১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মানচিত্রের বুক চিরে যে রক্তিম সূর্য উদিত হয়েছিল, তা কেবল একটি ভূখণ্ডের মুক্তি ছিল না, তা ছিল শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্য। পরাধীনতার অন্ধকার গহ্বর থেকে একটি জাতির উত্তরণ এবং বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সেই ইতিহাস আজ ২৬শে মার্চ ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। যখন আমরা আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণরেখা পেরিয়ে সাফল্যের শিখরে আরোহণ করছি, তখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে রোহিঙ্গা ও গাজাবাসীর আর্তনাদ আমাদের হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল তিল তিল করে গড়ে ওঠা এক ইস্পাতকঠিন নেতৃত্বের ফসল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সেই জাদুকরী বাঁশিওয়ালা, যার তর্জনীর ইশারায় কোটি বাঙালি ঘর ছেড়েছিল। বিপরীতে, আজকের গাজা বা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালে আমরা এক বিশাল নেতৃত্বশূন্যতা প্রত্যক্ষ করি। একটি জাতির মুক্তির জন্য যেমন এক লক্ষ্য প্রয়োজন, তেমনি সেই লক্ষ্য ছোঁয়ার জন্য প্রয়োজন একজন অবিসংবাদিত নেতা, যা বাঙালির ছিল কিšদ দুর্ভাগ্যের বিষয় এই দুই জনপদের তা অনুপস্থিত।
বাঙালির বিজয়ের অন্যতম ভিত্তি ছিল ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্য। ‘মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা’ এই চেতনা আমাদের এক সুতোয় বেঁধেছিল। অন্যদিকে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী তাদের নিজ দেশে পরবাসী, যাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়কে মুছে ফেলার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে যুগ যুগ ধরে। গাজাবাসীরাও যদিও আরবীয় ঐতিহ্যে ঋদ্ধ, কিন্তু ভূখণ্ডগত বিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা তাদের সেই আত্মিক ঐক্যকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের মানুষ যখন পাকিস্তানি জান্তার শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন কৃষক থেকে ছাত্র সবার
মনে ছিল একই সুর, একই রাগিনী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো প্রদানের ক্ষমতা সেদিন মার্কিন সপ্তম নৌবহরের হুমকিকে নসাৎ করে দিয়েছিল।
অথচ আজ গাজার আকাশে যখন বোমারু বিমানের গর্জন শোনা যায়, তখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো হয় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে, না হয় ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে আগ্রাসনকেই পরোক্ষ বৈধতা দেয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই দ্বিমুখী আচরণই গাজাবাসীর পরাধীনতাকে দীর্ঘায়িত করছে। রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি বিশ্বশক্তির কৌশলগত স্বার্থের কাছে মানবতা কীভাবে বন্দি হয়ে আছে।
ভারতের তৎকালীন সরকার ও জনগণের প্রতিবেশী সুলভ সহযোগিতা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে মিত্রবাহিনীর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল এক বিরল দৃষ্টান্ত। কিন্তু রোহিঙ্গা বা গাজাবাসীর ক্ষেত্রে বাস্তবতা বড়ই নির্মম।
তাদের প্রতিবেশীরা হয়তো মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক বা সামরিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো সেই অকৃত্রিম ‘মিত্র’ আজও অধরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডারদের রণকৌশল এবং প্রবাসী সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল সুসংগঠিত। একটি রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে নির্বাসনে থেকেও যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারে, তা বাংলাদেশ দেখিয়েছিল। অন্যদিকে, গাজায় শাসনতান্ত্রিক বিভাজন এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে কোনো শক্তিশালী প্রবাসী সরকার না থাকা তাদের আন্দোলনকে বিশ্বদরবারে জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে পারছে না।
