বাউলিয়ানা ছুঁয়ে যাওয়া এক সন্ধ্যা
নাম শুনেছিলাম তাঁর অনেক আগে। দেশের অসংখ্য কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীর মুখে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর নাম। যেমন করে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় শাহ আব্দুল করিমের গান—‘গাড়ি চলে না, চলে না’, ‘রঙের দুনিয়া তোরে চাই না, দিবানিশি ভাবি যারে’—তেমনি কথায় কথায় তিনি ফিরে যান দুরবীন শাহ, লালন সাঁই ও শাহ আব্দুল করিমের কাছে। মনে হলো, নিছক গান নয়, তিনি যেন তাঁদের দর্শনের এক নিবেদিত অনুসারী। বাউলিয়ানার প্রতি গভীর প্রেম থেকেই তাঁর শিল্পচর্চা। তিনি শফি মণ্ডল। কয়েকজন বাউলশিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এসেছিলেন লন্ডনে। সেই সুযোগে ম্যানচেস্টারের অন্যতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গ্রেটার ম্যানচেস্টার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (জিএমবিএ) গত ১৪ জুলাই আয়োজন করে এক অনন্য ‘বাউল সন্ধ্যা’। এটি ছিল শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; ছিল বাংলার হাজার বছরের লোকঐতিহ্য, মরমি দর্শন ও বাউল-ভাবনাকে অভিবাসী জীবনের বাস্তবতায় নতুন করে অনুভব করার এক অনন্য আয়োজন। আমরা অনেকেই বাউল বলতে কল্পনা করি লালনের আখড়া কিংবা শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ানো জটাজুটধারী কোনো সাধককে। মনে ভেসে ওঠে এমন কিছু মানুষ, যারা প্রচলিত সম
নাম শুনেছিলাম তাঁর অনেক আগে। দেশের অসংখ্য কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীর মুখে পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে তাঁর নাম। যেমন করে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় শাহ আব্দুল করিমের গান—‘গাড়ি চলে না, চলে না’, ‘রঙের দুনিয়া তোরে চাই না, দিবানিশি ভাবি যারে’—তেমনি কথায় কথায় তিনি ফিরে যান দুরবীন শাহ, লালন সাঁই ও শাহ আব্দুল করিমের কাছে। মনে হলো, নিছক গান নয়, তিনি যেন তাঁদের দর্শনের এক নিবেদিত অনুসারী। বাউলিয়ানার প্রতি গভীর প্রেম থেকেই তাঁর শিল্পচর্চা। তিনি শফি মণ্ডল।
কয়েকজন বাউলশিল্পীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এসেছিলেন লন্ডনে। সেই সুযোগে ম্যানচেস্টারের অন্যতম সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গ্রেটার ম্যানচেস্টার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন (জিএমবিএ) গত ১৪ জুলাই আয়োজন করে এক অনন্য ‘বাউল সন্ধ্যা’। এটি ছিল শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; ছিল বাংলার হাজার বছরের লোকঐতিহ্য, মরমি দর্শন ও বাউল-ভাবনাকে অভিবাসী জীবনের বাস্তবতায় নতুন করে অনুভব করার এক অনন্য আয়োজন।
আমরা অনেকেই বাউল বলতে কল্পনা করি লালনের আখড়া কিংবা শাহজালালের মাজার প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়ানো জটাজুটধারী কোনো সাধককে। মনে ভেসে ওঠে এমন কিছু মানুষ, যারা প্রচলিত সমাজব্যবস্থাকে প্রশ্ন করে; গান দিয়ে ভালোবাসা, মানবতা, সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। কিন্তু বাউল আসলে কোনো পোশাকের নাম নয়; এটি এক জীবনদর্শন, এক মুক্ত মানবিক চেতনা, যেখানে মানুষই সর্বোচ্চ সত্য।
‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণে তাঁর হৃদয়-নিঙড়ানো আহ্বান শুনে মনে হচ্ছিল, একজন শিল্পী নন, যেন এক আধ্যাত্মিক সাধক তাঁর সমস্ত সত্তা সমর্পণ করছেন তাঁর রবের কাছে। কিছুক্ষণ আগেও যে দর্শকেরা ডলি মণ্ডলের গানে নেচেছেন, তাঁরাও যেন হঠাৎ নীরব হয়ে গেলেন। হলজুড়ে নেমে এলো এক গভীর আত্মিক আবেশ।
সেই দর্শনেরই এক শিল্পিত প্রকাশ ঘটল সন্ধ্যাজুড়ে। শফি মণ্ডলের সঙ্গে ছিলেন অধ্যাপক জাহিদুল কবীর লীটন, অধ্যাপক ড. তারেক রেজা, তাঁর কন্যা ডলি মণ্ডল, সরদার হিরক রাজা এবং জোহরা হোসেইন জেমী। প্রত্যেকেই নিজস্ব পরিবেশনায় অনুষ্ঠানে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। তবে পুরো আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাউলধারার সেই আধ্যাত্মিক আবহ, যা মুহূর্তেই দর্শকদের অন্য এক জগতে নিয়ে যায়।
একসময় শফি মণ্ডল গেয়ে উঠলেন—
“আমি মসজিদে গিয়ে আল্লাহ খুঁজি...”
‘আল্লাহু আকবার’ উচ্চারণে তাঁর হৃদয়-নিঙড়ানো আহ্বান শুনে মনে হচ্ছিল, একজন শিল্পী নন, যেন এক আধ্যাত্মিক সাধক তাঁর সমস্ত সত্তা সমর্পণ করছেন তাঁর রবের কাছে। কিছুক্ষণ আগেও যে দর্শকেরা ডলি মণ্ডলের গানে নেচেছেন, তাঁরাও যেন হঠাৎ নীরব হয়ে গেলেন। হলজুড়ে নেমে এলো এক গভীর আত্মিক আবেশ।
এই তো বাউল। কখনও উচ্ছ্বাস, কখনও ধ্যান; কখনও নৃত্য, কখনও নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ। আনন্দ ও আধ্যাত্মিকতার এই অপূর্ব সহাবস্থানই বাউল দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
হাসন রাজা, শাহ আব্দুল করিম, লালনের গান এবং নিজেদের রচিত সঙ্গীত পরিবেশন করে শিল্পীরা আমাদের হৃদয় ভরিয়ে দিলেন। শফি মণ্ডলকে অনেকেই ‘বাউলগুরু’ বলে সম্বোধন করছিলেন। হয়তো উপাধির চেয়েও বড় ছিল তাঁদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আজকাল অনেক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লোকসংস্কৃতির নামে আধুনিক পোশাক, কৃত্রিম আলোকসজ্জা কিংবা বাহুল্যপূর্ণ নৃত্যই যেন মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে; অথচ মূল দর্শনটি হারিয়ে যায়। কিন্তু শফি মণ্ডলদের এই আয়োজন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কোনো বাহুল্য নয়, ছিল আন্তরিকতা; কোনো প্রদর্শন নয়, ছিল আত্মার স্পর্শ। প্রবাসে ক্রমশ ফিকে হয়ে আসা আমাদের লোকসংস্কৃতির আকাশে এ যেন গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদের মতো এক উজ্জ্বল উপস্থিতি।
অনেক দিন ধরেই এমন একটি বাউল সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিলেন ম্যানচেস্টারের অনেক মানুষ। সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছে জিএমবিএ। আয়োজকদের আন্তরিক ধন্যবাদ—প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য এমন একটি স্মরণীয় সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য।
সবশেষে দুই দর্শকের কথা না বললেই নয়। আমি তাঁদের পাশেই বসেছিলাম।
ডলি মণ্ডলের একটি ভাবগম্ভীর গান শুনে একজন মাথা দোলাতে দোলাতে হঠাৎ বললেন, ‘এই গান শুনেই কি মানুষ এক ধরনের নেশায় বুঁদ হয়ে যায়?’
আমি হেসে বললাম, ‘আমি কোনো দিন নেশা করিনি। তবে যদি কোনো নেশা থেকে থাকে, হয়তো এটাই—সুরের, ভাবের, আত্মার নেশা।’
আরেকজন কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ভাই, উনি হিন্দু না মুসলিম?’
আমি একটু হেসে উত্তর দিলাম—
‘বাউলের আবার জাত হয় নাকি, ভাই?’
সেই উত্তরেই যেন লুকিয়ে ছিল পুরো সন্ধ্যার সারকথা। কারণ বাউল মানুষকে ধর্মে নয়, হৃদয়ে খোঁজে; বিভাজনে নয়, মিলনে বিশ্বাস করে। আর সেই কারণেই শত বছর পেরিয়েও লালন, হাসন রাজা কিংবা শাহ আব্দুল করিম আজও আমাদের কাছে সমান প্রাসঙ্গিক।
লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।
এইচআর/এমএফএ/এএসএম
What's Your Reaction?