বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সম্পদ কর : ন্যায্যতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন

উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন সরকার যখন নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজছে, তখন ধনী নাগরিকদের ওপর সম্পদ কর আরোপের ধারণাটি বারবার জনআলোচনায় ফিরে আসে। সমর্থকদের মতে, এই কর বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এই প্রস্তাব একটি গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্নও উত্থাপন করে: সরকার কি ইউরোপীয় ধাঁচের কর আদায় করতে পারে, যখন তারা ইউরোপীয় মানের জনসেবা দিতে ব্যর্থ? অনেক ধনী নাগরিকের কাছে বিষয়টি শুধু বেশি কর দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং তারা বিনিময়ে কী পাচ্ছেন, সেটিই মূল প্রশ্ন। উন্নত অর্থনীতিগুলোতে উচ্চ কর সাধারণত একটি বিস্তৃত সামাজিক চুক্তির অংশ। নাগরিকরা তুলনামূলক বেশি কর দিলেও বিনিময়ে তারা সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, গণপরিবহন এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পান। নরওয়ে বা সুইডেনের মতো দেশে করদাতারা স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন তাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল দেশে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সচ্ছল পরিবারগুলো প্রায়ই এমন অনেক সেবার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যা সরকার পর্যাপ্তভ

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সম্পদ কর : ন্যায্যতা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রশ্ন

উন্নয়নশীল বিশ্বের বিভিন্ন সরকার যখন নতুন রাজস্ব উৎস খুঁজছে, তখন ধনী নাগরিকদের ওপর সম্পদ কর আরোপের ধারণাটি বারবার জনআলোচনায় ফিরে আসে। সমর্থকদের মতে, এই কর বৈষম্য কমাতে এবং সামাজিক খাতে সরকারি ব্যয় বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে অনেক উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এই প্রস্তাব একটি গভীর ও অস্বস্তিকর প্রশ্নও উত্থাপন করে: সরকার কি ইউরোপীয় ধাঁচের কর আদায় করতে পারে, যখন তারা ইউরোপীয় মানের জনসেবা দিতে ব্যর্থ?

অনেক ধনী নাগরিকের কাছে বিষয়টি শুধু বেশি কর দেওয়ার প্রশ্ন নয়; বরং তারা বিনিময়ে কী পাচ্ছেন, সেটিই মূল প্রশ্ন।

উন্নত অর্থনীতিগুলোতে উচ্চ কর সাধারণত একটি বিস্তৃত সামাজিক চুক্তির অংশ। নাগরিকরা তুলনামূলক বেশি কর দিলেও বিনিময়ে তারা সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, গণপরিবহন এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পান। নরওয়ে বা সুইডেনের মতো দেশে করদাতারা স্পষ্টভাবে দেখতে পারেন তাদের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে।

কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল দেশে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সচ্ছল পরিবারগুলো প্রায়ই এমন অনেক সেবার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে, যা সরকার পর্যাপ্তভাবে দিতে সক্ষম নয়। শিক্ষাখাত এর অন্যতম উদাহরণ। বহু ধনী পরিবার সন্তানদের ব্যয়বহুল বেসরকারি স্কুলে পড়ান বা বিদেশে পাঠান, কারণ তারা মনে করেন স্থানীয় সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে পারছে না। অর্থাৎ, উন্নত দেশের নাগরিকরা যেসব সুবিধা রাষ্ট্রের মাধ্যমে পেয়ে থাকেন, উন্নয়নশীল দেশের অনেক ধনী পরিবার সেগুলোর খরচ নিজেরাই বহন করেন।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অনেক উন্নয়নশীল দেশের সরকারি হাসপাতাল অতিরিক্ত চাপ, অর্থসংকট এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। ফলে ধনী নাগরিকরা বেসরকারি হাসপাতাল, আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবীমা কিংবা বিদেশে চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাদের জন্য স্বাস্থ্যনিরাপত্তা রাষ্ট্রনির্ভর নয়; বরং ব্যক্তিগত ব্যয়নির্ভর।