বাঙালি জাতি যখন ১৯৭০-এর নির্বাচনে বিজয় লাভ করল, তখন সেই ম্যান্ডেট ছিল স্বাধীনতার আইনি ভিত্তি। গাজাবাসীর ক্ষেত্রে নির্বাচনের রায়কে বিশ্ব মোড়লরা মেনে নেয়নি, বরং তাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অবরোধ আরোপ করা হয়েছে। এই যে গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার অবজ্ঞা, এটিই গাজাবাসীকে পরাধীনতার জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। ভোটের অধিকার রক্ষায় বাঙালির আপসহীনতা ছিল আমাদের স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি।
‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলদান’ এই গানটি যেন বাঙালির প্রতিটি ঘরে অনুরণিত হতো। বাংলাদেশের মানুষ জানত, স্বাধীনতা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। গাজাবাসীও আজ অসীম সাহসে লড়াই করছে, কিšদ আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং অসম যুদ্ধ তাদের জয়কে বিলম্বিত করছে। ইসরায়েলের অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সামনে গাজার যুবকদের পাথর ছোঁড়া যেন ডেভিড ও গোলিয়াথের লড়াইয়ের এক আধুনিক সংস্করণ, যেখানে বৈশ্বিক সমীকরণ সবসময় গোলিয়াথের পক্ষেই থাকে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ট্র্যাজেডি হলো তাদের নিজ দেশেই ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে রাজাকার, আলবদররা যেমন দেশের ভেতর থেকে বিরোধিতা করেছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধেও তাদের দেশের ভেতরেই জাতিগত বিদ্বেষকে উসকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাঙালিরা তাদের অভ্যন্তরীণ শত্রুদের কোণঠাসা করতে পেরেছিল বলেই বিজয় দ্রুততর হয়েছিল।
গাজা ও রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে শত্রুর জাল অনেক বেশি বিস্তৃত ও সুগভীর। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের হাজার মাইলের দূরত্ব শত্রুর রসদ সরবরাহকে দুর্বল করে দিয়েছিল। কিন্তু গাজা আজ এক ‘উন্মুক্ত কারাগার’, যার চারপাশ জল-স্থল-অন্তরীক্ষ থেকে অবরুদ্ধ। এমন অবরুদ্ধ অবস্থায় একটি জাতির মুক্তি আন্দোলন চালানো যে কতটা দুরূহ, তা কেবল
গাজাবাসীই অনুভব করতে পারে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারা তাদের আদি ভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়ে আজ যাযাবরের জীবন যাপন করছে, যেখানে ভৌগোলিক কোনো সংহতি গড়ার সুযোগও তাদের দেওয়া হচ্ছে না।
সাংস্কৃতিক জাগরণই ছিল বাঙালির স্বাধীনতার প্রথম সোপান। ছায়ানটের বর্ষবরণ থেকে শুরু করে একুশের প্রভাতফেরি সবই ছিল পরাধীনতার বিরুদ্ধে নীরব বিপ্লব। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আজ মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। গাজাবাসীরা তাদের সংস্কৃতি ধরে রাখলেও যুদ্ধের ধ্বংসলীলা তাদের সৃজনশীলতাকে পিষ্ট করছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার নেপথ্যে মেধাবী নেতৃত্বের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত। তাজউদ্দীন আহমদের মতো দক্ষ প্রশাসক এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতো অবিচল ব্যক্তিত্বরা জানতেন কীভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ডিল করতে হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও দেখা যায়, মুসলিম উম্মাহর কার্যকর পদক্ষেপের চেয়ে গালভরা বুলিই বেশি।
১৯৭১ সালে বিশ্ব গণমাধ্যম ছিল বাংলাদেশের পাশে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের রিপোর্ট বা সাইমন ড্রিং-এর সাহসিকতা বিশ্বকে জানিয়েছিল পাকিস্তানের পৈশাচিক গণহত্যার কথা। গাজার গণহত্যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেলেও মূলধারার পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো ইসরায়েলি ভাষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিবেকের কাছে এক পুরনো ফাইল হয়ে পড়ে আছে।
বাঙালি শির উন্নত করতে পেরেছিল কারণ তারা মৃত্যুকে তুচ্ছ করেছিল। গাজাবাসীও মৃত্যুভয় জয় করেছে। কিšদ আধুনিক যুদ্ধ কেবল সাহস দিয়ে নয়, মেধা ও প্রযুক্তির সমন্বয় দিয়ে জিততে হয়। বাংলাদেশের সময়কার গেরিলা যুদ্ধ আর বর্তমানের হাইটেক যুদ্ধের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকটের মূলে রয়েছে চরম বৈষম্য ও বঞ্চিত হওয়ার ইতিহাস। বাঙালি জাতিও ২৩ বছরের শোষণের শিকার হয়েছিল, কিন্তু আমরা সেই শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পেরেছিলাম কারণ আমাদের একটি মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠেছিল। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে সেই নেতৃত্ব দানকারী শিক্ষিত শ্রেণীকে অঙ্কুরেই বিনাশ করা হয়েছে। গাজার ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক অবরোধ দিয়ে তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী সরকারের ভূমিকা ছিল বিশ্বকে স্তম্ভিত করার মতো। তারা বিদেশে দূতাবাস স্থাপন করে তহবিল সংগ্রহ থেকে শুরু করে জনমত গঠন পর্যন্ত সব কাজ দক্ষতার সাথে করেছিল। গাজাবাসীর জন্য এমন কোনো সর্বজনীন প্ল্যাটফর্ম নেই যা বিশ্বের কাছে তাদের বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃত। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তো বিষয়টি আরও জটিল, কারণ তারা আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রহীন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’, যা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিšদ রোহিঙ্গা ও গাজা সংকটে ধর্মীয় তকমা লাগিয়ে বিষয়টিকে প্রায়ই সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা মূল স্বাধীনতার দাবিকে দুর্বল করে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের তিনবার ভেটো প্রদান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের টার্নিং পয়েন্ট। সেই ভেটো না থাকলে আজ হয়তো আমরা স্বাধীন দেশে শ্বাস নিতে পারতাম না।
কিন্তু আজ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গাজা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক ভেটো মানবতাকে পরাজিত
করছে। শক্তির ভারসাম্য যেখানে একতরফা, সেখানে পরাধীনতার গ্লানি ঘুচানো প্রায় অসম্ভব। একাত্তরের সেক্টর কমান্ডাররা ছিলেন যুদ্ধের প্রাণভোমরা। তাদের সুশৃঙ্খল রণকৌশল পাকিস্তানি বাহিনীকে দিশেহারা করে দিয়েছিল। গাজার ক্ষেত্রে হামাসের মতো সংগঠনগুলো লড়লেও তাদের ওপর জঙ্গিবাদের লেবেল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে তাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের কোনো সশস্ত্র বা রাজনৈতিক সংগঠন নেই যা বিশ্বশক্তির সাথে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে।
স্বাধীনতা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা যখন পেছনে ফিরে তাকাই, তখন দেখি আমাদের প্রাপ্তি আর বিশ্বের নির্যাতিত মানুষের হাহাকার। আমাদের স্বাধীনতা ছিল এক সুপরিকল্পিত বিপ্লবের নাম। পরাধীনতার গ্লানি যে কী ভয়াবহ, তা রোহিঙ্গা শিবিরে গেলে বা গাজার ধ্বংসস্তূপ দেখলে বোঝা যায়। প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে তার নিজ ভূখণ্ডে স্বাধীনভাবে শ্বাস নেওয়ার।
বাংলাদেশের বিজয় তাই কেবল আমাদের বিজয় নয়, এটি বিশ্বের প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের জন্য এক ধ্রুবতারা।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সংগ্রাম আজ বিশ্ব রাজনীতির দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে গাজা আজ সভ্যতার কলঙ্ক হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাচ্ছে। আমরা বাঙালিরা গর্ব করি কারণ আমরা ইতিহাস গড়েছি, কিন্তু আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি।
আমাদের স্বাধীনতার স্বাদ যেন অন্যের পরাধীনতার ব্যথায় ম্লান না হয়, সেজন্য বিশ্ববিবেকের জাগরণ প্রয়োজন। প্রতিটি জাতিরই শেখ মুজিবুর রহমানের মতো একজন নেতার প্রয়োজন, যিনি তাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল