বাউফলে জুলাই স্বীকৃতি আছে, সহায়তা নেই
একসময় যে পরিবার ছিল স্বপ্নে ভরা, আজ সেখানে শুধু কান্না আর অনিশ্চয়তা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছে পরিবারের ছোট ছেলে। আরেক ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো চিকিৎসাধীন, অন্য একজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চার সন্তানের মধ্যে তিনজনই কর্মক্ষম নন। ভাঙা ঘর আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছেন পরিবারের সদস্যরা। চার ছেলেকে ঘিরেই ছিল আনসার হাওলাদার ও মোর্সেদা বেগমের স্বপ্ন। অটোরিকশা চালিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে চলা সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ছেলেদের নিয়ে আশা ছিল অফুরন্ত। সেই আশার আলোই নিভে যেতে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলোতে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সদর ইউনিয়নের জৌতা গ্রামের সবচেয়ে ছোট ছেলে আশিকুর রহমান হৃদয় (১৭) আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন দেশ বদলের স্বপ্ন নিয়ে। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মাথায় তিনটি গুলি লাগে তার। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা প্রায় তিন মাস হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যু আর জীবনের মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত লড়াই চালিয়ে যান হৃদয়। ছেলেকে বাঁচানোর সেই লড়াইয়ে পিছপা হননি বাবা আনসার হাওলাদারও। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে
একসময় যে পরিবার ছিল স্বপ্নে ভরা, আজ সেখানে শুধু কান্না আর অনিশ্চয়তা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছে পরিবারের ছোট ছেলে। আরেক ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো চিকিৎসাধীন, অন্য একজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চার সন্তানের মধ্যে তিনজনই কর্মক্ষম নন। ভাঙা ঘর আর অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই বেঁচে আছেন পরিবারের সদস্যরা।
চার ছেলেকে ঘিরেই ছিল আনসার হাওলাদার ও মোর্সেদা বেগমের স্বপ্ন। অটোরিকশা চালিয়ে কষ্টে-সৃষ্টে চলা সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ছেলেদের নিয়ে আশা ছিল অফুরন্ত। সেই আশার আলোই নিভে যেতে শুরু করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত দিনগুলোতে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার সদর ইউনিয়নের জৌতা গ্রামের সবচেয়ে ছোট ছেলে আশিকুর রহমান হৃদয় (১৭) আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন দেশ বদলের স্বপ্ন নিয়ে।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে মাথায় তিনটি গুলি লাগে তার। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা প্রায় তিন মাস হাসপাতালের শয্যায় মৃত্যু আর জীবনের মাঝামাঝি এক অনিশ্চিত লড়াই চালিয়ে যান হৃদয়।
ছেলেকে বাঁচানোর সেই লড়াইয়ে পিছপা হননি বাবা আনসার হাওলাদারও। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে বিক্রি করে দেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন অটোরিকশা। বিক্রি করতে হয় ঘরের একটি গাভীও। এরপর আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী—যার কাছে পেরেছেন, হাত পেতেছেন। ধারদেনা করে চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়।
টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা আর চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বুকভরা কষ্ট আর চোখভরা অশ্রু নিয়ে একসময় হাসপাতাল থেকে ছেলেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হন অসহায় বাবা-মা। যে সন্তানকে সুস্থ করে ঘরে ফেরানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়
মাথায় তিনটি গুলি নিয়ে শুরু হয়েছিল মৃত্যুর সঙ্গে এক দীর্ঘ লড়াই। চিকিৎসকদের চেষ্টায় দুটি গুলি অপসারণ করা গেলেও পরিবারের দাবি, একটি গুলি রয়ে গিয়েছিল হৃদয়ের মাথার ভেতরেই। সেই গুলির অসহনীয় যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়েছে তাকে দিনের পর দিন।
দীর্ঘ প্রায় নয় মাস মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল বিকেল ৩টার দিকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আশিকুর রহমান হৃদয়। পরিবারের ভাষ্য, মাথায় থেকে যাওয়া সেই গুলিই ধীরে ধীরে নিভিয়ে দেয় প্রাণবন্ত এই তরুণের জীবন। দেশ বদলের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নামা হৃদয় শেষ পর্যন্ত আর সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরতে পারেননি।
স্বজনদের অভিযোগ, গেজেটে শহিদ হিসেবে নাম প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সরকারি আর্থিক সহায়তা কিংবা পুনর্বাসন সুবিধা পাননি তারা। একদিকে ছেলেকে হারানোর শোক, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সর্বস্ব হারানোর বোঝা—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
শহিদ হৃদয়ের বাবা আনসার হাওলাদার বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহায়তা পাই নাই। আমার গরু ও অটোরিকশা বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করাইছি। অনেক টাকা ঋণ করেও ডাক্তার দেখাইছি। তারপরও ছেলেটা মারা গেছে। মাথার ভিতর একটা বুলেট ছিল, বের করতে পারে নাই। ঢাকা মেডিকেলের প্রফেসর বলছিলেন দেশের বাইরে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমার অর্থ ছিল না। বাংলাদেশ সরকারও আমাকে সহযোগিতা করে নাই।
কথাগুলো বলতে বলতে ছেলের স্মৃতিতে ভারী হয়ে আসে তার কণ্ঠ। তিনি বলেছেন, আমি শহিদের বাবা, কিন্তু আমাকে কোনো সহায়তা করা হয় না। কোনোভাবে অভাবের মধ্যে দিন কাটাই। আমার ঘর নাই। আল্লাহ যেভাবে চালায়, সেভাবেই চলি। সরকার অন্য জুলাই শহিদ ও আহতদের যেভাবে সহায়তা করছে, আমাকে যেন সেভাবে সহায়তা করা হয়।
শুধু হৃদয়কে হারিয়েই থামেনি এই পরিবারের দুর্ভোগ। জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন তাদের মেজো ছেলে মো. রেজাউল করিম। ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই আন্দোলনের সময় তার মাথার পেছনে গুলি লাগে। গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তিনি ভারী কাজ করতে পারেন না। বর্তমানে জীবিকার তাগিদে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে দারোয়ানের কাজ করছেন।
পরিবারের বড় ছেলে মো. আনিসুর রহমান ঢাকায় রিকশা চালিয়ে কোনো রকমে নিজের সংসার চালান। আর সেজো ছেলে মো. জসিম হাওলাদার (২৬) অসুস্থতার কারণে বাড়িতেই থাকেন। রক্তজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তাকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। ফলে তিনিও কোনো কাজ করতে পারেন না।
অর্থাৎ চার ছেলের মধ্যে একজন শহিদ, একজন জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো পুরোপুরি কর্মক্ষম নন, আরেকজন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। ফলে পরিবারের উপার্জনের পথ প্রায় বন্ধ।
সম্প্রতি সরেজমিনে জৌতা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের বসবাসের টিনের ঘরটি জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঘরের বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও কোথাও ছাদে টিন নেইঘরের ভেতর থেকেই দেখা যায় আকাশ। বৃষ্টি হলে পানি পড়ে ভিজে যায় ঘরের মেঝে ও বিছানাপত্র। যেকোনো সময় ঘরটি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঘরের সামনে কাদামাখা রাস্তা। ভেতরে নেই তেমন কোনো আসবাবপত্র। একটি পুরোনো ছোট টেলিভিশন ও একটি আলমারিই যেন তাদের সামান্য সম্বল। পরিবারের সদস্যরা জানান, টেলিভিশনটি শহিদ হৃদয় নিজের পরিশ্রমের টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। এখন সেটিই হয়ে আছে তাদের হারিয়ে যাওয়া ছেলের শেষ স্মৃতিগুলোর একটি।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেছেন, জুলাই যোদ্ধা আশিকুর রহমান হৃদয়ের কথা আমি শুনেছি। খুবই হৃদয়বিদারক তার ঘটনাগুলো। আমরা জেনেছি, তার গেজেট হয়েছে। গেজেটের বিপরীতে তিনি যে সুবিধাগুলো পাবেন, আর্থিক সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা পাচ্ছেন না। তার পরিবার যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কথা বলে, তাহলে আমার মনে হয় খুব শিগগিরই এর সমাধান হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
What's Your Reaction?