিলা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রশ্ন-এসব ইস্যুতে ওয়াশিংটনের আগ্রহ সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের নির্বাচন, মানবাধিকার পরিস্থিতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা বা সামুদ্রিক নীতির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনও পিছিয়ে নেই। অবকাঠামো বিনিয়োগ, বন্দর উন্নয়ন, জ্বালানি প্রকল্প, শিল্পায়ন-এসবের মাধ্যমে বেইজিং দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াতে চায়। অর্থনৈতিক প্রস্তাব আকর্ষণীয় হতে পারে, কিন্তু তার কৌশলগত মূল্যও আছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন এমন এক ভূরাজনৈতিক বিন্দুতে দাঁড়িয়ে, যেখানে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন-তিন শক্তিই নিজেদের স্বার্থের হিসাব করছে।
কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখানেই।
বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কার?
যদি অর্থনৈতিক চুক্তি হয়, তা স্বচ্ছ হবে।
যদি জ্বালানি সমঝোতা হয়, তা জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে হবে।
যদি নিরাপত্তা সহযোগিতা হয়, তা সার্বভৌম নীতির ভেতরে থাকবে।
বিদেশনীতি কখনো আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না। আবার তা আত্মসমর্পণের দলিলও হতে পারে না।
আমি ভারতবিরোধী আবেগ চাই না।
আমি অন্ধ আনুগত্যও চাই না।
প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা হবে, কিন্তু মাথা নত করে নয়।
বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক হবে, কিন্তু আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।
ভারত তার স্বার্থ দেখবে।
যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ দেখবে।
চীন তার প্রভাব বাড়াতে চাইবে।
এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম।
কিন্তু বাংলাদেশ কি তার নিজের স্বার্থকে সর্বাগ্রে রাখছে?
এখানেই রাষ্ট্রের পরিপক্বতার পরীক্ষা।
এই দেশ কারও বাপের সম্পত্তি নয়।
এটি কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয় নয়।
এটি কোনো বৈশ্বিক শক্তির পরীক্ষাগারও নয়।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। জনগণ রক্ত দিয়ে সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে। স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা নয়, একটি মানসিক অবস্থান।
যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তাকে মনে রাখতে হবে,
বিদেশনীতি কৌশলগত হতে পারে,
কিন্তু আত্মসম্মান আপসযোগ্য নয়।
সহযোগিতা হবে, নির্ভরশীলতা নয়।
সম্পর্ক হবে, সমর্পণ নয়।
সমন্বয় হবে, অধীনতা নয়।
বাংলাদেশের মাটি, নদী, আকাশ-এগুলো শুধু ভৌগোলিক উপাদান নয়। এগুলো আত্মপরিচয়, সংগ্রাম, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের প্রতীক।
আর আত্মপরিচয় কখনো অনুমতিতে টিকে থাকে না।
এটি টিকে থাকে নিজের শক্তিতে, নিজের নীতিতে, নিজের সিদ্ধান্তে।
জোট রাজনীতি ও ক্ষমতার ভেতরের ভয়
সংসদের ভেতরে এখন এক ধরনের নীরব টানাপোড়েন কাজ করছে।
কেউ ভাবছে, ব্যক্তিগত সুবিধা কমে গেলে আমার লাভ কোথায়?
কেউ ভাবছে, বড় দল যদি সফল হয়, তাহলে আমাদের ছোট দলের ভবিষ্যৎ কী হবে?
এই ধরনের ভাবনা স্বাভাবিক, তবে তা রাজনৈতিক নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সমস্যা সৃষ্টি করে।
নৈতিক প্রতিযোগিতা স্বাগত, এটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের চাবিকাঠি।
কিন্তু যদি রাজনীতি শুধুই সুবিধা হারানোর ভয় আর স্বার্থের প্রতিযোগিতার আশ্রয়ে গড়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
ক্ষমতা যদি শুধুই প্রতীক বা সুবিধার খেলা হয়ে যায়, তাহলে ভোটের মানে হারিয়ে যায় এবং জনগণের আস্থা কমে যায়।
এই টানাপোড়েনকে ধরে রাখার একমাত্র সঠিক উপায়, এটি নৈতিক প্রতিযোগিতার টানাপোড়েন হতে হবে, ক্ষমতার লোভের টানাপোড়েন নয়।
জনগণের জন্য ক্ষমতা সেবার হাতিয়ার, ব্যক্তিগত স্বার্থের নয়।
যখন নেতা এই নীতিকে মানবে, তখনই সংসদ এবং জোট রাজনীতি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল হবে।
নৈতিক সাহসের উদাহরণ
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
ড. ইউনূস দেখিয়েছেন, নৈতিক অবস্থান শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীকেও চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, টাকা আর পেশিশক্তি ছাড়া রাজনীতি সম্ভব।
কিন্তু সেই বিশ্বাসকে নীতিতে রূপ দিতে হবে।
শেষ কথা: সমর্থন আছে, কিন্তু শর্তহীন নয়
আমি সমর্থন করি।
কিন্তু এটি কখনো শর্তহীন নয়।
সমালোচনা থাকবে।
জবাবদিহি থাকবে।
জুলাইয়ের যোদ্ধারা যে নৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছেন, তা ক্ষমতার লোভের টানাপোড়েন নয়।
তা পরিবর্তনের টানাপোড়েন, ন্যায়ের টানাপোড়েন, দেশপ্রেমের টানাপোড়েন।
আমি চাই সেই টানাপোড়েন বেঁচে থাকুক, শক্তিশালী হোক, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তার প্রভাব পৌঁছাক।
বাংলাদেশ কোনো দলের সম্পত্তি নয়।
বাংলাদেশ কোনো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বলয় নয়।
বাংলাদেশ কোনো বৈশ্বিক পরীক্ষাগার নয়।
বাংলাদেশ শুধু জনগণের।
সার্বভৌমত্বের প্রতিটি ইঞ্চি, স্বাধীনতার প্রতিটি শ্বাস, সবই তাদের।
এখন সময় এসেছে প্রমাণের।
সমর্থন দিয়ে শেষ নয়, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে দায়িত্বও নেওয়ার সময়।
দেশটি আমাদের, জনগণ আমাদের।
এবার দেখানোর সময়, আমরা কতদূর এই টানাপোড়েনকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।

রহমান মৃধা, গবেষক ও লেখক, প্রাক্তন পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow