বাগেরহাটে সংঘর্ষে ৪০ বসতবাড়ি ধ্বংসস্তূপ
বাগেরহাটের চিতলমারীতে জমি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ পরবর্তী হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ৪০টি বাড়িঘর ও দোকান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এতে রাজিব শেখ (২৫) নামের এক যুবক নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে এ ঘটনা। শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় আবারও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের। শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে সড়কজুড়ে ইটের গুড়ি। এক পাশে চিংগড়ী গ্রামের শেখ বাড়ি অন্যপাশে মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি। চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। অনেক পরিবার তাদের সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কোথাও খাবারের অভাব, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। নিহত রাজিব শেখের বাড়িতে একসাথে রান্না করে ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার জোগাড়ের চেষ্টা চলছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামের এক
বাগেরহাটের চিতলমারীতে জমি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষ পরবর্তী হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে ৪০টি বাড়িঘর ও দোকান ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এতে রাজিব শেখ (২৫) নামের এক যুবক নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত উপজেলার চিংগড়ী গ্রামে এ ঘটনা। শুক্রবার (২৭ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। যেকোনো সময় আবারও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, চিতলমারী-পাটগাতি সড়কের চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে সড়কজুড়ে ইটের গুড়ি। এক পাশে চিংগড়ী গ্রামের শেখ বাড়ি অন্যপাশে মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি। চিংগড়ী ও মচন্দপুর গ্রামের বিভিন্ন স্থানে পুড়ে যাওয়া ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। অনেক পরিবার তাদের সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। কোথাও খাবারের অভাব, কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন। নিহত রাজিব শেখের বাড়িতে একসাথে রান্না করে ক্ষতিগ্রস্তদের খাবার জোগাড়ের চেষ্টা চলছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার বিকেলে আরিফ শেখ নামের এক যুবক চিতলমারী-পাটগাতি সড়ক দিয়ে মোটরসাইকেলে যাচ্ছিল। বিশ্বাস পরিবারের লোকজন ওই যুবককে ফুলকুচি (লোহার সিকের তৈরি এক ধরনের মাছধরা অস্ত্র) দিয়ে আঘাত করে। বিষয়টি জানাজানি হলে শেখ পরিবার ও বিশ্বাস পরিবারের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। সন্ধ্যা নাগাত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেখ পরিবারের সদস্যদের নিভৃত করার চেষ্টা করেন। সেই সুযোগে সাইদ বিশ্বাস, সোহাগ মেম্বারের নেতৃত্বে শেখ বাড়িতে হামলা হয়। ২০০’র অধিক মানুষ হামলা চালিয়ে অন্তত ৪০টি বাড়িঘর লুট, ভাঙচুর, পেট্রোল ও পিচ (বিটুমিন) ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে অনেকের জীবনের শেষ সম্বলটুকু পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লিয়াকত শেখ বলেন, ‘আগুন দিয়ে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। কি খাব আর কি করব জানি না। আমার ছেলে বা আমিতো কারও সাথে মারামারি করতে যাইনি, তাহলে আমার ঘর পোড়ালো কেন?’
মনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বলেন, ‘আমার স্বামী প্যারালাইজড বিছানায় শোয়া। মারামারির ভয়ে ছোট ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছি, আর বড় ছেলে ভ্যান চালায়। ঋণ করে ৬ মাসের ধান কিনে রাখছিলাম ঘরে। তাও পুড়ে গেছে। কি খাব জানিনা।’
আব্দুর গণি শেখের স্ত্রী জয়নব বেগম বলেন, ‘ঘর ঠিক করার জন্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলাম। তা নিয়ে গেছে। একটা ছাগল ও কয়েকটা হাস ছিল, তাও পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিভাবে বাঁচব জানি না। হামলাকারীদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবী করেন এই নারী।’
ক্ষতিগ্রস্ত মো. বাবলু শেখ বলেন, ‘ওরা সবাই অস্ত্র-সস্ত্র নিয়ে একসাথে আসছে, এসে আমাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া ও মারধর শুরু করেছে। আমরা ঠ্যাকানোর চেষ্টা করেছি, এরমধ্যে পুলিশ আসছে। নুরে আলম দারগা (এসআই) পুলিশ নিয়ে আমাদের লোকজনকে পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করেছে। আর পুলিশের সামনেই আমাদের বাড়ি ঘরে আগুন দিয়েছে। আমার ঘরে ৯ভরি স্বর্ণ ও ৫ লক্ষ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। আর অন্তত ৪০টি ঘরে আগুন দিয়েছে।’
হামলা থেকে বাদ যায়নি কোটি টাকার ভবনও। দুইতলা দুটি ও একতলা বিশিষ্ট অন্তত ৪টি ভবনে আগুন দেওয়া, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।
নুরু শেখ বলেন, ‘আমার দুই ভাই বিদেশে থাকে। অনেক কষ্ট করে দোতলা ঘর করছিলাম। গতকাল সব শেষ করে দিয়েছে। ঘরে যে মালামাল ছিল সব লুটে নিয়ে গেছে। আমাদের ঘর থেকে স্বর্ণ ও মালামালসহ অন্তত দেড় কোটি টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। সাইদ বিশ্বাস, কালা বিশ্বাস ও সোহাগের নেতৃত্বে এসব হয়েছে।’
বিশ্বাস ও শেখ পরিবারের মধ্যে বিরোধের কারণ সম্পর্কে নুরু আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে মধুমতি চরের জমি দখল নিয়ে আলম শেখের সাথে বিশ্বাস পরিবারের বিরোধ চলে আসছিল। এই বিরোধের জেরে বিশ্বাস পরিবারের সদস্যরা আলম শেখকে হত্যা করে। হত্যার পরেও থামেনি দুই পরিবারের বিরোধ। এই বিরোধে কয়েকবার দুই পক্ষের মধ্যে ছোটখাট সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত হয়েছে। যেকোনো মূল্যে এলাকার মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এই বিরোধের সমাধান করা দরকার বলে জানান তিনি।’
এদিকে শুক্রবার দুপুরের দিকে দেখা যায় শেখ পরিবারের সদস্যদের হামলার আশঙ্কায় মচন্দপুর গ্রামের বিশ্বাস বাড়ি থেকে টিভি, ফ্রিজ, খাটসহ বিভিন্ন মূল্যবান মালামাল ভ্যান, নসিমন ও পিকআপে করে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি পাঠাচ্ছেন। তাদের দাবী শেখ পরিবারের লোকজন সংগঠিত হচ্ছে, তারা আমাদের বাড়িতে হামলা করবে। আলম শেখ মারাগেলেও এমন হামলা করেছিল।
পান্না বিশ্বাসের স্ত্রী সালমা বেগম বলেন, কয়েক বছর আগে আমার স্বামীকে মেরে পঙ্গু করে দিয়েছে শেখ পরিবারের লোকজন। তাদের ভয়ে আমরা সব মালামাল নিরাপদ স্থানে পাঠাচ্ছি। আমাদের তো বাঁচতে হবে। ওরা হুমকি দিয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দেবে। আগেরবারও আমাদের সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছিল।
এদিকে হামলা, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও নিহতের ঘটনায় সৌরভ বিশ্বাস (১৯) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সৌরভ মচন্দপুর গ্রামের সোহেল বিশ্বাসের ছেলে। এবং নিহত রাজিব শেখ চিংগড়ী গ্রামের ফারুক শেখের ছেলে।
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. শামীম হোসেন বলেন, অনেক বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে এবং রাজিব নামে এক যুবক নিহত ও অনেকে আহত হয়েছেন। নিহত রাজিবের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ অপরাধিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, ফের সংঘর্ষ বা অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
চিতলমারী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে আসি। তবে বাঁধার সম্মুখীন হওয়ায় আগুন নেভানোর কাজ শুরু করতে কিছুটা দেরি হয়। আনুমানিক ২০-২৫টি বসতঘর পুড়ে গেছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, চারটি ইউনিট একযোগে কাজ করে ৩ ঘণ্টায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই।
What's Your Reaction?