বাঞ্ছারামপুরে ১০ কোটি টাকার স্যানিটেশন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় সরকারি স্যানিটেশন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো প্রকাশ করা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন। তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাস পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি সেই তদন্ত রিপোর্ট। এ ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ উপজেলা প্রশাসনের একটি অংশকে ম্যানেজ করে অনিয়ম দুর্নীতি করা হচ্ছে। যার কারনে প্রশাসন দেখেও নিরবতা পালন করছেন। কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ‘মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পের আওতায় টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার অভিযোগ উঠে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় দৈনিক কালবেলাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গত ২০ এপ্রিল সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তারিকুল ইসলাম তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের পর কিছুদিন কাজ বন
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় সরকারি স্যানিটেশন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো প্রকাশ করা হয়নি তদন্ত প্রতিবেদন।
তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও মাস পেরিয়ে গেলেও আলোর মুখ দেখেনি সেই তদন্ত রিপোর্ট। এ ঘটনায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ উপজেলা প্রশাসনের একটি অংশকে ম্যানেজ করে অনিয়ম দুর্নীতি করা হচ্ছে। যার কারনে প্রশাসন দেখেও নিরবতা পালন করছেন। কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
‘মানব সম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পের আওতায় টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে নিম্নমানের কাজ, উপকারভোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করার অভিযোগ উঠে। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় দৈনিক কালবেলাসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে গত ২০ এপ্রিল সংবাদ প্রকাশের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।
পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তারিকুল ইসলাম তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের পর কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও বর্তমানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবারও নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, উজানচর ইউনিয়নে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য ২২৯টি টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮০ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩২ টাকা। প্রতিটি ল্যাট্রিন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩৫ হাজার ১০৮ টাকা (ওয়াই জংশনসহ)। সে হিসাবে উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হওয়ার কথা প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ ১৬ হাজার ৫১৬ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও প্রায় দুই বছর অতিবাহিত হলেও প্রকল্পের কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কার্যাদেশ অনুযায়ী সাত কর্মদিবসের মধ্যে কাজ শুরু করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটিও যথাসময়ে বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে উজানচর গ্রামে মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ল্যাট্রিন নির্মাণ সামগ্রী তৈরিতে নিম্নমানের ইট, সুরকি, বালু এবং রিং তৈরিতে দুর্বল মানের তার ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন রিং, স্ল্যাব ও পাইপের মান ও আকার সিডিউল অনুযায়ী না হওয়ায় তা দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয় উপকারভোগীরা অভিযোগ করেন, ল্যাট্রিন সরবরাহের কথা বলে বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়েছে। অনেকেই এখনো ল্যাট্রিন পাননি। এতে জনমনে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
ফরদাবাদ ইউনিয়নে ২৪৫টি ল্যাট্রিন নির্মাণের অনুমোদন থাকলেও মাত্র ১২৯টি ল্যাট্রিন নির্মাণ করেই পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু সিয়ামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। বাকি কাজ বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় পুরো প্রকল্পই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সংবাদ প্রকাশের পর এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তারিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান এবং কৃষি কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। কিন্তু তদন্ত কমিটি গঠনের দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো কোনো প্রতিবেদন জমা হয়নি।
এদিকে তদন্ত কমিটিকেও ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় পুরো তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনমনে।
উজানচর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সুজন বলেন, ‘তদন্ত কমিটি গঠনের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট কেনো জমা দেয়া হয়নি জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি বদলি হয়ে গেছি, এরপরও আমাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা কোনো কথা হলো? সহকারী প্রকৌশলীকে বলেছি বিষয়টি দেখার জন্য।’
অন্যদিকে তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান তদন্ত কমিটি ঘোষনার ১৩দিন পর হজ্ব পালন করতে সৌদি আরবে যান। এর আগে তার মুঠোফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক বার কল করলেও তিনি কল রিসিব করেনি বা পরবর্তীতে কল ব্যাক করে নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পে অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্ত কমিটি গঠনের পরও নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন জমা না হওয়া, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নীরবতা এবং প্রায় দুই বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স ইসলাম এন্টারপ্রাইজ’-এর প্রতিনিধি দেওয়ান শহিদুল হক জানান, মালামাল চেন্জ করেই কাজ করেতেছি। আপনি জানেন না কত জায়গায় দিয়ে কাজ টা করতেছি, টিন যে লাগাই দিতেছি এটাই আলহামদুলিল্লাহ বলেন।’
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাঞ্ছারামপুর উপজেলা প্রকৌশলী আবু সিয়াম বলেন, ৪টা ইউনিয়নে কাজ শেষ হয়েছে। ফরদাবাদ ইউনিয়নে কাজ পুরোপুরি সম্পূর্ণ হয়নি। তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ কেনো দেখছে না এই বিষয়ে আপনি ইউএনও স্যারের সাথে কথা বলেন। ঠিকাদার ২বছরের কাজ শেষ না করার বিষয়টি আমি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। এবং ঠিকাদারকে চিঠি দিয়ে নোটিশ করেছি।
এই বিষয়ে বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এর নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. শফিউল হক কালবেলাকে বলেন, এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে তারা যদি কাজ শেষ করতে না পারে তাহলে ওয়ার্ক অর্ডার ক্যানসেল করে দিবো। অনিয়ম দূর্নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ারকে বলেছি তিনি বিষয়টি ভালো ভাবে দেখবেন। যদি এর সাথে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী সিয়াম জড়িত থাকে তাহলে সে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারলো। আমি বিষয়টি ভালো ভাবেই দেখতেছি। কোথাও যেনো কোনো অনিয়ম না হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি অবগত হয়েছি। ইউএনও সাহেবকে বলবো আমি বলবো। আমি কথা বলে জানাচ্ছি।’
What's Your Reaction?