এর ফলে উচ্চ আয়ের করদাতাদের মধ্যে একটি সাধারণ অনুভূতি তৈরি হয় যে তারা যেন “দ্বৈত বোঝা” বহন করছেন—একদিকে আয়কর, করপোরেট কর, ভ্যাট ও সম্পত্তি কর দিচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও ইউটিলিটির জন্য আবার ব্যক্তিগত খরচও বহন করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে সম্পদ করের প্রস্তাব অনেকের কাছে সামাজিক ন্যায়বিচার নয়; বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত শাস্তিমূলক আর্থিক চাপ হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যেখানে বিনিময়ে জনসেবার মানে কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই।

এছাড়া আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক উদ্বেগও রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সাধারণত উন্নত অর্থনীতির তুলনায় পুঁজি পাচারের ঝুঁকিতে বেশি থাকে। সম্পদ কর বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের বিদেশে সম্পদ স্থানান্তর, দেশীয় বিনিয়োগ কমিয়ে দেওয়া বা স্থায়ীভাবে আবাসন পরিবর্তনে উৎসাহিত করতে পারে। যেসব দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি পুঁজি গঠনের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে এ ধরনের পরিস্থিতি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সম্পদ কর কার্যকর করতে হলে জমি, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা, বিদেশি সম্পদ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কিন্তু যেসব দেশে আর্থিক স্বচ্ছতা সীমিত এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বড়, সেখানে কর বাস্তবায়ন অসম ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে। সমালোচকদের মতে, এতে দৃশ্যমান ও নিয়ম মেনে চলা করদাতারাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, অথচ গোপন সম্পদ প্রায়ই করের আওতার বাইরে থেকে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—করব্যবস্থা অনেকাংশেই জনআস্থার ওপর নির্ভরশীল। নাগরিকরা তখনই বেশি কর দিতে আগ্রহী হন, যখন তারা বিশ্বাস করেন সরকার দক্ষ, স্বচ্ছ এবং কার্যকরভাবে জনসেবা দিতে সক্ষম। কিন্তু যেখানে অবকাঠামোগত ঘাটতি, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বিদ্যমান, সেখানে উচ্চ কর সহজেই অন্যায্য বা জনস্বার্থবিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো ব্যক্তির হয়তো জমি বা সম্পত্তি আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নগদ অর্থ নেই। সে ক্ষেত্রে কি সরকার আশা করবে যে ব্যক্তি সম্পদ কর পরিশোধের জন্য তার সম্পত্তি বিক্রি করবেন? একই প্রশ্ন প্রযোজ্য অলাভজনক বা দীর্ঘদিন লভ্যাংশ দিতে অক্ষম পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রেও। কোনো ব্যক্তি হয়তো একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে নির্দিষ্ট পরিমাণ শেয়ারের মালিক, কিন্তু কোম্পানিটি বছরের পর বছর লভ্যাংশ দিতে পারছে না। তাহলে কি সরকার আশা করবে যে তিনি সম্পদ কর দিতে নিজের শেয়ারের একটি অংশ বিক্রি করবেন? এর ফলে একসময় তার শেয়ারধারণ নিয়ন্ত্রক ন্যূনতম সীমা—যেমন ২ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে, এবং তিনি পরিচালকের পদও হারাতে পারেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে বৈষম্যের বিষয়টি উপেক্ষা করা উচিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবশ্যই শক্তিশালী সরকারি অর্থব্যবস্থা এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু সম্পদ করের সমালোচকদের মতে, বিনিয়োগ ও সম্পদ সৃষ্টিকে নিরুৎসাহিত করতে পারে—এমন নীতি গ্রহণের আগে সরকারের উচিত শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জনসেবার মান উন্নত করা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ সম্প্রসারণে মনোযোগ দেওয়া।

শেষ পর্যন্ত বিতর্কটি একটি মৌলিক নীতির ওপর গিয়ে দাঁড়ায়: করদাতারা তখনই সম্পদ পুনর্বণ্টনমূলক নীতিকে সমর্থন করতে আগ্রহী হন, যখন তারা বিশ্বাস করেন রাষ্ট্র তাদের বিনিময়ে প্রকৃত মূল্য দিচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যতদিন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বমানের জনসেবা নিশ্চিত করতে না পারবে, ততদিন সম্পদ করের দাবি রাজনৈতিকভাবে বিভাজনমূলক এবং অর্থনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়েই থাকবে।

এর পরিবর্তে সরকারের উচিত প্রকৃত আয়ের ওপর করের স্তর (Tax Slab) ও সারচার্জ বৃদ্ধি করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow